ইউক্রেনে স্পেসএক্সের স্টারলিঙ্কের সামরিক সংস্করণ ‘স্টারশিল্ড’-এর ব্যবহার সীমিত করা নিয়ে শুরু হয়েছে চাপানউতোর। ট্রাম্প প্রশাসন, কিয়েভের আধিকারিক এবং ইলন মাস্ক—পরস্পরের দিকে দায় ঠেলছেন সবাই। বিধিনিষেধের ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনীর পিছনের দিকে হামলা চালানোর কাজে ব্যবহৃত ইউক্রেনীয় ড্রোনের কার্যক্ষমতা কমেছে বলে দাবি কিয়েভের। ব্যাহত হয়েছে রুশ আক্রমণ ঠেকানোর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার দাবি করেছেন, স্টারশিল্ডের পরিষেবা আবার পূর্ণ গতিতে চলছে। কিন্তু অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সঙ্গে কথা বলা এক ইউরোপীয় আধিকারিকের বক্তব্য, পরিষেবা এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এই টানাপড়েনের মধ্যেই ইউক্রেনে অসামরিক মানুষের প্রাণহানি বাড়ছে। কিন্তু পরিষেবা সীমিত করার নির্দেশ কে দিয়েছিলেন, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি।
ট্রাম্প: দায় নয়, কৃতিত্ব মাস্কের!
রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর প্রায় পাঁচ বছরে আমেরিকা ও ইউক্রেনের সম্পর্ক যখন সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখনই স্টারশিল্ড নিয়ে এই বিতর্ক সামনে এসেছে।
ট্রাম্পের অভিযোগ, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলিতে হামলা চালিয়ে ইউক্রেন আমেরিকায় ডিজেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদিও বিবিসির একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহে সম্ভবত আরও বড় প্রভাব ফেলেছে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যুদ্ধ এবং তার জেরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রফতানিতে তৈরি হওয়া বাধা।
স্টারশিল্ডের পরিষেবায় পরিবর্তনের জন্য প্রথম থেকেই দায় অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প। গত শুক্রবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “কেউ এটা করেছে কি না, আমি জানি না। কিন্তু আমি করিনি। আর আমার মনে হয় না ইলনও করেছে।” স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের কথাই বলছিলেন তিনি।
ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্যরাও তাঁর বক্তব্য সমর্থন করেছেন। বুধবার বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো বলেন, “আমি আপনাদের নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বা আমাদের প্রশাসনের অন্য কেউ কখনও ওই ব্যবস্থায় কোনও পরিবর্তন করার অনুরোধ করেননি।”
তবে রুবিয়োর পরের মন্তব্যে সন্দেহের আঙুল ঘুরে যায় মাস্কের দিকে। তিনি বলেন, “স্টারলিঙ্ক, স্টারশিল্ড এবং মিস্টার মাস্ক যে সিদ্ধান্তগুলি নেন, তার সঙ্গে প্রেসিডেন্টের কোনও সম্পর্ক নেই। ওটি একটি বেসরকারি সংস্থা। প্রেসিডেন্ট সেই সংস্থা চালান না এবং সংস্থাটিকে কোনও কিছু করার নির্দেশও দিতে পারেন না।”
বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট মাস্ককে ফোন করে পরিষেবা পুনরুদ্ধার করতে বলেছিলেন। পরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, ব্যবস্থাটি “ফিরে এসেছে”।
মাস্কের সঙ্গে কথা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি ট্রাম্প। তবে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে, পরিষেবা সীমিত করা বা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে স্পেসএক্সের প্রধানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মাস্কের প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, “আমার মনে হয়, আসল কথা হল, উনিই সেটা ফিরিয়ে দিয়েছেন।”
তবে টেক্সাসের রিপাবলিকান সেনেটর জন করনিন মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “অন্তত হোয়াইট হাউসের নীরব সম্মতি ছাড়া” মাস্ক এমন পদক্ষেপ করেছেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। সেনেটর হিসেবে তাঁর মেয়াদের আর কয়েক সপ্তাহ বাকি।
মাস্ক: নিয়ন্ত্রণ সরকারের, দায়ও তাদের
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ট্রাম্পের আহ্বানকে সমর্থন করেছেন মাস্ক। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের কড়া সমালোচনাও করেছেন তিনি। কিন্তু স্টারশিল্ডের উপর বিধিনিষেধের দায় দ্রুত ট্রাম্প প্রশাসনের দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
গত সপ্তাহে সমাজমাধ্যম এক্সে মাস্ক লেখেন, এই ব্যবস্থাগুলির “মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ মার্কিন সরকারের হাতে”। তাঁর বক্তব্য, “গতি বা ব্যবহারের উপর যে কোনও সীমা নির্ধারণ করে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট।”
রিপাবলিকান পার্টির অন্যতম বড় অর্থদাতা এবং ট্রাম্পের সহযোগী মাস্ক পরিষেবায় পরিবর্তনের জন্য নিজের দায় অস্বীকার করে গিয়েছেন। তবে মঙ্গলবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, স্টারশিল্ডের গতি কমানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন মাস্কই। যদিও ট্রাম্পের সঙ্গে সমন্বয় করে সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সংবাদপত্রটির সূত্রগুলির মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মাস্কের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ওই ধনকুবের “দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে চলা যুদ্ধে নিজেকে জড়াতে চান না, যদি না মার্কিন সরকার তাঁকে কার্যত নির্দেশ দেয় যে কী করতে হবে”।
ভ্যান্সের কথায়, “তাই আমার মনে হয় না, বিষয়টি ইলনকে নিয়ে। আমার মনে হয়, মূল প্রশ্ন হল, ইউক্রেন ও রাশিয়ার বিষয়ে আমেরিকার নীতি কী হতে চলেছে।”
জেলেনস্কি: নির্দেশ আমেরিকার, কাজ স্পেসএক্সের
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট প্রথমে স্টারশিল্ডের উপর বিধিনিষেধের জন্য “স্পেসএক্স এবং আমেরিকা”—উভয়কেই দায়ী করেছিলেন। গত সপ্তাহের বুধবার তিনি সতর্ক করে বলেন, এই পদক্ষেপে “বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটবে… অবশ্যই মানুষ মারা যাবেন”।
স্টারশিল্ডের পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই জেলেনস্কি জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলিতে থাকা স্টারশিল্ড টার্মিনালগুলির উপর একই ধরনের বিধিনিষেধ নেই। তাঁর দাবি, বিধিনিষেধ কার্যকর হয়েছে শুধু ইউক্রেনের ক্ষেত্রেই। তিনি বলেন, “অন্য কথায়, এটি একটি পরিকল্পিত অভিযান।”
সপ্তাহান্তে জেলেনস্কি আরও স্পষ্ট করে জানান, ইউক্রেনে স্টারশিল্ডের কার্যকরী গতি আচমকা সীমিত করার জন্য শেষ পর্যন্ত দায়ী মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্স। তাঁর কথায়, “গতি সীমিত করার বার্তা এসেছিল আমেরিকার সরকারের কাছ থেকে… আর প্রযুক্তিগতভাবে কাজটি করেছে স্পেসএক্স।”
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প পরিষেবা পুনরায় চালু হওয়ার দাবি করলেও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সঙ্গে কথা বলা এক উচ্চপদস্থ ইউরোপীয় আধিকারিক জানিয়েছেন, স্টারশিল্ডের কার্যক্রমে কোনও পরিবর্তন হয়নি।
ট্রাম্পের মন্তব্যের আগেই জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, ইউক্রেনে স্টারশিল্ডের পূর্ণ গতি তখনও ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে রুবিয়োর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, স্টারশিল্ড নিয়ে ওয়াশিংটন, স্পেসএক্স ও কিয়েভের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে একটি বিষয়ই স্পষ্ট—ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির গুরুত্ব যত বাড়ছে, এর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে এবং সিদ্ধান্তের দায় কার, তা নিয়ে বিরোধও তত তীব্র হচ্ছে।