পশ্চিম তীরে মার্কিন চিত্রসাংবাদিক হাইডি লেভিনের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলাকে ‘ঘৃণ্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বললেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৬৩ বছরের সাংবাদিকের অস্ত্রোপচার হয়েছে। হামলাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
ওয়াশিংটন পোস্টের চিত্রসাংবাদিক হাইডি লেভিনের ওপর হামলাকে ‘ঘৃণ্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে তীব্র নিন্দা করলেন ইজরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি। বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় গুরুতর জখম ৬৩ বছরের এই সাংবাদিকের অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবিও জানিয়েছেন হাকাবি।
গত শুক্রবার দখলকৃত পশ্চিম তীরে প্যালেস্টিনীয়দের জলপাই সংগ্রহের সময় হামলা চালায় একদল মুখোশধারী ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারী। সেই সময়ই আক্রান্ত হন ইজরায়েলে বসবাসকারী, একাধিক পুরস্কারপ্রাপ্ত মার্কিন চিত্রসাংবাদিক লেভিন। প্যালেস্টিনীয় কৃষকদের ওপর লাঠি ও অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে হামলা চালাচ্ছিল ওই দল।
তেল আভিভের কাছে পেতাহ টিকভার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন লেভিন। তাঁর হাতে অস্ত্রোপচার হয়েছে, ভেঙেছে পাঁজরের হাড়, শরীরের অন্যান্য অংশেও রয়েছে আঘাত। সাংবাদিকের অভিযোগ, দশ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে তাঁকে মারধর করা হয়। হামলাকারীরা তাঁর ক্যামেরা, পাসপোর্ট ও ফোনও ছিনিয়ে নেয়।
লেভিনের কথায়, “আমার ওপর হামলা চালানো হয়, আমাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। সৌভাগ্যক্রমে আমার গায়ে সুরক্ষা-জ্যাকেট আর মাথায় হেলমেট ছিল। তা না হলে সম্ভবত আজ আমি বেঁচেই থাকতাম না। কারণ, ওরা আমাকে একের পর এক লাথি মেরেই যাচ্ছিল।” তাঁর প্যালেস্টিনীয় সহকর্মীরা এগিয়ে এসে তাঁকে বাঁচানোর পরেই হামলা থামে বলে জানিয়েছেন তিনি।
‘কাপুরুষোচিত সন্ত্রাস’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণপন্থী মিত্র হিসেবে পরিচিত হাকাবি বরাবরই কট্টর ইজরায়েলপন্থী অবস্থানের জন্য আলোচনায় থেকেছেন। কিন্তু লেভিনের ওপর হামলার নিন্দা করতে গিয়ে এ বার তাঁর ভাষা ছিল অত্যন্ত কড়া। ঘটনাটিকে ‘নৃশংস ও কাপুরুষোচিত হামলা’ বলে বর্ণনা করেন তিনি।
শনিবার সমাজমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া পোস্টে হাকাবি উল্লেখ করেন, লেভিন মার্কিন নাগরিক এবং তাঁকে যে সাংবাদিক হিসেবে স্পষ্টভাবে চেনা যাচ্ছিল, তা নিয়ে কোনও সংশয় ছিল না।
তিনি লেখেন, “আমরা পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছি। এই ঘটনায় যারা অংশ নিয়েছে, তাদের প্রত্যেককে গ্রেফতার করে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করতে বলেছি। একজন মহিলা চিত্রসাংবাদিকের ওপর হামলা মুখোশধারী কাপুরুষদের সংঘটিত এক ঘৃণ্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। অর্থহীন হিংসার এক লজ্জাজনক ঘটনা।”
ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু অবশ্য এই ঘটনায় ‘যে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে হিংসা’র নিন্দা করলেও হামলার বিষয়টিকে ‘অভিযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ঘটনাটি ঘটেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
রবিবার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লেভিন বলেন, তাঁর ও অন্যদের ওপর হামলাকে নেতানিয়াহু নিছক ‘অভিযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন শুনে তিনি ‘স্তম্ভিত ও অপমানিত’ বোধ করেছেন। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রীর সামনে “সমস্ত প্রমাণই ছিল”।
অন্যদিকে, ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ ফোন করে বসতি স্থাপনকারীদের হিংসার তীব্র নিন্দা করেছেন বলে জানিয়েছেন লেভিন। দেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন প্রাক্তন শীর্ষকর্তাও একটি চিঠিতে এই হামলার জন্য লজ্জা প্রকাশ করেছেন।
‘হাড় ভেঙেছে, মনোবল নয়’
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলে সাংবাদিকতা করছেন লেভিন। তাঁর কথায়, “আমি চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলের খবর করছি। কিন্তু এই দেশকে আজ যে অবস্থায় দেখছি, এর আগে কখনও এমন অবস্থায় দেখিনি।” হামলার জন্য ‘ইহুদি সন্ত্রাসবাদীদের’ দায়ী করেছেন তিনি।
তবে এই হামলা তাঁর কাজের ইতি ঘটাতে পারবে না বলেই স্পষ্ট জানিয়েছেন লেভিন। আঘাত সেরে উঠলে ফের কাজে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। সাংবাদিকের কথায়, “কয়েক দশক ধরে এই কাজের পিছনে আমার রক্ত, ঘাম আর চোখের জল রয়েছে। ওরা আমার হাড় ভেঙেছে, আমার মনোবল ভাঙতে পারেনি।”
এ বার নিশানায় ইউরোপীয় কূটনীতিক
প্যালেস্টিনীয় কৃষক ও লেভিনের ওপর হামলার পর শনিবার ফের বসতি স্থাপনকারীদের হিংসার ঘটনা ঘটে। এ বার আক্রান্ত হন দখলকৃত পশ্চিম তীর সফরে যাওয়া ইউরোপীয় কূটনীতিকেরা, ফ্রান্সের এক মেয়র এবং ফরাসি শহর কঁব্রের আর্চবিশপ।
ফ্রান্সের অলনোয়া-এমেরি শহরের মেয়র বের্নার বোদো তখন তাঁর পদমর্যাদার পরিচায়ক লাল-সাদা-নীল ফিতা পরে ছিলেন। কূটনৈতিক নম্বরপ্লেট লাগানো একটি গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করার সময় তাঁকে আক্রমণ করে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। এক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, হামলার সময় এক মুখোশধারী উগ্রপন্থী চিৎকার করে বলে ওঠে, “ফ্রান্স দীর্ঘজীবী হোক!”
