লগইনসদস্যতালেখক
হোম›আন্তর্জাতিক›আমেরিকা›ভাগবতের নিউইয়র্ক সফরের পরই আরএসএস-এর রাজনৈতিক অনুদান বয়কটের ডাক মার্কিন জনপ্রতিনিধিদের
আমেরিকা

ভাগবতের নিউইয়র্ক সফরের পরই আরএসএস-এর রাজনৈতিক অনুদান বয়কটের ডাক মার্কিন জনপ্রতিনিধিদের

নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবতের ‘বিশ্বজনীন একাত্মতা’র বার্তার ঠিক দু’দিন পরেই মার্কিন রাজনীতিতে সঙ্ঘের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাবের বিরুদ্ধে সংগঠিত অবস্থান নিলেন প্রায় ৯০ জন নির্বাচিত…

ভাগবতের নিউইয়র্ক সফরের পরই আরএসএস-এর রাজনৈতিক অনুদান বয়কটের ডাক মার্কিন জনপ্রতিনিধিদের

নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবতের ‘বিশ্বজনীন একাত্মতা’র বার্তার ঠিক দু’দিন পরেই মার্কিন রাজনীতিতে সঙ্ঘের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাবের বিরুদ্ধে সংগঠিত অবস্থান নিলেন প্রায় ৯০ জন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও প্রার্থী। তাঁরা অঙ্গীকার করেছেন, আরএসএস বা তার সহযোগী সংগঠন ও ব্যক্তিদের সঙ্গে যুক্ত কোনও রাজনৈতিক অনুদান গ্রহণ করবেন না। ইতিমধ্যে নেওয়া হয়ে থাকলে সেই অর্থ ফেরত দেবেন অথবা গণতন্ত্র রক্ষায় নিয়োজিত সংগঠনকে দান করবেন।

‘হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটস অ্যাকশন’ এবং ‘সাউথ এশিয়ান আমেরিকান কোয়ালিশন টু রিনিউ ডেমোক্রেসি’ বা ‘স্যাক্রেড অ্যাক্টস’ সোমবার ছয় পৃষ্ঠার এই অঙ্গীকারপত্র প্রকাশ করেছে। স্বাক্ষরকারীরা আমেরিকার আটটি অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কংগ্রেস সদস্য, প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য, মেয়র, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাই বেশি হলেও রিপাবলিকান রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনও এতে সম্মতি দিয়েছেন বলে উদ্যোক্তাদের দাবি। অঙ্গীকারপত্রে আর্থিক অনুদান প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি রাজনৈতিক হিংসা ও ভয় দেখানোর বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত মুখ ওয়াশিংটনের প্রমীলা জয়পাল, ক্যালিফর্নিয়ার রো খন্না এবং ইলিনয়ের রবিন কেলি—তিনজনই মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য। তালিকায় রয়েছেন মিশিগানের ডেমোক্র্যাট সেনেট প্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদ, মার্কিন প্রতিনিধি হ্যালি স্টিভেন্স এবং নিউইয়র্কের কংগ্রেস প্রার্থী ব্র্যাড ল্যান্ডার। ভাগবতের অনুষ্ঠানের প্রতিবাদে ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনের বাইরে যে সমাবেশ হয়েছিল, তাতে ল্যান্ডার উপস্থিত ছিলেন।

অঙ্গীকারকে কেবল প্রতীকী ঘোষণায় সীমাবদ্ধ রাখেননি রো খন্না। তিনি জানিয়েছেন, সম্প্রতি এক ‘ট্রাম্পপন্থী, সঙ্ঘের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ধনকুবেরের’ কাছ থেকে পাওয়া ৬,৬০০ ডলার তিনি ফেরত দিচ্ছেন বা অন্যত্র দান করছেন। তবে ওই দাতার নাম প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলিতে জানানো হয়নি। খন্নার বক্তব্য, আরএসএসকে আমেরিকায় রাজনৈতিক কার্যনির্বাহী সমিতি গঠন করে কিংবা অন্য পথে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া হবে না। সঙ্ঘের ‘বিশ্ব গণতন্ত্রের উপর আক্রমণ’ প্রতিহত করার অঙ্গীকারে নেতৃত্ব দিতে পেরে তিনি গর্বিত বলেও মন্তব্য করেছেন।

