বাংলাস্ফিয়ার: ইজরায়েলের অধিকৃত ভূখণ্ডে অবৈধ বসতির সঙ্গে বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও দুই দেশের গোয়েন্দা সহযোগিতায় ছেদ পড়বে না বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ বিদেশসচিব এড মিলিব্যান্ড। তাঁর দাবি, আগের মতোই তথ্য বিনিময় চলবে বলে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের আশ্বাস দিয়েছে ইজরায়েলের সংস্থা। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার জেরে নিরাপত্তা সহযোগিতা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা খারিজ করতেই এই তথ্য প্রকাশ করেছেন তিনি।
ব্রিটেনের সিদ্ধান্তের বিরোধীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, অবৈধ বসতির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিলে ইজরায়েল গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করতে পারে। কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সহযোগিতাকে উভয় পক্ষই নিজেদের স্বার্থের অনুকূল বলে মনে করে। দুই সরকারের রাজনৈতিক বিবাদের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা আগ্রহী নয়। মিলিব্যান্ডের বক্তব্য, ব্রিটেনের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্য ইজরায়েলের দখলদারি কিংবা গাজা ও পশ্চিম তীরে তার কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেনি।
বুধবার স্কাই নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মিলিব্যান্ড জানান, নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগেই আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা করেছিল ব্রিটেন। পশ্চিম তীরের বসতি স্থাপনকারীদের নিয়ন্ত্রণে ইজরায়েল সরকারের অনীহা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে হতাশা বাড়ছে বলে তাঁর দাবি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ ঘোষিত গাজার জন্য ২০ দফা পরিকল্পনায় ইজরায়েলের পূর্ণ সহযোগিতার অভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। মিলিব্যান্ডের বিশ্বাস, এই উদ্বেগের কিছুটা ওয়াশিংটনও ভাগ করে।
ব্রিটিশ বিদেশসচিবের যুক্তি, পদক্ষেপটি শুধু নীতিগত অবস্থানের প্রকাশ নয়; এর সঙ্গে ব্রিটেনের স্বার্থও যুক্ত। ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইনের মধ্যে বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার অন্যতম উৎস। পৃথক ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের ভিত্তিতে সমাধানকে তিনি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের হিংসাত্মক আচরণ সেই সম্ভাবনাকেই দুর্বল করছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ব্রিটেনের সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা করেনি হোয়াইট হাউস। সোমবার ট্রাম্প ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের আলোচনার পাশাপাশি নিচুতলার কূটনৈতিক আদানপ্রদানের পর এই অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞাকে সরাসরি সমর্থন করেননি। তবে পশ্চিম এশিয়ায় বৃহত্তর স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য যে আমেরিকাও সমর্থন করে, তা জানিয়েছেন। ফলে আপাতত বিরোধ এড়িয়েছে দুই মিত্রদেশ।
এই নীরবতার পিছনে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপও দেখিয়েছে গার্ডিয়ান। মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে লড়াইয়ে ব্যস্ত ট্রাম্প। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তে তাঁকে প্রভাবিত করেছিলেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। যুদ্ধের ধাক্কায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাড়তি জ্বালানি খরচ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি কিছু ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর হিংসাত্মক কার্যকলাপ নিয়ে আমেরিকায় দুই দলের মধ্যেই উদ্বেগ রয়েছে।
