জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ঘিরে হিংসা, ভাঙচুর ও লুটপাটের জেরে মিলানে ৫০০ সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিল ইতালির সরকার। একই পথে হাঁটছে ফ্রান্সও। আগামী শনিবারের বিক্ষোভ সামাল দিতে সেনা মোতায়েনের কথা ঘোষণা করেছে প্যারিস। ইতালির সরকারের হুঁশিয়ারি, হিংসার জবাবে এ বার ‘কঠোর পদক্ষেপ’ করবে রাষ্ট্র। আগামী শনিবার ফের বিক্ষোভের কর্মসূচি থাকায় ইউরোপের দুই দেশেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
কট্টর দক্ষিণপন্থী প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনির সরকার একগুচ্ছ নতুন নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে। বিক্ষোভে হিংসাত্মক কার্যকলাপকে পৃথক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, দাঙ্গায় জড়িতদের শাস্তি আরও কঠোর করা এবং ভাঙচুর বা লুটপাটে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের অংশগ্রহণের জন্য অভিভাবকদের আর্থিক দায়বদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে সেই তালিকায়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ মঙ্গলবার জানিয়েছেন, আগামী শনিবারের বিক্ষোভ চলাকালীন কিছু সেনা মোতায়েন করা হবে। তাঁর কথায়, এর মূল উদ্দেশ্য, ‘পুলিশ ও জঁদার্ম বাহিনীকে অন্যান্য দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত করা’।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুও সংসদে জানিয়েছেন, শনিবারের বিক্ষোভে ‘বিপুলসংখ্যক’ পুলিশ মোতায়েন করা হবে। গত সপ্তাহান্তের হিংসাত্মক সংঘর্ষের পর তাঁর লক্ষ্য, ‘অবিলম্বে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা’।
উত্তর ইতালির মিলানে শনি ও রবিবারের অশান্তির ঘটনায় ২৭১ জন তরুণকে আটক করেছে পুলিশ। অভিযোগ, মাথা-মুখ ঢাকা একদল যুবক আবর্জনার পাত্রে আগুন লাগায়, দোকানপাট তছনছ করে এবং জানলার কাচ ভাঙে। শহরের বিখ্যাত ক্যাথিড্রাল সংলগ্ন এলাকাতেও চলে ভাঙচুর।
প্রথমে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও তার একাংশে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। সোমবার পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ জন বিদেশি নাগরিক। আরও ২৮ জনের বিরুদ্ধে বিচারবিভাগীয় কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে।
সপ্তাহান্তের সংঘর্ষের পর মিলানের বিলাসবহুল বিপণিগুলিতেও সতর্কতা জারি হয়েছে। গ্যালারিয়া ভিত্তোরিও এমানুয়েলে সেকোন্দোয় শ্যানেল, টিফানি ও ডিয়োরের মতো সংস্থা তাদের শোকেস থেকে দামি পণ্য সরিয়ে নিয়েছে। ফ্যাশনপাড়ার একাধিক বিপণি বন্ধও রাখা হয়েছে।
ফ্রান্সেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। শনিবারের সংঘর্ষের ছবি ও ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, উত্তেজিত জনতা দোকানপাট লুট করছে এবং সরকারি ভবনে আগুন লাগানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা, চিন ও জার্মানি-সহ কয়েকটি দেশ নিজেদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণসংক্রান্ত সতর্কতা জারি করেছে। সাম্প্রতিক কালের অন্যতম ভয়াবহ এই অশান্তিতে প্রায় ২,৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সোমবার প্যারিস, বোর্দো, লিল ও নিস-সহ একাধিক শহরের নির্দিষ্ট অংশে কার্ফু জারি করে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। তুলনামূলক শান্ত একটি রাত কাটার পর মঙ্গলবার লেকর্নু জানান, প্রয়োজন অনুযায়ী আরও এলাকায় কার্ফু জারি করা হতে পারে।
প্যারিসে রাতের কার্ফুর মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। মঙ্গলবার রাত ১১টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত প্লাস দ্য লা রেপুব্লিক এবং শহরের কেন্দ্রস্থলের লে আল বাণিজ্যিক এলাকায় তা বলবৎ থাকবে। সপ্তাহান্তে প্যারিসের একাধিক সংঘর্ষের কেন্দ্র ছিল এই রেপুব্লিক চত্বর।
নিরাপত্তা জোরদার করতে প্যারিস পুলিশ ক্যান বা বোতলে পেট্রল ও গ্যাস বহনের উপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কয়েকটি এলাকায় মুখোশ ও হেলমেট পরাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ দিকে, লিমোজের ঐতিহাসিক টাউন হলে আগুন লাগানোর ঘটনায় এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেলোনি সরকারের বিবেচনাধীন নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাগুলির মধ্যে একটি বিশেষ ভাবে দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী তরুণদের লক্ষ্য করে তৈরি। প্রান্তিক এলাকার তরুণদের দল বা গ্যাং বোঝাতে ইতালিতে ‘মারান্জা’ শব্দটি কথ্য ভাষায় ব্যবহৃত হয়।
মিলানে আরও অশান্তির আশঙ্কায় বিলাসবহুল বিপণিগুলির পাশাপাশি অন্যান্য দোকানেও সতর্কতা জারি রয়েছে। ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, ভাঙচুরের শিকার হয়েছে ক্রীড়াসামগ্রীর বিপণি ডেকাথলন, আউটডোর পোশাকের সংস্থা আর্ক’টেরিক্স এবং মোবাইল পরিষেবা সংস্থা ভোডাফোনের দোকানও।
সোমবার শীর্ষ নিরাপত্তা আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর ইতালির বিদেশমন্ত্রী তথা উপপ্রধানমন্ত্রী আন্তোনিয়ো তাজানি বলেন, ‘রাষ্ট্রের ওপর এই হামলার জবাবে সরকার কঠোর পদক্ষেপ করবে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের হিংসা দমনের ব্যবস্থাও তার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’
আগামী বছর সাধারণ নির্বাচনের মুখোমুখি হতে চলেছে মেলোনির জোট সরকার। তার আগে জ্বালানির দাম নিয়ে দক্ষিণ ইতালিতে লরি চালকদের কয়েক দিনের বিক্ষোভ এবং সড়ক অবরোধের জেরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। অবরোধের ঘটনায় শাস্তি আরও কঠোর করার পরিকল্পনাও করছে সরকার বলে খবর।
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন ইতালি ও ফ্রান্স—দুই দেশেই আইনশৃঙ্খলার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শনিবারের নতুন কর্মসূচির আগে তাই সেনা ও পুলিশের উপস্থিতি বাড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেই মরিয়া দুই দেশের সরকার।