বাংলাস্ফিয়ার: গত পনেরো বছরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বোঝার জন্য রাজভবন ও নবান্নের সম্পর্ক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সাধারণভাবে ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যে রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রীর সম্পর্ক অন্তত বাহ্যিকভাবে সৌজন্যপূর্ণ থাকে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের পর থেকে এই সম্পর্ক ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রকাশ্য সংঘাত, রাজনৈতিক মন্তব্য এবং সাংবিধানিক সীমা নিয়ে বিতর্ক প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল—রাজ্যে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকার এবং কেন্দ্রে ভারতীয় জনতা পার্টির সরকারের রাজনৈতিক সংঘাত।
২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম দিকে রাজ্যপাল এম.কে. নারায়ননের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সম্পর্ক মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। নারায়ণন নিজে একজন অভিজ্ঞ প্রশাসক ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন এবং তিনি সাধারণত প্রকাশ্যে রাজনৈতিক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতেন। সেই সময় রাজভবন ও নবান্নের মধ্যে বড় কোনো প্রকাশ্য সংঘাত দেখা যায়নি।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে তাঁর উত্তরসূরি কেশরী নাথ ত্রিপাঠির সময়ে। তিনি ২০১৪ সালে রাজ্যপাল হন, যখন কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার। তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির রাজনৈতিক সংঘাত দ্রুত তীব্র হয়ে ওঠে। যদিও ত্রিপাঠীর সময়ে সংঘাত খুব বেশি প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হয়নি, তবু রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা এবং প্রশাসন নিয়ে তাঁর কিছু মন্তব্য তৃণমূল নেতৃত্বের অসন্তোষের কারণ হয়।
কিন্তু প্রকৃত সংঘাতের যুগ শুরু হয় ২০১৯ সালে জগদীপ ধনকর রাজ্যপাল হওয়ার পর। তাঁর সময়ে রাজভবন ও রাজ্য সরকারের সম্পর্ক প্রায় স্থায়ী সংঘর্ষে পরিণত হয়। ধনখর নিয়মিতভাবে টুইটার ও সংবাদমাধ্যমে রাজ্য সরকারের সমালোচনা করতেন—বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং আমলাতন্ত্র নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে তিনি সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন করছেন এবং কার্যত বিরোধী দলের রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করছেন। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয় যে মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে সামাজিক মাধ্যমে ব্লক করে দেন—যা ভারতের রাজ্যপাল-মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কের ইতিহাসে বিরল ঘটনা।