Home বড় খবর ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা আরব দুনিয়ার

ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা আরব দুনিয়ার

0 comments 4 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত অবনতি হওয়া নিরাপত্তা পরিস্থিতি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলি বহু চেষ্টা করেছিল যাতে আমেরিকা–ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা না চালায়। কিন্তু এখন তেহরান যখন প্রতিশোধের আগুন ছড়িয়েছে, তখন সেই আগুনের শিখা এসে পড়েছে তাদের নিজেদের ভূখণ্ডেই।

ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলি কয়েক দশক ধরে সম্ভাব্য এক সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। তবু তেহরানের প্রতিশোধপরায়ণতার তীব্রতা এই অঞ্চলের সরকার ও সাধারণ মানুষ, উভয়কেই স্তম্ভিত করে দিয়েছে।

প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তেলসমৃদ্ধ ও আমেরিকার মিত্র আরব রাষ্ট্রগুলি নিজেদের নিরাপত্তা জোরদারে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। মার্কিন অস্ত্র ক্রয়ে তারা শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য হুমকি ঠেকাতে নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতিও দিয়েছে, এই বিশ্বাসে যে এতে ইরানকে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ থেকে নিরুৎসাহিত রাখা সম্ভব হবে। বর্তমানে পুরো অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যাদের হাতে রয়েছে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

দশকের পর দশক ধরে ইরান তার উপকূলের ওপারে মার্কিন সেনা উপস্থিতির বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়ে এসেছে। তেহরান বারবার সতর্ক করেছিল—আরব রাষ্ট্রগুলি যদি তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি রাখতে দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে তারা সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

এই সপ্তাহে এক বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ওই হামলায় আরও ৪৯ জন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাও প্রাণ হারিয়েছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ইরানের “পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা” এবং “ক্রমবর্ধমান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রাণঘাতী ড্রোন ভাণ্ডার” আর সহনীয় নয়।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যখন মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানের সন্নিকটে বিপুল সামরিক শক্তি সমাবেশ করছিল, তেহরান তখন বারবার সতর্ক করেছিল, গত গ্রীষ্মের ১২ দিনের যুদ্ধে তারা যে ‘সংযম’ দেখিয়েছিল, এবার তা আর দেখানো হবে না। সেই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল যখন ইজরায়েল আকস্মিকভাবে ইরানের ওপর হামলা চালায় এবং পরে আমেরিকাও সেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

তবু খামেনেইর হত্যার পর যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেল, তার মাত্রা অনেক পর্যবেক্ষকই কল্পনা করতে পারেননি। আঞ্চলিক সরকারগুলির দাবি, খামেনেইর মৃত্যুর পর থেকে ইরান পারস্য উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলির দিকে ৪০০-রও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ১,০০০ ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।

আরও বিস্ময়কর ছিল ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি-র দ্রুত উত্তরণ। যে কৌশলগুলি এতদিন ‘শেষ অস্ত্র’ বলে মনে করা হত, সেগুলি যুদ্ধের প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই প্রয়োগ করা হয়। উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলির নগরকেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো, বিমানবন্দর ও হোটেল লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়, ফলে তুলনামূলক স্থিতিশীল এই অঞ্চলে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

বৈপরীত্যের বিষয় এই যে, যে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলি কয়েক সপ্তাহ আগেই ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানে হামলা না করার অনুরোধ জানিয়েছিল, যুদ্ধ শুরু হতেই তারাই প্রথম আক্রমণের মুখে পড়ে।

মাত্র তিন দিনের মধ্যে ইরানের বিধ্বংসী আঘাতে উপসাগরীয় পর্যটন শিল্প কার্যত অচল হয়ে পড়ে, কিছু তেল ও গ্যাস স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলিতে বিমান চলাচল ব্যাহত হয়। কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হন, বহু সাধারণ মানুষ আহত হন, এবং বিশৃঙ্খলার এমন চিত্র তৈরি হয় যে শেষ পর্যন্ত ‘বন্ধু গুলিতে’ তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়।

ইরান তথাকথিত “মোজাইক ডিফেন্স” কৌশল গ্রহণ করে, জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এই কৌশলে বিকেন্দ্রীভূত সামরিক ইউনিটগুলি সাধারণ নির্দেশনার ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসামরিক ট্রাকের মতো দেখতে মোবাইল লঞ্চার থেকে স্বল্পমূল্যে তৈরি ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সহজেই উৎক্ষেপণ করা যায়।

ট্রাম্প প্রশাসন যদিও হেগসেথের ভাষায় “ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও নিখুঁত বিমান অভিযান” পরিচালনা করেছে, তবুও ইরান টানা তিন দিন ধরে তার প্রতিবেশীদের ওপর তাণ্ডব চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

ক্রমাগত হামলার জেরে আকাশপথ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয়। ফলে হাজার হাজার যাত্রী বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকে পড়েন। নিরাপত্তাজনিত কারণে বহু স্কুলে আবার অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা হয়। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত বাসিন্দারা ঘরবন্দি হয়ে পড়েন এবং জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে যায়।

