৩০ এপ্রিল সকালে নিউ ইয়র্কের আর্থিক কেন্দ্রের আকাশছোঁয়া অট্টালিকাগুলির ছায়ায় উন্মোচিত হল এক নতুন ভাস্কর্য। রং করা স্টেনলেস স্টিলের সাত ফুট উঁচু, উজ্জ্বল হলুদ সেই শিল্পকর্মে আরবি হরফে লেখা ‘আল কলম’—অর্থাৎ, কলম।

এলিজাবেথ এইচ বার্গার প্লাজায় স্থাপিত স্মারকটির নাম ‘আল কলম: পোয়েটস ইন দ্য পার্ক’। নিউ ইয়র্কের হারিয়ে যাওয়া ‘লিটল সিরিয়া’ পাড়ার লেখকদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য এটি। একসময় ওয়াশিংটন স্ট্রিট বরাবর গড়ে ওঠা আরবিভাষী অভিবাসীদের এই বসতি ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কাছেই। মেয়র জোহরান মামদানির আমলে উন্মোচিত প্রথম স্মারক শিল্পকর্ম এটি। এই পাড়ারই সাহিত্যিক পরিমণ্ডল থেকে উঠে এসেছিলেন খলিল জিব্রান। তাঁর কাব্যগদ্যের বই দ্য প্রফেট আজও প্রকাশিত হচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় জিব্রানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা লেখকগোষ্ঠী ‘পেন লিগ’-কে সম্মান জানাতেই এই উদ্যোগ।

স্মারকের নকশাকার, ফরাসি-মরক্কীয় শিল্পী সারা উহাদ্দু উপস্থিত মানুষের সামনে কথা বলতে গিয়ে আবেগে কেঁদে ফেলেছিলেন। তিনি জানান, এই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস জানতে গিয়ে অভিবাসনের সন্তান হিসেবে পৃথিবীতে নিজের অবস্থান সম্পর্কে নতুন করে সচেতন হয়েছেন।

প্রকল্পটির শেষ কয়েক বছর ওয়াশিংটন স্ট্রিট হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির নেতৃত্ব দেওয়া ইতিহাসবিদ লিন্ডা জেকবসের কথায়, “হাজার হাজার মানুষ তাঁদের জীবনের প্রতিটি দিন আরবি দেখবেন। আর তা স্থায়ীভাবে থাকবে। চিরকালের জন্য।”

কিন্তু স্মারকটি উন্মোচনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হল বিতর্ক। স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখতে যাওয়া পর্যটকেরা যখন ভাস্কর্যটির সামনে থমকে দাঁড়াচ্ছেন, তখন লেবাননের সরকার জানতে পারল, পাশে পার্কস বিভাগের লাগানো ফলকে লেখকদের ‘সিরীয়’ পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

ফলকটি দেখে ক্ষুব্ধ হলেন লেবাননের কূটনীতিক, রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক জগতের বিশিষ্টজনেরা। লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটির ফিলিপ এ সালেম অ্যাকাডেমি ফর লেবানিজ হেরিটেজের পরিচালক অঁরি জোগাইবের মতে, স্মারকটিতে ‘সময়ের বিচারে ভুল’ রয়েছে। লেবাননের বশারিতে খলিল জিব্রানের জন্মস্থান ও সংগ্রহশালার দায়িত্বে থাকা জিব্রান ন্যাশনাল কমিটিও আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানায়। দেশটির দু’টি মন্ত্রক কূটনৈতিক পথে অভিযোগ জানায়। মে মাসে বিদেশমন্ত্রী ইউসেফ রাজ্জি ঘোষণা করেন, ফলকের লেখা সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ও নিউ ইয়র্কের কনসাল জেনারেলকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

বিতর্কের মূল প্রশ্ন একটাই: জিব্রান এবং তাঁর সঙ্গে সম্মানিত অন্যান্য লেখকদের ‘সিরীয়’ বলা হবে, না ‘লেবাননীয়’? বেইরুটের বক্তব্য, তাঁদের জন্ম হয়েছিল মাউন্ট লেবাননে। তাই তাঁদের সিরীয় পরিচয়ে চিহ্নিত করা মানে লেবাননীয় পরিচয় মুছে দেওয়া।

ফলকের কয়েকটি শব্দ নিয়ে এই বিবাদকে তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু এর পিছনে রয়েছে ইতিহাস, জাতীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে লেবানন অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক অচলাবস্থা, ইজরায়েলি বোমাবর্ষণ ও দেশের দক্ষিণাংশের দখলদারির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। স্মারকটি উন্মোচনের দু’সপ্তাহ আগে টায়ারের শামা এলাকায় শামউন আল-সাফার পবিত্র মাজার ইজরায়েলি বিমানহানায় ধ্বংস হয়। এমন পরিস্থিতিতে একটি দেশ তার অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরবে, সেটাই স্বাভাবিক। আর লেবাননের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন জিব্রান। প্রশ্ন হল, যুদ্ধ ও দখলদারির মধ্যে থাকা একটি দেশের বিদেশমন্ত্রক কেন সমুদ্রের ওপারের একটি পার্কের ফলক নিয়ে এতটা উদ্যোগী হবে না?

