বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এমনিতেই উত্তপ্ত। তার উপর নির্বাচন ঘনিয়ে এলে প্রতিটি প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যেই রাজনৈতিক অর্থ খোঁজা শুরু হয়। এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে আর.এন. রবিকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে আনার খবর স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। প্রশ্ন উঠছে—এটি কি কেবল একটি স্বাভাবিক সাংবিধানিক নিয়োগ, না কি এর পেছনে বড় কোনো রাজনৈতিক হিসাব আছে? এবং সেই কারণেই কি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় উদ্বিগ্ন?
ভারতের সংবিধানে রাজ্যপালকে বলা হয় রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে সবাই জানে যে রাজ্যপাল নিয়োগের সিদ্ধান্ত কার্যত কেন্দ্রের সরকারের। অর্থাৎ বর্তমানে দিল্লিতে ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকারের রাজনৈতিক বিবেচনাই এখানে বড় ভূমিকা পালন করে। এই কারণেই ভারতের বহু রাজ্যে দেখা গেছে—যখনই কেন্দ্র ও রাজ্যে ভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, তখন রাজ্যপাল পদটি প্রায়ই সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে এই সংঘাত বারবার দেখা গেছে। রাজভবন ও নবান্নের সম্পর্ক বহুবার প্রকাশ্যে তিক্ত হয়েছে। কখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে, কখনও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে, কখনও প্রশাসনিক রিপোর্ট নিয়ে রাজ্যপাল ও রাজ্য সরকারের মধ্যে সরাসরি বিরোধ তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন রাজ্যপাল এলে তৃণমূল নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবেই ভাবতে শুরু করে—এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক অর্থ কী।
এই প্রেক্ষাপটে আর.এন. রবির ব্যক্তিগত পটভূমিও আলোচনায় এসেছে। তিনি মূলত একজন আইপিএস কর্মকর্তা ছিলেন এবং দীর্ঘদিন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই ধরনের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক চিন্তাভাবনা সাধারণত কঠোর এবং নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক হয়। অনেক সময় কেন্দ্র এমন কর্মকর্তাদেরই সাংবিধানিক পদে বসায় যাদের প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক বিশ্বস্ততা নিয়ে তাদের আস্থা আছে। ফলে বিরোধী দল শাসিত রাজ্যে এমন নিয়োগকে প্রায়ই “কেন্দ্রের নজরদারি বাড়ানো” হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়।
তবে এই সন্দেহের মধ্যেও একটি বাস্তব বিষয় মনে রাখা দরকার। ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোট পরিচালনার প্রকৃত ক্ষমতা রাজ্যপালের হাতে নেই। নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ মূলত চলে যায় ইলেক্শন কমিশন অব্ ইন্ডিয়ার হাতে। কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থেকে শুরু করে ভোটের সূচি নির্ধারণ—সবই নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে হয়। রাজ্যপাল সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনা করেন না।
কিন্তু রাজনীতির জগতে বাস্তব ক্ষমতার পাশাপাশি প্রতীকী ক্ষমতাও বড় বিষয়। নির্বাচনের আগে যদি কেন্দ্র হঠাৎ করে রাজ্যপাল বদলে দেয়, তাহলে তা অনেক সময় একটি রাজনৈতিক সংকেত হিসেবেও দেখা হয়—যে কেন্দ্র রাজ্যের পরিস্থিতির উপর বাড়তি নজর রাখছে। এই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্বেগকে পুরোপুরি অযৌক্তিক বলা যায় না।
অতএব বিষয়টি একেবারে সাদা-কালো নয়। একদিকে এটি সংবিধানসম্মত একটি নিয়োগ, অন্যদিকে ভারতের কেন্দ্র-রাজ্য রাজনীতির ইতিহাস বলছে যে রাজ্যপাল পদটি বহুবার রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সেই অভিজ্ঞতাই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।