আরাগচি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “আমরা আমাদের পূর্ব ও পশ্চিমে মার্কিন সেনাবাহিনীর পরাজয় নিয়ে দুই দশক ধরে অধ্যয়ন করেছি”, আফগানিস্তান ও ইরাকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন – “এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছি।” আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ইরানের সামরিক ইউনিটগুলি এখন ‘স্বাধীন’ ও ‘বিচ্ছিন্ন’ভাবে কাজ করছে, আগাম নির্ধারিত সাধারণ নির্দেশনার ভিত্তিতে বিভিন্ন ইউনিট স্বতন্ত্রভাবে অভিযান পরিচালনা করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আরব নেতারা তাঁদের নাগরিক ও প্রবাসী বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন—যারা স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির আশায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এসেছিলেন। কিন্তু সংঘাত যতই জটিল ও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠছে, ততই অস্বস্তি বাড়ছে; ধৈর্যও ক্ষীণ হতে শুরু করেছে।

এক জ্যেষ্ঠ উপসাগরীয় কর্মকর্তা বিশেষ করে সৌদি আরবের ওপর ইরানের হামলাকে “ভুল হিসাব” বলে আখ্যা দিয়ে জানান, তেহরান “ইসলামী ও আরব রাষ্ট্রগুলির সমস্ত সদিচ্ছা হারিয়েছে।” সংযুক্ত আরব আমিরাতের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রীম আল হাশিমি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত “আক্রমণের বৃষ্টি নেমে এলে চুপচাপ বসে থাকবে না।” কাতারও জানিয়েছে, তারা “প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ” করছে। সৌদি আরব বলেছে, নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় “প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা” এমনকি “প্রত্যাঘাতের বিকল্পও” তারা বিবেচনায় রাখবে।

আল হাশিমি স্বীকার করেন, “এটা অনেক বাসিন্দার জন্যই ভীতিকর সময়।” তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে “বিশ্বের সেরা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলির একটি” রয়েছে এবং দেশ নিরাপদ রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত অন্যতম সর্বোচ্চ প্রস্তুতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে স্থাপন করেছে। দেশটির হাতে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উন্নত মার্কিন সমর্থিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মাত্র দুই দিনের মধ্যে দেশটির দিকে নিক্ষিপ্ত, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ তারা সফলভাবে প্রতিহত করেছে। এই প্রতিরোধে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে মার্কিন সরবরাহকৃত টার্মিনাল হাই অ্যালটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ব্যবস্থা, যা অত্যন্ত উচ্চতায়—এমনকি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরেও—ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম। পাশাপাশি প্রতিবেশী কাতারেও প্রতিরোধ শক্তিশালী করতে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে।

তবে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা যখন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছেন, এবং ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো কৌশলগত লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়নি, তখন প্রশ্ন উঠছে—আরব রাষ্ট্রগুলি কতদিন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে পারবে? মজুত কত দ্রুত ফুরোবে?

অন্যদিকে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভাণ্ডার কতটা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট নয়। ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে শুরু করে এ সপ্তাহ পর্যন্ত চারটি বড় সরাসরি সংঘাতে ইরান প্রায় দুই ডজন তরঙ্গে হাজার হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইজরায়েল ও উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলিকে লক্ষ্য করে।

ইউরেশিয়া গ্রুপের ফিরাস মাকসাদ সিএনএন-কে বলেন, ইরানের হাতে দীর্ঘপাল্লার অস্ত্রের তুলনায় স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অনেক বেশি, সরাসরি উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের নাগালে পৌঁছাতে পারে। ফলে এই রাষ্ট্রগুলি সহজ লক্ষ্য। তার ভাষায়, “ইরানের হাতে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রচুর, এবং দ্রুত তৈরি করা যায় এমন হাজার হাজার আত্মঘাতী ড্রোন রয়েছে। দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র ফুরিয়ে এলে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু ক্রমশ জিসিসি রাষ্ট্রসমূহ এবং তাদের তেল অবকাঠামোর দিকে সরে যাচ্ছে।”

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ফারজিন নাদিমি মনে করেন, বর্তমান গতিতে ইরান প্রায় এক মাস উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির ওপর হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম। তবে যদি তারা গতি কমিয়ে প্রতিদিন একটি বা কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র, অথবা ৫০–৭০টি ড্রোন নিক্ষেপ করে, তাহলে বহু মাস ধরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলিকে চাপে রাখা সম্ভব।

মাকসাদের ভাষায়, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলি এখন “খুব কঠিন অবস্থানে” এবং আগামী কয়েক দিন ও সপ্তাহেও তারা এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই থাকবে বলেই আশঙ্কা।

উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলি এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি—একদিকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার স্থায়িত্বের প্রশ্ন, অন্যদিকে তেল অবকাঠামো ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ভবিষ্যৎ। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিন ও সপ্তাহের সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles