Home দৃষ্টিভঙ্গিমগজাস্ত্রে শান নিজেকে বদলানোর স্টোইক কৌশল

নিজেকে বদলানোর স্টোইক কৌশল

0 comments 8 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: কেউ যদি বলে, “আমি একটা বই লিখব”, আমি সাধারণত খুব একটা বিশ্বাস করি না।

ওরা লিখতে পারে না বলে নয়। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ ভাবে, বইটা লেখা হয়ে গেলে জীবনটা বদলে যাবে — বেশি সম্মান, বেশি সাফল্য, বেশি তৃপ্তি।

স্টোইকরা বলতেন, ব্যাপারটা উল্টো।
বইটা তোমাকে বদলাবে না।
তোমার বদলটাই বইটা লিখিয়ে নেবে।

তুমি যদি এমন কিছু করতে চাও, যা আগে কখনও ভাবোনি তুমি পারবে , তাহলে আগে তোমাকে সেই মানুষটায় পরিণত হতে হবে, যে কাজটা করে।

“আমি বই লিখতে চাই” — এটা একরকম কথা।
“আমি সেই ধরনের মানুষ, যে বই লেখে” — এটা অন্যরকম।

এই পার্থক্যটাই আসল।

লক্ষ্য না, মানুষটাকে বদলাও

আমাদের বেশিরভাগ দিন কেটে যায় অটোপাইলটে।
ঘুম থেকে উঠে ফোন ধরা, একই অ্যাপ স্ক্রল করা, একই খাবার কেনা, একই রুটিন।

এগুলো আলসেমি না। এগুলো অভ্যাসের খাঁজ।

তুমি যদি বলো “আমি বদলাব”, কিন্তু একই জীবনযাপন করো, একই ভাবে ভাবো , তাহলে বদলটা টিকবে না।

স্থায়ী বদল মানে শুধু ইচ্ছাশক্তি না। স্থায়ী বদল মানে পরিচয় বদল।

যখন তুমি সত্যিই বদলে যাও, তখন আগের কাজগুলো অদ্ভুত লাগে।
আগে হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভি দেখেছ, এখন সেটা বিরক্তিকর লাগে।
আগে সারাদিন আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট করতে ভালো লাগত, এখন লাগে ফাঁপা।

কারণ তুমি অন্য মানুষ হয়ে গেছ।

“উইল পাওয়ার” বলে কিছু নেই?

স্টোইক দর্শনে একটা শব্দ আছে — prohairesis।
মানে, তোমার নির্বাচন করার ক্ষমতা। তোমার ইচ্ছা, উদ্দেশ্য, সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেন্দ্র।

এইটুকুই আসল “তুমি”।

তোমার শরীর, সম্পত্তি, নাম-ডাক, এমনকি তোমার ব্যক্তিত্বও, সবটাই গায়ের পোশাকের মতো।

শুনতে কঠিন লাগে, কিন্তু মানে হচ্ছে — তুমি যতটা ভাবো, তার চেয়ে অনেক বেশি বদলাতে পারো।

তুমি পাথর না। তুমি একটা প্যাটার্ন  যেটা নতুন করে আঁকা যায়।

“আমি এমনই” — এই ধারণাটা কোথা থেকে এল?

আমরা ছোটবেলা থেকে শুনি —
“আমি খুব অগোছালো”,
“আমি খুব সেনসিটিভ”,
“আমি লাজুক”,
“আমি এমনই”।

এই “আমি এমনই” কথাটাই ধরে নেয়, ভেতরে একটা স্থির, অপরিবর্তনীয় সত্তা আছে।

দার্শনিক René Descartes বলেছিলেন, “Cogito, ergo sum” — “আমি ভাবি, তাই আমি আছি।”

কিন্তু স্টোইকরা বলতেন, “আমি ভাবছি” বলার আগেই ধরে নেওয়া হচ্ছে একটা স্থির ‘আমি’ আছে।
হয়তো শুধু “ভাবনা হচ্ছে” — এইটুকুই সত্যি।

নিউরোসায়েন্সও দেখাচ্ছে, আমাদের মাথায় একটা সিস্টেম আছে যা সারাক্ষণ নিজের গল্প বানায় — “আমি কে”, “আমার কী হয়েছে”, “লোকজন কী ভাবছে”।

এই গল্পটাই আমাদের আলাদা সত্তার অনুভূতি দেয়।
এটা খারাপ না, বাঁচার জন্য দরকার।
কিন্তু যখন এটা অহং হয়ে যায়, তখন সমস্যার শুরু।

স্টোইকদের “চার মুখ” তত্ত্ব

স্টোইক দার্শনিক Panaetius of Rhodes-এর ধারণা পরে Cicero জনপ্রিয় করেন।

ওরা বলতেন, “self” আসলে চারটে স্তর বা ভূমিকার সমষ্টি —

১. সাধারণ মানব সত্তা — আমরা সবাই যুক্তিবোধ আর নৈতিক ক্ষমতা নিয়ে জন্মাই।
২. ব্যক্তিগত স্বভাব — তোমার আলাদা গুণ, প্রতিভা, দুর্বলতা।
৩. পরিস্থিতি — তুমি কোথায় জন্মেছ, কী পরিবারে, কী সুযোগ পেয়েছ।
৪. পছন্দের ভূমিকা — তুমি কী করবে, কী অভ্যাস গড়বে, কী পথ বেছে নেবে।

এই চারটার মধ্যে শেষটা — পছন্দ — পুরোপুরি তোমার হাতে।

মানে তুমি তোমার অভ্যাস, পেশা, আগ্রহ — এগুলো বেছে নিতে পারো। আর বারবার সেই বেছে নেওয়াই তোমাকে গড়ে তোলে।

তুমি ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো রহস্যময় সত্তা না।
তুমি তোমার করা কাজগুলোর সমষ্টি।

সংকটেই বোঝা যায়, বদল সম্ভব

দুঃখ, হার্টব্রেক, বড় বিপদ — এসব সময়ে মানুষ হঠাৎ বদলে যায়।

কারণ তখন পুরনো “আমি” আর কাজ করে না।

যখন পুরনো পরিচয় টিকে থাকার জন্য দরকারি থাকে না, তখন সেটা ঝরে পড়ে।

এই জন্যই সম্পূর্ণ বদল সম্ভব। কারণ “self” আসলে একটা টুল যা কাজের জন্য বানানো।

তাহলে কী করতে হবে?

ধরো তুমি ভোরে উঠতে চাও।
প্রথম ক’দিন কষ্ট হবে।
কারণ অভ্যাসের পুরনো খাঁজে তোমার ইচ্ছা গড়িয়ে পড়ছে।

কিন্তু তুমি যদি বারবার ভোরে ওঠো, লিখো, কাজ করো, ধীরে ধীরে তুমি “ভোরে ওঠা মানুষ” হয়ে যাবে।

শুরুতে অভিনয়।
পরে অভ্যাস।
তারপর পরিচয়।

তুমি কোনো স্থির বস্তু নও যে বদলাবে।
তুমি একটা চলমান প্যাটার্ন  যেটা নতুন করে আঁকা যায়।

বয়স ১৬ হোক বা ৬৫, বদল সম্ভব।

নিজেকে ধ্বংস করতে হবে না।
শুধু বুঝতে হবে — “আমি এমনই” কথাটা পুরো সত্যি নয়।

তোমার ভেতরে একটা বীজ আছে।
কীভাবে সেটা ফুটবে, সেই সিদ্ধান্ত তোমার।

এটাই স্টোইকদের আসল কথা।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles