বাংলাস্ফিয়ার: আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন কনোলি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘ঘৃণ্য’ বলেছেন, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী বলে আক্রমণ করেছেন। অন্যদিকে, কনোলি সম্পর্কে এ পর্যন্ত একবারই মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তখন তাঁর কথায় মনে হয়েছিল, কনোলিকে তিনি পুরুষ বলে ভাবছেন। এবার দু’জন মুখোমুখি হতে চলেছেন। আর রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে আয়ারল্যান্ড।

শনিবার সকালে দু’দিনের সফরে ডাবলিনে পৌঁছনোর কথা ট্রাম্পের। সফরের কেন্দ্রে গল্‌ফ। কিন্তু প্রিয় গল্‌ফের মাঠে পৌঁছনোর আগে কূটনৈতিক প্রথা মেনে তাঁকে দেখা করতে হবে এমন এক মহিলার সঙ্গে, যিনি ট্রাম্পকে প্রবল অপছন্দ করেন বলেই এত দিন বুঝিয়ে এসেছেন।

ডাবলিনের ফিনিক্স পার্কে আইরিশ প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ও কর্মস্থল ‘আরাস আন উখতারান’-এ এই সৌজন্য সাক্ষাৎ ঘিরে সরকারের উদ্বেগ বাড়ছে। সংবাদমাধ্যমও যেন পপকর্ন হাতে নাটক দেখার অপেক্ষায়। শিরোনামে প্রশ্ন উঠছে, ‘কী আর এমন বিপত্তি ঘটতে পারে?’

আয়ারল্যান্ডের অনেকেই চাইছেন, অভিবাসী ও পশ্চিম এশিয়া নিয়ে ট্রাম্পের নীতি এবং কথাবার্তার জন্য কনোলি তাঁকে কড়া কথা শোনান। আবার অন্যদের আশা, তিনি সমালোচনা চেপে রাখবেন। কারণ, অতিথিকে চটালে তিনি আয়ারল্যান্ডের অর্থনীতিই ওলটপালট করে দিতে পারেন।

আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মিহল মার্টিন বলেছেন, এই সাক্ষাৎ নিয়ে তাঁর ‘একেবারেই’ কোনও উদ্বেগ নেই। কিন্তু এক শীর্ষস্থানীয় আধিকারিক জানিয়েছেন, সরকার প্রবল উৎকণ্ঠায় রয়েছে। তাঁর কথায়, “ওঁকে প্রেসিডেন্টের বাসভবনে ঢোকাতে হবে, তারপর সেখান থেকে বার করে আনতে হবে। তার পরেই আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলব।”

গত বছর আয়ারল্যান্ডের মূলত আনুষ্ঠানিক প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়ার আগে কনোলি ছিলেন গলওয়ের নির্দল বামপন্থী সাংসদ। ২০১৯ সালে ট্রাম্পের আয়ারল্যান্ড সফরের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে গাজা, ইরান এবং অন্য নানা বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান ও নীতির বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন।

তিনি বলেছিলেন, “আমরা যদি একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র, একটি নিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র হিসেবে কাজ করতে চাই, তা হলে ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলতে হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধেও আমাদের কণ্ঠ তুলতে হবে।”

মার্চে এই সমালোচনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি আছি বলে লোকটা ভাগ্যবান।” তাঁর ব্যবহৃত পুরুষবাচক সর্বনাম থেকেই মনে হয়েছিল, কনোলিকে তিনি পুরুষ বলে ধরে নিয়েছেন।

এবার কনোলির সঙ্গে দেখা করবেন ট্রাম্প। প্রধানমন্ত্রী মার্টিনের সঙ্গেও আলাদা বৈঠক হবে। তারপর যাবেন কাউন্টি ক্লেয়ারের ডুনবেগে নিজের গল্‌ফ রিসর্টে। সেখানেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে আইরিশ ওপেন।

ফিনিক্স পার্ক ও ডুনবেগ ঘিরে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে বিক্ষোভ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দূরে রাখা যায়। শনিবার বিকেলে মধ্য ডাবলিনে ‘ট্রাম্পকে স্বাগত নয়’ বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষের সমাগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অনেকে আশা করছেন, বন্ধ দরজার আড়ালে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে কনোলি তাঁদের কথাই তুলে ধরবেন। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পরে আয়ারল্যান্ডে চলে আসা মার্কিন কৌতুকাভিনেত্রী রোজি ও’ডনেল ‘আইরিশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-কে বলেছেন, “ক্ষমতার মুখের ওপর সত্যি কথাটা তাঁর বলা উচিত।”

ও’ডনেলের আরও বক্তব্য, “একজন উন্মাদের সঙ্গে ভদ্রতা করতে গিয়ে নিজের বিশ্বাস বিসর্জন দেওয়া তাঁর উচিত বলে আমি মনে করি না। লোকটা যেন এক উন্মাদ রাজা, যে দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।”

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কনোলিকে সমর্থন করা বামপন্থী দলগুলি অবশ্য এই প্রাক্তন আইনজীবীকে এমন একটি ‘পথ খুঁজতে’ বলেছে, যাতে সমালোচনাও জানানো যায়, আবার কূটনৈতিক ঝড়ও না ওঠে।

ট্রাম্প আয়ারল্যান্ডের প্রতি ভালবাসার কথা বলেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি চান, মার্কিন প্রযুক্তি ও ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি আয়ারল্যান্ড থেকে কর্মসংস্থান সরিয়ে আমেরিকায় নিয়ে যাক এবং আয়ারল্যান্ডের বদলে আমেরিকায় কর দিক। এমনটা হলে আইরিশ সরকারি অর্থভাণ্ডারে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

নির্বাচনী প্রচারের সময় কনোলি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট পদের সীমাবদ্ধতা মেনে চলবেন। পদটি মূলত প্রতীকী; বিদেশনীতি পরিচালনার দায়িত্বও তার নয়। তিনি এ-ও বলেছিলেন, অনুরোধ করা হলে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করবেন।

ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে আয়ারল্যান্ডের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ববি ম্যাকডোনা বলেছেন, “এর অর্থ, তাঁকে ভর্ৎসনা করার উদ্দেশ্য নিয়ে দেখা করতে যাওয়া নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাবেন তিনি। আইরিশ মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে, এমন কিছু বক্তব্য নম্রভাবে তুলে ধরতে পারবেন। আমার ধারণা, বৈঠক নির্বিঘ্নেই হবে।”

ম্যাকডোনার মতে, কনোলি প্রধানমন্ত্রী মার্টিনের পথ অনুসরণ করতে পারেন। হোয়াইট হাউস সফরে গিয়ে মার্টিন ট্রাম্পের কিছু মতামতের বিরোধিতা করেছিলেন, তবে অত্যন্ত সংযতভাবে।

তাঁর কথায়, “পরিস্থিতির আবেগ বুঝে চলার ক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। তাই এমনভাবে কথাগুলি বলতে পেরেছিলেন, যাতে কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়নি।”

এদিকে ছ’বার গল্‌ফের মেজর খেতাবজয়ী ররি ম্যাকইলরয় জানিয়েছেন, ডুনবেগে তিনি এবং অন্য প্রতিযোগীরা রাজনীতির বদলে খেলাতেই মন দেবেন।

ম্যাকইলরয় বলেছেন, “উনি এখানে থাকবেন বলে পরিবেশটা আলাদা হবে। কিন্তু আমরা এখানে গল্‌ফ প্রতিযোগিতায় খেলতে এসেছি। মাঠটাও ভাল। তাই আমরা নিজের কাজে মন দিয়ে খেলব।”