নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে ঘোড়ার গাড়ির দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৮ বছরের ভারতীয় পর্যটক রোমাঞ্চ মহাজন। তাঁর মৃত্যুর পর ঘোড়ার গাড়ি নিষিদ্ধ করার দাবি আরও জোরালো হয়। এ বার সেই দাবিরই পরিণতি আসন্ন। রোমাঞ্চের স্মৃতিতে তাঁর নামেই আইন আনার উদ্যোগ নিয়েছে নিউ ইয়র্ক শহর। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে ধাপে ধাপে বন্ধ হয়ে যাবে শহরের ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ির পরিষেবা।

নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি সমাজমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “নিউ ইয়র্ক শহরে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবসার অবসান হতে চলেছে।” তাঁর বক্তব্য, এই পরিষেবা বন্ধ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মী ও মালিকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা এবং ঘোড়াগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের লক্ষ্য।

‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেন্ট্রাল পার্কে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার বন্ধ করার লক্ষ্যে একটি আইন প্রস্তাব নিয়ে মামদানি ও নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের স্পিকার জুলি মেনিন সহমত হয়েছেন। আগামী সপ্তাহে সিটি কাউন্সিলে বিলটি নিয়ে ভোটাভুটি হওয়ার কথা। ৫১ সদস্যের কাউন্সিলে প্রস্তাবটি এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে, যাতে মেয়রের ভেটো এলেও তা অতিক্রম করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন মেনিন।

জুনে সেন্ট্রাল পার্কে ঘোড়ার গাড়ির দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন ভারতীয় পর্যটক রোমাঞ্চ মহাজন। ঘোড়াটি হঠাৎ বেপরোয়া ছুটতে শুরু করলে গাড়ি থেকে পড়ে যান তাঁর মা। তাঁকে সাহায্য করতে গাড়ি থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন রোমাঞ্চ। পরে আঘাতের জেরে তাঁর মৃত্যু হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনাই শহরে ঘোড়ার গাড়ি নিষিদ্ধ করার দাবিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

রোমাঞ্চের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রস্তাবিত বিলটির নাম রাখা হয়েছে ‘রোমাঞ্চের আইন’। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে ধাপে ধাপে ঘোড়ার গাড়ির পরিষেবা বন্ধ করা হবে। তবে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের জীবিকা ও মালিকদের স্বার্থের দিকটিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরেই নিউ ইয়র্কের পরিচিত দৃশ্যগুলির অন্যতম সেন্ট্রাল পার্কের ঘোড়ার গাড়ি। কিন্তু ঐতিহ্যের সঙ্গে জননিরাপত্তার সংঘাত ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। ‘পলিটিকো’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেনিনের বক্তব্য, ঘোড়ার গাড়ি শহরের ইতিহাসের অংশ হলেও ক্রমশ ব্যস্ত হয়ে ওঠা সেন্ট্রাল পার্কে তা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তাঁর কথায়, নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা, পর্যটক এবং ঘোড়াগুলির সুরক্ষার কথা মাথায় রেখেই কাউন্সিল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে।

তবে ঘোড়ার গাড়ি বন্ধের দাবির ইতিহাস রোমাঞ্চের মৃত্যুরও আগের। ২০২২ সালের অগস্টে নিউ ইয়র্কের রাস্তায় গাড়ি টানতে টানতে লুটিয়ে পড়েছিল ২৬ বছরের ঘোড়া রাইডার। সেই ঘটনার পর প্রস্তাবিত আইনটির নাম রাখা হয়েছিল ‘রাইডারের আইন’। ওই বছরের অক্টোবরে রাইডারের মৃত্যু হলে পশু অধিকার রক্ষাকারী সংগঠনগুলির প্রতিবাদ আরও তীব্র হয়। অ্যানিম্যাল লিগ্যাল ডিফেন্স ফান্ড-সহ একাধিক সংগঠন ঘোড়ার গাড়ি নিষিদ্ধ করে বিকল্প ব্যবস্থা চালুর দাবি জানায়।

রোমাঞ্চের মৃত্যুর পর সেই দাবিতে নতুন করে সরব হয় সেন্ট্রাল পার্ক কনজারভ্যান্সি। সেন্ট্রাল পার্কের দৈনন্দিন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাটি আগেও পার্কে ঘোড়ার গাড়ি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, জননিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে তারা আগেই সতর্ক করেছিল।

সংস্থাটির কথায়, এক তরুণ পার্কে বেড়াতে এসে প্রাণ হারিয়েছেন। আমেরিকার অন্যতম ব্যস্ত জনপরিসরে একটি সেকেলে ব্যবসা চালু রাখার মূল্য মানুষের জীবন হতে পারে না।

দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, পশুকল্যাণ, কর্মসংস্থান এবং জননিরাপত্তা—সব দিক বিবেচনা করেই এ বার সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে নিউ ইয়র্ক। রোমাঞ্চের মৃত্যুর পর তাঁর নামে প্রস্তাবিত আইন সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিলটি পাস হলে শহরের পরিচিত এক দৃশ্যের অবসান ঘটবে, আর তার সঙ্গে জুড়ে থাকবে এক তরুণ ভারতীয় পর্যটকের স্মৃতি।