বাংলাস্ফিয়ার: মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুতই এক বিপজ্জনক অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছে। আমেরিকা, ইজরায়েল এবং ইরানের মধ্যে যে সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে এবং প্রতিদিনই এর মাত্রা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যিনি ইরানের কাছে সরাসরি “unconditional surrender”—অর্থাৎ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করেছেন। তাঁর এই বক্তব্য কূটনৈতিক উত্তেজনাকে আরও তীব্র করে তুলেছে এবং পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সম্ভাবনাকে বাস্তব করে তুলেছে।
সংঘাতের সামরিক দিকটিও ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। খবর অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই প্রায় ১৩০০-রও বেশি ইরানি সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন। ইজরায়েলি বিমানবাহিনী ইরানের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও কমান্ড কাঠামোর ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়েছে। একই সঙ্গে হামলা হয়েছে লেবাননের রাজধানী বেইরুটের দক্ষিণ উপকণ্ঠেও, যেখানে শক্তিশালী শিয়া সংগঠন হেজবোল্লাহর ঘাঁটি রয়েছে বলে মনে করা হয়। এসব হামলার কারণে ওই অঞ্চলে ব্যাপক জনপলায়ন শুরু হয়েছে; হাজার হাজার মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালাচ্ছেন।
এই সংঘাত আসলে বহুদিনের জমে থাকা উত্তেজনার বিস্ফোরণ। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা—যেমন ইরাক, সিরিয়া, লেবানন এবং ইয়েমেনে তাদের মিত্র শক্তিগুলিকে সমর্থন—নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ ছিল। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের দৃষ্টিতে এই নীতিই আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। ফলে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে আমেরিকা ও ইজরায়েল যৌথভাবে যে সামরিক অভিযান শুরু করেছে, তার লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক নেতৃত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা স্থাপনাগুলিকে আঘাত করা।
ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬-এর হামলা এই সংঘাতের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই দিন আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ আক্রমণে ইরানের বেশ কয়েকটি সামরিক কেন্দ্র ধ্বংস হয় এবং উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়। হামলার সরকারি যুক্তি ছিল সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা, কিন্তু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, বাস্তবে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে। এই কারণেই আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
ইরান ইতিমধ্যেই পাল্টা প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা করেছে। তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ ও সামরিক ঘাঁটিগুলি তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। পারস্য উপসাগর, ইরাক, সিরিয়া কিংবা লেবাননে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক বাহিনী — সবই এখন সম্ভাব্য হামলার মুখে। এর ফলে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা প্রতিদিন বাড়ছে।
এই উত্তেজনার প্রভাব কেবল সামরিক বা কূটনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; বিশ্ব অর্থনীতিও এর ধাক্কা অনুভব করছে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী অঞ্চল, এবং যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিলেই তেলের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে, কারণ আশঙ্কা করা হচ্ছে যে পারস্য উপসাগরের জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে। বিশেষ করে স্ট্রেইট অফ হরমুজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
আমেরিকার অভ্যন্তরেও এই যুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। বহু আমেরিকান নাগরিক ও বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন—এই সামরিক অভিযান আদৌ কি আমেরিকার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করবে, নাকি এটি আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সূচনা করতে পারে। অতীতের ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা অনেকের মনেই এখনও তাজা, ফলে যুদ্ধের প্রতি জনমতের সমর্থন ততটা দৃঢ় নয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও একেবারে একরকম নয়। ইউরোপ ও এশিয়ার বহু দেশ অবিলম্বে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার কথা বলছে। তবে একই সঙ্গে কিছু রাষ্ট্র নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থানের প্রতি সহানুভূতিও প্রকাশ করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও একটি বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে এই সংঘাত এখন এমন এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রতিটি নতুন হামলা বা রাজনৈতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে সক্ষম। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের জীবনই নয়, বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ—সবই এই সংঘাতের গতিপথের ওপর নির্ভর করছে। যদি দ্রুত কোনো কূটনৈতিক পথ খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে এই সংঘাত সহজেই সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তার অভিঘাত বিশ্বব্যাপী অনুভূত হবে।