সাতজনের ওই দল বোদোর স্ত্রী এবং কঁব্রের আর্চবিশপ ভাঁসঁ ডলমানকেও হুমকি দেয়। তাদের কয়েকজনের হাতে লাঠি ছিল।
খ্রিস্টান-অধ্যুষিত তাইবেহ শহরের জমিতে জলপাই সংগ্রহে যোগ দিতে গিয়েছিলেন ওই প্রতিনিধিরা। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন জেরুসালেমে নিযুক্ত ফরাসি কনসাল জেনারেল, তাঁর স্ত্রী, অন্য কূটনীতিকেরা এবং বেলজিয়াম ও পোল্যান্ডের কনসালরা।
হামলার পর ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বোদো বলেন, “আমার মনে হয়, বসতি স্থাপনকারীরা যদি এভাবে আচরণ করে, তবে ইজরায়েল সরকারের দিক থেকে তা সহ্য করা হচ্ছে। কী ঘটছে, গোটা বিশ্বের তা জানা দরকার। আমি তো নিজের দেশে ফিরে যাব, আমার সব ঠিক হয়ে যাবে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ যাঁদের পোহাতে হচ্ছে এবং হবে, তাঁরা এখানকার মানুষ।”
জলপাইয়ের মরসুমেও হিংসা
আগামী ২৭ অক্টোবরের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনকে সামনে রেখে পশ্চিম তীরে হিংসা বাড়ছে। প্যালেস্টিনীয়দের বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের কাজে বারবার বাধা দিচ্ছে ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু বসতি সম্প্রসারণের সমর্থক দক্ষিণপন্থীদের মধ্যে নিজের সমর্থন আরও মজবুত করার চেষ্টা করছেন।
ফ্রান্সের বিদেশমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো ইজরায়েলকে অবিলম্বে ‘অপরাধমূলক হিংসা’ বন্ধ করতে এবং বোদোর ওপর হামলায় জড়িতদের গ্রেফতার করতে বলেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও হামলার নিন্দা করে পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি, প্যালেস্টিনীয়দের বিরুদ্ধে চলতে থাকা হিংসা ও হেনস্থা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছে তারা। চলতি জলপাই সংগ্রহের মরসুমে প্যালেস্টিনীয় কৃষক ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা ঠেকানোর বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে ইইউ।
ইউরোপীয় কমিশনের নির্বাহী ভাইস-প্রেসিডেন্ট তেরেসা রিবেরা আরও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। হাসপাতালের শয্যা থেকে দেওয়া লেভিনের একটি সাক্ষাৎকার পোস্ট করে তিনি লেখেন, “ওরা চায় কোনও সাক্ষী না থাকুক।”
ইজরায়েলের বিদেশ মন্ত্রক কূটনীতিকদের ওপর হামলার নিন্দা করেছে। ইজরায়েলি পুলিশও তদন্ত শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
শনিবার লেভিনকে ফোন করেন ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট হারজগ। হামলাকে ‘চরম নিন্দনীয় ও স্তম্ভিত করে দেওয়ার মতো’ বলে বর্ণনা করে তিনি জানান, ঘটনাটি তাঁর বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত প্রাক্তন সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটও এই হিংসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এর ফলে “ইজরায়েল রাষ্ট্রের যেটুকু বৈধতা এখনও অবশিষ্ট রয়েছে, তা-ও পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে”। এই হামলাগুলিকে তিনি “ইজরায়েল সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ইহুদি সন্ত্রাসবাদ” বলে বর্ণনা করেন।
এর মধ্যেই রবিবার নিজের ট্রুথ সোশ্যাল নেটওয়ার্কে নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচনের পক্ষে সমর্থন জানান ট্রাম্প। তাঁকে “এক মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী এবং ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের মোকাবিলায় শান্তি প্রতিষ্ঠার আরও মহান সহযোগী” বলে প্রশংসা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের কথায়, “প্রবল বিরোধিতার মুখেও বিবি নেতানিয়াহু শক্তিশালী, সাহসী ও অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। এমনকি ইজরায়েলের ভিতর থেকেই আসা বিরোধিতার মুখেও।”
বিচার কোথায়?
লেভিনের ওপর হামলার পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি ফের জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট। তবে বসতি স্থাপনকারীদের হিংসার ঘটনায় ইজরায়েলে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
ইজরায়েলের মানবাধিকার সংগঠন ইয়েশ দিনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সাল থেকে বসতি স্থাপনকারীদের হিংসা নিয়ে হওয়া তদন্তের প্রায় ৯৪ শতাংশই শেষ হয়েছে কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন ছাড়াই। মাত্র ৩ শতাংশ তদন্তের পরিণতিতে অন্তত কিছু অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করার রায় এসেছে।
লেভিনের ওপর হামলা এবং ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা তাই আরও এক বার সামনে আনল পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হিংসা, প্যালেস্টিনীয়দের নিরাপত্তা এবং অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্ন।