বাংলাস্ফিয়ার: সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে দ্রুত অবনতিশীল অর্থনীতি ইরানকে তার ইতিহাসের অন্যতম কঠিন পর্বে ঠেলে দিয়েছে। শনিবার অর্থনীতি স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের সরকারি বৈঠকে এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মহসেন রেজাই। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার এই বিরল স্বীকারোক্তি দেশের আর্থিক দুর্দশার গভীরতা সামনে এনেছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং সরকারের একাধিক শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী অভিঘাত, জাতীয় মুদ্রার পতন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই বৈঠক হয়। অর্থনীতিকে কীভাবে স্থিতিশীল করা যায়, তা নিয়েই আলোচনা হয় সরকারের সর্বোচ্চ স্তরে। তবে দেওয়া প্রতিবেদনে কোনও নির্দিষ্ট উদ্ধারপরিকল্পনার বিবরণ নেই।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই দেশটির মুদ্রা রিয়ালের দামে বড় পতন ঘটেছে। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে সেই পতন তীব্র হয়েছে। এর পটভূমিতে রয়েছে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা এবং নৌ অবরোধ কার্যকর করা। ফলে যুদ্ধের চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও গভীর বাধা।
রিয়ালের মূল্য কমে যাওয়ায় বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির খরচ বেড়েছে। তার ধাক্কা এসে পড়ছে দেশের বাজারে এবং সাধারণ পরিবারের বাজেটে। ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সংকট অবশ্য যুদ্ধ শুরুর আগেও ছিল। বর্তমান পরিস্থিতি সেই পুরনো দুর্দশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একই আয় দিয়ে সংসার চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে বেতনভোগী মানুষের জন্য।
গত ডিসেম্বরেও জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। নিরাপত্তাবাহিনী প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ করে সেই আন্দোলন দমন করে। সেই অভিজ্ঞতার পরে এখন অর্থনৈতিক অসন্তোষের নতুন প্রকাশ দেখা যাচ্ছে কর্মীদের বক্তব্য এবং অবসরপ্রাপ্তদের প্রতিবাদে। ফলে অর্থনীতি সামলানোর প্রশ্নটির সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ ও সরকারের প্রতি ক্ষোভের বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নৌ অবরোধ ইরানের তেল রপ্তানি বহুলাংশে আটকে দিয়েছে। তেলই দেশের আয়ের প্রধান উৎস। সেই রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরকারের হাতে অর্থ আসার গুরুত্বপূর্ণ পথ সংকুচিত হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানিসংকটও তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন। অর্থাৎ, সংকটের প্রভাব শুধু মুদ্রাবাজার বা আমদানির খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; জ্বালানির ক্ষেত্রেও তা দৃশ্যমান।
এই পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক দিনগুলিতে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রের কর্মীদের একাংশ সামাজিক মাধ্যমে চাকরি ছাড়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নার্স ও শিক্ষকেরাও রয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, বর্তমান বেতনে আর জীবনধারণের খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। কাজ থাকা সত্ত্বেও সংসার চালানোর সামর্থ্য হারানোর এই অভিযোগ বেতনভোগীদের ওপর ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
তবে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এই বক্তব্য থেকে কতজন বাস্তবে চাকরি ছেড়েছেন, তার হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে এমন কোনও সংখ্যাও দেওয়া হয়নি। তা সত্ত্বেও শিক্ষক ও নার্সদের মতো প্রয়োজনীয় পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের এই অসন্তোষ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তাঁদের আর্থিক অনিশ্চয়তার প্রশ্নটি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
অন্যদিকে, ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীরাও প্রতিবাদে নেমেছেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রাপ্য পেনশনের পুরো অর্থ তাঁরা পাননি। মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে পেনশন অসম্পূর্ণ থাকলে অবসরজীবীদের সংসারে চাপ আরও বাড়ে। ফলে কর্মরত মানুষের বেতনের সংকটের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্তদের আয়ের অনিশ্চয়তাও অর্থনৈতিক দুরবস্থার আরেকটি দিক হিসেবে সামনে এসেছে।
রেজাইয়ের সতর্কবার্তা এমন সময়ে এল, যখন মুদ্রার পতন, রপ্তানি আয়ে ধাক্কা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। সরকারের সামনে তাই অর্থনীতি স্থিতিশীল করার পাশাপাশি বেতন ও পেনশনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের দুর্দশা সামলানোর প্রশ্নও রয়েছে। শনিবারের বৈঠক সেই সংকটের গুরুত্ব তুলে ধরলেও, সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বস্তি কবে ফিরবে, দেওয়া তথ্যে তার কোনও উত্তর মেলেনি।