সোমক রায়চৌধুরী: আরব সাগরের তীরে এসে সম্পূর্ণ বদলে গেল টিম ইন্ডিয়া।
ভারত – ১৯, ইংল্যান্ড – ১৫।
ইংল্যান্ড – ২১ ভারত – ১৮
ক্রিকেটের স্কোর এরকম টেবিল টেনিস বা ভলিবলের মতো লাগছে কেন?
প্রথমটা ছক্কার হিসেব, দ্বিতীয়টা চারের। ২০-কুড়ি ক্রিকেট আসার পর ক্রিকেট খেলার চরিত্রটাই যে বদলে গিয়েছে। ওপরের দেওয়া সংখ্যাগুলোয় আর একবার চোখ বোলান। যার মানে ভারতের ১৮৬ রান এসেছে ওভার-বাউন্ডারি বা বাউন্ডারি থেকে। যার মধ্যে ১১৪ স্রেফ ছক্কা থেকে। আর ইংল্যান্ডের ১৭৪ রান এসেছে ছক্কা আর চার থেকে। দিনের শেষে ভারত ২৫৩/৭ এর জবাবে ইংল্যান্ড থামল ২৪৬/৭। ভাবুন তো, ইংল্যান্ডের ওভারবাউন্ডারির সংখ্যাটা যদি কোনক্রমে ১৫’র জায়গায় ১৭ হয়ে যেত? তাহলে উৎসবের বদলে ওয়াংখেড়েতে নেমে আসত শ্মশানের স্তব্ধতা। জেকব বেথেল-উইল জ্যাকস জুটি বা পরে বেথেল-স্যাম কারেন জুটি যখন অবলীলায় বল মাঠের ছোট বাউন্ডারির বাইরে ফেলছিলেন তখন যেমন নিঃশব্দতা গ্রাস করছিল ওয়াংখেড়ের উৎসবমুখর গ্যালারিকে।
তা হল না দুটো দৃশ্যের জন্য।
১) ১৪ তম ওভারের শেষ বলটা অফ স্টাম্পের বাইরে ফুলটস ফেললেন আর্শদীপ সিং। প্রথমে সামান্য দ্বিধায় থাকলেও উইকেটে সেট হয়ে যাওয়া উইল জ্যাকস লোভ সামলাতে পারলেন না। হাঁটুর উচ্চতার ফুলটসে স্লাইস করে চালিয়ে দিলেন স্কোয়ার বাউন্ডারির দিকে। ওই সামান্য দ্বিধার জন্যই টাইমিংটা ঠিক হল না। বলটা পড়ছিল কভার-পয়েন্ট বাউন্ডারির একটু ভেতরে। ছুটে আসা আক্সার ঝুঁকে পড়ে ক্যাচটা নিয়েই বুঝলেন চলমান দেহের ইনারশিয়া বা জাড্যের জন্য ভারসাম্য হারিয়ে বাউন্ডারির বাইরে চলে যাবেনই। এই অবস্থায় চোখ তুলে দেখলেন বল তাড়া করে তার চার হাতের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছেন শিবম দুবে। ঠান্ডা মাথার আক্সার বাউন্ডারিতে পা পড়ার আগের মুহূর্তে বলটা শিবমের দিকে ছুঁড়ে দিলেন। শিবম লোপ্পা বল তালুবন্দী করতেই বিরাট গর্জন আছড়ে পড়ল ফুল হাউস ওয়াংখেড়ে গ্যালারিতে। অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব সহ পুরো দল ছুটে এসে অভিনন্দন জানালেন আক্সারকে। এই বিশ্বকাপে ম্যাচ-উইনার বনে যাওয়া জ্যাকস যখন প্যাভিলিওনে দিকে হাঁটা দিলেন, ইংল্যান্ডের স্কোর তখন ১৭২/৫। হাতে তখনও ছ’ওভার। ভারতীয় টিমের উচ্ছ্বাসের ভঙ্গিই বলে দিচ্ছিল কতটা চাপ তাদের ওপর থেকে সরল এই রিলে ক্যাচে পঞ্চম উইকেট জুটি ভাঙার পর। তার আগে বেথেল-টম ব্যান্টন জুটি যখন ভারতীয় বোলিংকে বেধরক পিটিয়ে, ইংল্যান্ডকে ম্যাচে ফেরাচ্ছিলেন, তখনও এই ঠান্ডা মাথার পরিচয় দেন অভিজ্ঞ আক্সার। টম ব্যান্টন তাকে পরপর দুটো ছয়ে মারার পরও নার্ভ না হারিয়ে পরের বলটি উইকেটের ওপর যথাসাধ্য ভাসিয়ে দিলেন তিনি। ব্যান্টন আড়াআড়ি চালাতে গিয়ে ঠকে গেলেন। আক্সার তাকে ক্লিন বোল্ড করার পর, অষ্টম ওভারে ইংল্যান্ডের স্কোর দাঁড়ালো ৯৫-৪।

২) উইল জ্যাকস এর জায়গায় নেমে দুরন্ত কর্তৃত্ব নিয়ে ব্যাট করতে থাকা বেথেলকে সাপোর্ট দিচ্ছিলেন স্যাম কারেন। ১৯ তম ওভারের তৃতীয় বলে নিচু ফুলটস বেরিয়ে এল হার্দিক পান্ডিয়ার হাত থেকে। জেতার জন্য ইংল্যান্ডের তখন প্রয়োজন ১০ বলে ৩৪। বাঁ-হাতি ব্যাটার কারেন বলটা চিপ করলেন মিড-উইকেট বাউন্ডারির দিকে। আকাশে উড়ে বল বাউন্ডারি পার করার ঠিক আগেই লাইনের ইঞ্চিখানেক ভেতরে পা রেখে নিখুঁত জাজমেন্টে ক্যাচটি নিলেন তিলক ভর্মা। কারেন ফেরার সঙ্গেই প্রায় শেষ হয়ে গেল জেকব বেথেলদের যাবতীয় লড়াই। শেষ ওভারের প্রথম বলে দু’রান নিতে গিয়ে বেথেল রানআউট হওয়ার ফর জোফ্রা আর্চার এসে তিনটি ছক্কা হাঁকালেন ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে আগামী রবিবারের ফাইনালে সূর্যকুমার যাদবরা এক পা রেখে ফেলেছেন। ওয়েস্টইন্ডিজ ম্যাচে ইডেনের বাউন্ডারিতে এরকমই একটি কঠিন সুযোগ হাতছাড়া করার প্রায়শ্চিত্ত টুর্নামেন্টের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে করলেন তিলক। যারা এই বিশ্বকাপে তেরোটা ক্যাচ হাতছাড়া করেছে, সেমিফাইনালে এসে কোন জাদুবলে তাদের এই পরিবর্তন ফল, তা নিয়ে সবথেকে বেশি বিস্মিত হবেন ব্রেন্ডন ম্যাককুলাম-হ্যারি ব্রুকরা। আসলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ওয়াংখেড়েতে ম্যাচ শুরু থেকেই পুরো দাবার ছকটাই উলটে গিয়েছিল। নাহলে এই জীবন-মরণ ম্যাচে নামার আগে সুপার এইটে পরপর তিনটি ম্যাচ জেতার জন্য যিনি ছিলেন অদ্ভুত শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী, সেই ইংরেজ অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক জোফ্রা আর্চারের রাইজিং ডেলিভারিতে ঠকে গিয়ে সঞ্জুর তোলা ওই লোপ্পা ক্যাচ মিড-অনে ফস্কাবেন? অপরদিকে মাহেন্দ্রক্ষণে নেওয়া আক্সার-শিবমের রিলে ক্যাচের কথা তো আগেই সবিস্তারে বলা হল। ২০-কুড়ি ক্রিকেটের সৌজন্যে ছয়ের বন্যা ছাড়া আর একটি উপাদান যোগ হয়েছে এই খেলায়, তা হল বাউন্ডারিতে এই রিলে ক্যাচ!

বুমস-ম্যাজিক
গতকালই ম্যাচ পর্যালোচনা করার সময়ে বলেছিলাম, ফর্মের চূড়ায় অধিষ্ঠিত হ্যারি ব্রুকের উইকেট নিতে অভিজ্ঞ যশপ্রীত বুমরার দিকেই তাকিয়ে থাকবেন সূর্যকুমার যাদব। আর পাওয়ার প্লে সহ কোন কোন পরিস্থিতিতে বুমরার চার ওভার খরচ করবে ভারতীয় থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক তার ওপর নির্ভর করবে অনেক কিছু। হলও তাই। এদিন বুমস ম্যাজিক সবচেয়ে বেশি কার্যকারী হল স্পেলের শেষ ওভারে। ইংল্যান্ড যখন ২০৯/৫, তখন অষ্টাদশ ওভার বল করতে এলেন বুমরা। ভারতের সামান্য আগে দুশোর গন্ডি পেরিয়ে তখনও রানের পাহাড় তাড়া করার লড়াই’এ প্রবলভাবে রয়েছে হ্যারি ব্রুকের দল। সেঞ্চুরির মুখে দাঁড়িয়ে দলকে টেনে চলেছেন ব্রেথেল। এই পরিস্থিতিতে ইয়র্কার, স্লোয়ার সহ তূণের সবকটি অস্ত্র প্রয়োগ করলেন এদিন ওয়াংখেড়ের একমাত্র সফল বোলার। মাত্র ছ’রান দিয়ে বিরাট পাল্টা-চাপের মুখে ফেলে দিলেন বেথেলদের। এর আগে ষোল তম ওভারেও তিনি দিয়েছিলেন মাত্র আট রান! চার ওভারে বুমরার ফিগার ১/৩৩, দিনের সেরা, ৪৯৯ রান ওঠা ম্যাচে রান খরচের নিরিখে। এরপরের ওভারে হার্দিক পান্ডিয়ার প্রথম বলে ছক্কা হাঁকিয়ে সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেন বেথেল ঠিকই, কিন্তু তৃতীয় বলেই কারেন আউট হয়ে যাওয়ায় তার আর আর হোলির ইডেনের ফিনলে অ্যালেন হয়ে ওঠা হল না! ৪৮ বলে ১০৫ দিনের সেরা ইনিংস হলেও, ম্যাচ-জেতানো ইনিংস হতে পারল না!