খন্নার অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই জনপ্রতিনিধির সঙ্গে অতীতে বিভিন্ন হিন্দু-মার্কিন সংগঠনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ২০২৩ সালে দ্য নেশন জানিয়েছিল, আগের ১২ বছরে হিন্দুত্বপন্থী বলে চিহ্নিত মার্কিন দাতাদের কাছ থেকে তিনি এক লক্ষ দশ হাজার ডলারের বেশি অনুদান পেয়েছিলেন। খন্না তখন বলেছিলেন, তাঁর হাজার হাজার দক্ষিণ এশীয় দাতা রয়েছেন; প্রত্যেকের ভারতীয় রাজনীতি-সংক্রান্ত মতামত তাঁর পক্ষে যাচাই করা সম্ভব নয়। ক্যালিফর্নিয়ার নাগরিক অধিকার আইনে জাতপাতকে সুরক্ষিত পরিচয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবেও তিনি সরাসরি সমর্থন দেননি।

‘স্যাক্রেড অ্যাক্টস’-এর নির্বাহী পরিচালক পুষ্কর শর্মার দাবি, গত এক দশকে শুধু ইলিনয়েই আরএসএস-যোগ রয়েছে এমন ব্যক্তিরা ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই শিবিরের প্রচারে অন্তত ২৫ লক্ষ ডলার দিয়েছেন। তবে এই পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট দাতাদের ‘সঙ্ঘ-যুক্ত’ হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস উদ্যোক্তা সংগঠনগুলির নিজস্ব; তার স্বাধীন যাচাই এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। মার্কিন নির্বাচনী অর্থের জটিল ব্যবস্থায় ব্যক্তি, রাজনৈতিক তহবিল, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ও মধ্যবর্তী সংগঠনের মাধ্যমে অর্থ চলাচল করে। ফলে শুধু নির্বাচনী নথিতে ‘আরএসএস’ নাম খুঁজে এই যোগ শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

এই পদক্ষেপ এসেছে ভাগবতের ২৯ আগস্টের নিউইয়র্ক বক্তৃতাকে ঘিরে প্রবল বিতর্কের মধ্যে। সেখানে ভাগবত বৈচিত্র্যকে গ্রহণ, সম্মান ও সংরক্ষণের কথা বলেন এবং জানান, ভারতে মুসলমানদের স্থান নেই বলে বিশ্বাসকারী নিজেকে হিন্দু বলতে পারেন না। কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য, এই সহাবস্থানের ভাষার সঙ্গে ভারতে সঙ্ঘ পরিবারের রাজনীতি ও সংখ্যালঘুদের অভিজ্ঞতার মিল নেই।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি অনুষ্ঠানটির বিরোধিতা করে বলেছিলেন, তাঁর পরিচিত ভারত হল বহুত্ববাদী ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র; সঙ্ঘের দৃষ্টিভঙ্গি সেই ধারণার পরিপন্থী। তবে বেসরকারি অনুষ্ঠান বাতিল করার অধিকার নগর প্রশাসনের নেই বলেও তিনি স্বীকার করেন।

এর আগে মার্কিন আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন সঙ্ঘের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং ভাগবতের ভিসা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছিল। সুপারিশটি বাধ্যতামূলক নয় এবং মার্কিন সরকার তা কার্যকরও করেনি। ভারত সরকার কমিশনকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। আরএসএসও অসহিষ্ণুতার অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেদের হিন্দুকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত আন্দোলন বলে বর্ণনা করে।

ফলে ৯০ রাজনীতিকের অঙ্গীকার কোনও সরকারি নিষেধাজ্ঞা নয়, সঙ্ঘ-যোগের অভিযোগও এখনও সর্বত্র স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়। কিন্তু এর রাজনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট—প্রবাসী ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দুত্বপন্থী সংগঠনগুলির প্রভাব নিয়ে বিতর্ক এবার প্রতিবাদসভা ছাড়িয়ে সরাসরি মার্কিন নির্বাচনী অর্থের পরিসরে প্রবেশ করল।

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক