আগামী সপ্তাহে ভারত সফরে আসছেন আমেরিকার বিদেশসচিব মার্কো রুবিও। তবে তাঁর সফরসূচিতে নেই রাজধানী দিল্লি। বরং গন্তব্য মুম্বই ও গুজরাতের জামনগর। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি এই সফরের কেন্দ্রে রয়েছে রুশ তেল। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, রাশিয়া থেকে তেল আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের পরদিনই জামনগরে রিলায়্যান্সের তেল শোধনাগার পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রুবিওর। ফলে তাঁর এই সফরে নজর থাকবে কূটনীতির পাশাপাশি তেলের বাজারেও।
মার্কিন বিদেশ দফতরের ঘোষণা অনুযায়ী, ১৭ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশ সফরে থাকবেন রুবিও। তবে পুরো সফরটি ভারতের জন্য নয়, এর মধ্যে রয়েছে উজবেকিস্তানও। প্রথমে সমরখন্দে মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশ ও আমেরিকার ‘সি৫+১’ বৈঠকে যোগ দেবেন তিনি। তার পর আসবেন ভারতে। চলতি বছরে এটি তাঁর দ্বিতীয় সরকারি ভারত সফর।
মুম্বইয়ে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন রুবিও। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হবে। মার্কিন বিদেশ দফতরের বিবৃতিতেও কৌশলগত অংশীদারত্ব মজবুত করা, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় এবং জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে।
শুধু সরকারি বৈঠকেই থামছে না সফর। শিল্পপতিদের সঙ্গেও কথা বলবেন রুবিও। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ খুঁজে দেখাই তার অন্যতম লক্ষ্য। এই প্রেক্ষাপটে জামনগরকে সফরসূচিতে রাখার গুরুত্বও যথেষ্ট। সেখানে রয়েছে রিলায়্যান্সের বিশাল তেল শোধনাগার কমপ্লেক্স, যা বিশ্বের বৃহত্তম একক স্থানের তেল পরিশোধন কেন্দ্র। দৈনিক প্রায় ১৪ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের ক্ষমতা রয়েছে এই কেন্দ্রে।
তবে সফরের আসল নজর রুশ তেলেই। মস্কোর জ্বালানি কেনে, এমন দেশগুলির উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর ক্ষমতা দেওয়া নিষেধাজ্ঞা বিলে সই করেছেন ট্রাম্প। তার পর এই প্রথম ভারত সফরে আসছেন রুবিও। যদিও শুল্ক আরোপের ক্ষমতা হাতে থাকা আর কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে তা প্রয়োগ করা এক নয়। ফলে ট্রাম্পের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে ওয়াশিংটনের চাপের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করেছে নয়াদিল্লি। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে রুবিওর সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি তুলেছিলেন জয়শঙ্কর। ভারতের বক্তব্য, ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের অগ্রাধিকার। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা শুল্কের পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছে নয়াদিল্লি।
বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে আমেরিকার নিজের অবস্থান। রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ নিয়ে সমঝোতার কথা জানিয়েছে ওয়াশিংটনও। এক দিকে রুশ তেল কেনার জন্য ভারতকে চাপ, অন্য দিকে মস্কোর সঙ্গে আমেরিকার নিজস্ব জ্বালানি সমঝোতা—এই দ্বৈত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যদিও এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করেনি নয়াদিল্লি। ভারতের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে, এমন উদ্যোগকে তারা সমর্থন করে।
এর পাশাপাশি চলছে ভারত-আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা। সম্প্রতি জয়শঙ্কর সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে মুম্বইয়ের বৈঠকে রুশ তেলের পাশাপাশি বাণিজ্যিক মতপার্থক্য কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত সফর ঘোষণায় কোনও চূড়ান্ত বাণিজ্য চুক্তি কিংবা রুশ তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতের জন্য বিশেষ ছাড়ের কথা জানানো হয়নি।
ভারতের শোধনাগারগুলির কাছে এই টানাপড়েনের প্রভাব সরাসরি ব্যবসায় পড়তে পারে। কোন দেশ থেকে কত দামে অপরিশোধিত তেল কেনা যাবে, সরবরাহ কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা করতে গিয়ে নতুন কোনও বাধার মুখে পড়তে হবে কি না—সবই নির্ভর করছে সম্ভাব্য মার্কিন পদক্ষেপের উপর। তাই জামনগরে রুবিওর সফর নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের জ্বালানি আমদানি ও বাণিজ্যিক স্বার্থ।
দিল্লি বাদ পড়ায় রাজনৈতিক দূরত্বের জল্পনা তৈরি হতে পারে। তবে ভারতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি থাকায় শুধু সফরসূচি দেখেই দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েনের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। বরং নজর থাকবে, ট্রাম্প রুশ তেল নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেন এবং তার পর ভারতকে নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান কতটা বদলায়। জামনগরে রুবিওর সফর তাই এক দিকে জ্বালানি কূটনীতির পরীক্ষা, অন্য দিকে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্যিক সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।