এর আগে হ্যারি ব্রুক ক্রিজে আসতেই বুমরাকে আক্রমণে এনেছিলেন সূর্যকুমার। ম্যাচে তার প্রথম বলেই ইংল্যান্ডের সবচেয়ে দামি উইকেটটি পেয়ে গেলেন বুমস। তার স্লোয়ারে বোকা বনে মিসটাইম করলেন ব্রুক। উঁচু ক্যাচ নিলেন সেই আক্সারই। ম্যাচে বুমরার একমাত্র শিকার।

তবে বুমরাকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সূর্যকুমার সব ঠিক করলেও, ইনিংসের শেষ ওভার ঠান্ডা মাথার আক্সারকে না দিয়ে কেন ম্যাচে একটাও বল না করা শিবম দুবের হাতে তুলে দিলেন বোধগম্য হল না! জোফ্রারা বাইশ রান তুললেন তিনটে ছয় সহ, বেথেল প্রথম বলে রানআউট যদি না হতেন তাহলে যে কী হত!

“এবার সঞ্জুর হাতে জোফ্রার হেনস্তা! “
গত বছরের একটি সিরিজে জোফ্রা আর্চারদের গতির বিরুদ্ধে সঞ্জু স্যামসনের নাকানি চোবানি খাওয়া দেখে ইংল্যান্ড শিবিরের নিশ্চিত ধারণা হয়েছিল, যে পেস আর বাউন্সের বিরুদ্ধে সঞ্জুর টেকনিকে রয়েছে বড় গলদ। ইডেনে ফর্ম ফিরে পাওয়া সঞ্জুও সেটা মাথায় নিয়েই নেমেছিলেন। আর্চারের বাউন্সারের বিরুদ্ধে সঞ্জু শুরু থেকেই নিলেন কাউন্টার-অ্যাটাকের পথ। একে তো উইকেটে হাল্কা ঘাসের চাদর থাকায় বল পড়ে মসৃণভাবে ব্যাটে আসছিল ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, তায় আবার ওয়াংখেড়ের ছোট বাউন্ডারি। সঞ্জু আর্চারের ১৪ বলে বেধরক চালিয়ে তুলে নিলেন ৩৮ রান। চার ওভারে আর্চার এত ঠ্যাঙানি খেলেন, যে দিনের শেষে তার খরচের খাতায় রয়েছে ৬১; সান্তনা পুরস্কার তিলক ভর্মার একটি উইকেট।
শুধু আর্চার নয়, এদিন সঞ্জু-ইশান-তিলক-হার্দিকদের মারমুখী ব্যাটিং-এর সামনে নার্ভ রাখতে পারলেন না ইংল্যান্ডের বহু আলোচিত স্পিনার ত্রয়ীও। না ফর্মে থাকা অফ স্পিনার জ্যাকস, এমনকি অভিজ্ঞ, বহু ম্যাচে ইংল্যান্ডের ত্রাতা লেগ স্পিনার আদিল রাশিদও নয়। উইকেটে থাকা সামান্য ঘাস স্পিনারদের যাবতীয় জাড়ি-জুড়ি শেষ করে দিয়েছিল।( ভারতের বরূণ চক্রবর্তী-আক্সারও আদিলদের মতোই বেধরক মার খেয়েছেন)
সঞ্জু একাই সাতটি ছয় ও আটটি চার মেরে গেলেন, বাঁ-হাতি ইশান কিষাণের সঙ্গে জুটি বেঁধে তার ৪২ বলে ৮৯ রানের ইনিংসে ভারতকে আড়াইশোর গন্ডি টপকানোর ভিত তৈরি করে দিয়ে গেল। এসব ম্যাচে ইনিংসের শেষ পাঁচ ওভারে নার্ভ ধরে রাখা ব্যবধান গড়ে দেয়। বুমরা-হার্দিকরা পারলেন, আদিল রশিদ-আর্চার-জ্যাকসরা এক্ষেত্রে ডাহা ফেল। অধিনায়কের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস কি গ্রাস করেছিল পুরো ইংরেজ টিমকে? হতে পারে, নাহলে সেমিফাইনাল খেলতে নেমে এত ক্যাজুয়াল কেন মনে হবে ব্রুকদের? অন্যদিকে টিম ইন্ডিয়ার অ্যাটিচিউড আর শরীরী ভাষাই যেন সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল ওয়াংখেড়েতে এসে!
জেকব বেথেলকে টপকে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ বাছা সঞ্জু স্যামসনকে। বুমরার ওই দুরন্ত ওভারটাই বেথেলের প্রাপ্য সম্মান ছিনিয়ে নিয়ে তাকে ট্র্যাজিক নায়ক বানিয়ে দিল। আর শেষ করে দিল ইংরেজদের স্বপ্নও।
এবার এই জাগ্রত আক্সার-তিলক-শিবমদের সামনে বিশ্বকাপ ধরে রাখার লড়াই।