ব্রিটেনের উদ্যোগে কানাডা ও ফ্রান্সও বসতির সঙ্গে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞায় যোগ দিয়েছে। মঙ্গলবার ঘোষিত ব্যবস্থাগুলির মধ্যে এই যৌথ সিদ্ধান্ত ছিল চমক। আরও আটটি ইউরোপীয় দেশ একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া অথবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে তা সমর্থনের ইচ্ছা জানিয়েছে। তবে তাদের কয়েকটি দেশ আগেই পৃথক ব্যবস্থা নিয়েছিল, কিংবা দীর্ঘদিন ধরে ইজরায়েলের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যচুক্তি স্থগিত করার দাবি জানাচ্ছিল।
ফ্রান্সের যোগদানের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় শেষ মুহূর্তে। ৩ সেপ্টেম্বর লন্ডন সফরে বার্নহ্যামের সঙ্গে দেখা করেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ। এর আগে এপ্রিলে ফ্রান্স ও সুইডেন যৌথভাবে অধিকৃত ভূখণ্ডে উৎপাদিত পণ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা অথবা শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু জার্মানি, ইতালি ও বুলগেরিয়াসহ কয়েকটি দেশের বাধায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্তরে উদ্যোগটি এগোয়নি। ইউরোপীয় কমিশনের তরফেও আপত্তি উঠেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
গত বছর পৃথক প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতায় নেতৃত্ব দিয়েছিল ফ্রান্স। দুই রাষ্ট্রের ভিত্তিতে সমাধান টিকিয়ে রাখার জন্য সেই স্বীকৃতিকে জরুরি বলে তুলে ধরেছিল প্যারিস। তবে পরবর্তী সময়ে সেই উদ্যোগের গতি কমে আসে। গাজায় মানবিক সাহায্য বাড়ানোর বিষয়েও নতুন আলোচনা হতে চলেছে। চলতি মাসের শেষদিকে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালীন এ নিয়ে যৌথ বৈঠক করবে ব্রিটেন ও জর্ডন।
ইজরায়েলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে ব্রিটেন। পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত এই ব্যবস্থায় জ্বালানি, সফটওয়্যার, ধাতু, সোনা এবং সংশ্লিষ্ট জাহাজ পরিবহণ, বিমা ও ব্যাঙ্কিং কার্যকলাপ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে চিহ্নিত ইরানি জাহাজও এর আওতায় পড়বে। অধিকাংশ ইরানি বিমানকে ব্রিটেনে নামতে দেওয়া হবে না। পরমাণু বিস্তার রোধের দায়বদ্ধতা ইরান লঙ্ঘন করছে, এমন একটি প্রস্তাব রাষ্ট্রপুঞ্জে সমর্থনের কথাও জানিয়েছে লন্ডন।
ব্রিটিশ ঘোষণার আগে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে আর্জেন্টিনার দাবিকে তিনি সমর্থন করতে পারেন। নেতানিয়াহুর ছেলেও এমন প্রস্তাব তুলেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের নতুন ব্যবস্থাকে ওয়াশিংটনের পছন্দ হওয়ার মতো পদক্ষেপ হিসেবে দেখিয়েছে গার্ডিয়ান। অর্থাৎ, ইজরায়েল প্রশ্নে চাপ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইরান প্রশ্নেও কঠোর অবস্থান প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সরকার।
অন্যদিকে, পাল্টা একাধিক কূটনৈতিক ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে ইজরায়েল। অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করার কথা জানিয়েছে তারা। দক্ষিণ ইজরায়েলের কিরিয়াত গাতে আন্তর্জাতিক গাজা সহায়তা কেন্দ্র থেকে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণাও এসেছে। পশ্চিম তীরে প্যালেস্টাইনি কর্তৃপক্ষের বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটেনের ভূমিকা শেষ করা হবে। মূলত বামপন্থী ১২ জন ব্রিটিশ সাংসদের ইজরায়েলে প্রবেশও নিষিদ্ধ করার কথা জানানো হয়েছে।
বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের উপর ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে অন্তত ছয় মাস লাগবে। কিন্তু ঘোষণার পরেই কূটনৈতিক চাপ ও পাল্টা ব্যবস্থার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মিলিব্যান্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই টানাপড়েনের মধ্যেও গোয়েন্দা সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। এখন নজর থাকবে, বাণিজ্যিক চাপ পশ্চিম তীরে ইজরায়েলের নীতিতে কোনও পরিবর্তন আনে কি না এবং ইউরোপের অন্য দেশগুলি ঘোষিত সমর্থনকে কতটা বাস্তব পদক্ষেপে পরিণত করে।