তবে এই বিতর্কে লেবাননের দাবিদারদের সামনে একটি জটিল প্রশ্ন রয়েছে: জিব্রান নিজে কি কখনও নিজেকে লেবাননীয় বলে পরিচয় দিয়েছিলেন? তাঁর লেখালিখি ও ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে বরং স্পষ্ট, তিনি নিজেকে সিরীয় বলেই ভাবতেন।

১৯২৯ সালের জানুয়ারিতে নিউ ইয়র্কের হোটেল ম্যাকঅ্যালপিনে জিব্রানের সৃষ্টিশীল জীবনের ২৫ বছর উদ্‌যাপন করতে জড়ো হয়েছিলেন ২০০ জন অতিথি। ইংরেজি ভাষার অভিবাসী পত্রিকা দ্য সিরিয়ান ওয়ার্ল্ড অনুষ্ঠানের শিরোনাম করেছিল, ‘জাতিকে গৌরবান্বিত করেছেন যে লেখক, তাঁকে নিয়ে সিরীয়দের গর্ব’।

অভিবাসন সংক্রান্ত নথিতেও একই পরিচয় পাওয়া যায়। ১৮৯৫ সালে মায়ের নামের সূত্রে প্রথম এলিস আইল্যান্ডে পৌঁছনোর সময় তাঁর নাম লেখা হয়েছিল ‘জুবরান রামে’; জাতীয়তা, সিরীয়। ১৯০২ সালে ফিরে আসেন ‘জিব্রান কে জিব্রান’ নামে, তখনও জাতীয়তা সিরীয়। ১৯১০ সালে নথিভুক্ত হন ‘কাহলেল গেবিয়ান’ নামে; জাতীয়তা লেখা হয় ‘তুরস্ক, সিরীয়’। কোনও নথিতেই তাঁকে লেবাননীয় বলা হয়নি। কারণ, তখনও লেবানন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি।

১৮৬১ সাল থেকে মাউন্ট লেবানন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের একটি স্বায়ত্তশাসিত জেলা। সেখানে নিজস্ব খ্রিস্টান গভর্নর থাকলেও সেটি ছিল সাম্রাজ্যের অংশ, স্বাধীন দেশ নয়। ১৯১৫ সালে সেই স্বায়ত্তশাসনও হারায়। বেইরুট, ত্রিপোলি, সাইডন ও টায়ার কখনও ওই জেলার অংশ ছিল না; সেগুলি ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের সিরিয়া প্রদেশের অন্তর্গত এবং পরে বেইরুট প্রদেশের অংশ হয়।

জিব্রানের প্রজন্ম যখন ম্যানহাটনে বসতি গড়ছে, তার কয়েক দশক পরে, ১৯২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর বৃহত্তর লেবানন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করা হয়।

ইতিহাসবিদ হানি বাওয়ার্দি কয়েক দশক ধরে আমেরিকায় প্রথম দফায় আসা আরব অভিবাসীদের সন্তানদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। পেন লিগ স্মারকের কমিটিতেও ছিলেন তিনি। তাঁর সংগ্রহ করা স্মৃতিচারণে একটি কথা বারবার ফিরে এসেছে: “আমরা সকলেই সিরীয় ছিলাম।” আজ তাঁদের উত্তরসূরিদের লেবাননীয়, সিরীয়, জর্ডনীয়, ইজরায়েলি বা প্যালেস্টাইনি বলা হতে পারে। কিন্তু সেই সময়ে তাঁরা নিজেদের বৃহত্তর সিরিয়ার—‘বিলাদ আল-শাম’—সন্তান বলে ভাবতেন।

লিটল সিরিয়া: ছাপার অক্ষরে পরিচয়ের লড়াই

স্মারকে সম্মানিত বহু লেখক তাঁদের জীবন কাটিয়েছেন এই অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে। ম্যানহাটনের দক্ষিণ প্রান্তের কয়েকটি রাস্তায় সংবাদপত্র ও সাহিত্যপত্র প্রকাশের এক জগৎ গড়ে তুলেছিলেন তাঁরা।

১৮৮০ থেকে ১৯২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৯৫ হাজার আরবিভাষী অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। নিউ ইয়র্ক ছিল তাঁদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ম্যানহাটনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ওয়াশিংটন স্ট্রিট বরাবর গড়ে ওঠা বসতিটি পরে ‘লিটল সিরিয়া’ নামে পরিচিত হয়। অটোমান সাম্রাজ্যে বাধ্যতামূলক সেনাভর্তি, সাম্প্রদায়িক চাপ এবং মাউন্ট লেবাননের রেশমশিল্পের পতনজনিত আর্থিক বিপর্যয় থেকে বাঁচতে অনেকে দেশ ছেড়েছিলেন। তাঁদের বড় অংশই ছিলেন খ্রিস্টান—মারোনাইট, মেলকাইট ও অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের।

জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁরা নানা কাজ করতেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ফেরি করে জিনিস বিক্রি করতেন শহরে ও শহরের বাইরে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় আমেরিকান মহিলাদের জনপ্রিয় সুতির কিমোনোর অনেকগুলিই তৈরি হত ওয়াশিংটন স্ট্রিটের কর্মশালায়। ইতিহাসবিদ জেকবসের দিদিমা সিগারেট পাকানোর কাজ করতেন—মহিলাদের জন্য তখন যে অল্প কয়েকটি কাজের সুযোগ ছিল, তার একটি।

সমাজটি যত থিতু হল এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে উঠল, ততই অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হয়ে উঠল দেশে খবর পাঠানো। ১৮৯২ সালের এপ্রিলে নাজিব ও ইব্রাহিম আরবিলি নামে দুই ভাই প্রতিষ্ঠা করেন কাওকাব আমেরিকা—যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আরবি সংবাদপত্র। পরবর্তী কয়েক দশকে এই শ্রমজীবী পাড়া হয়ে ওঠে আরবি প্রকাশনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানকার ছাপাখানায় তৈরি সংবাদপত্র ছড়িয়ে পড়ত মিশর, ব্রাজিল এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় লেভান্ট অঞ্চলের প্রবাসী সমাজে।

স্মারক তৈরির উদ্যোগের প্রথম দিকের সমর্থকদের অন্যতম বব ম্যাডে বলেন, “আমার দাদু তাঁর সংবাদপত্র পাঠাতে যে ডাকটিকিট ব্যবহার করতেন, সেগুলি এখনও আমার কাছে আছে।” তাঁর দাদু ছিলেন এলিয়া আবু মাদি—স্মারকে সম্মানিত কবি এবং আস-সামির পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা। আধুনিক আরবি সাহিত্যের জনপ্রিয় কবিদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

অভিবাসী লেখকদের এই সাহিত্য আন্দোলন পরিচিত হয়েছিল ‘মাহজার’ নামে। পশ্চিমি দুনিয়ায় আরবি সাহিত্যের বিকাশে নিউ ইয়র্ক ছিল তার কেন্দ্রস্থল। ইউরোপের বাইরের দেশ থেকে স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীদের গড়ে তোলা প্রথম দিকের সাহিত্য আন্দোলনগুলির মধ্যে এটিও ছিল উল্লেখযোগ্য।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক কারেন জ্রেইক লিটল সিরিয়ার লেখক ও প্রকাশক আন্তোয়ান জ্রেইকের প্রপৌত্রী। তাঁর কথায়, পূর্বপুরুষের মতো লেখকেরা আলোচনা করতেন পশ্চিমি ঔপনিবেশিকতা, জাতীয়তাবাদ এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী অটোমান শাসনের পর অভিন্ন আরব পরিচয়ের পুনরুত্থান নিয়ে। নিউ ইয়র্ক থেকে আন্তোয়ান সম্পাদনা করতেন অটোমানবিরোধী ব্যঙ্গপত্রিকা জুরাব আল-কুর্দি। ১৯১৫ সালে মাউন্ট লেবাননে নিজের দেশে বেড়াতে গিয়ে তিনি ও তাঁর ভাই অটোমান কর্তাদের হাতে গ্রেফতার হন। তাঁদের প্রকাশিত লেখার জন্য দু’জনকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

নিউ ইয়র্কের প্রবাসী সংবাদপত্র ও সাহিত্যপত্রগুলির অনেকেই বৃহত্তর সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখত। ইতিহাসবিদ স্টেসি ফারেনথোল্ড মাহজার সংবাদমাধ্যমকে বর্ণনা করেছেন পরিচয়ের প্রতীক ও অর্থ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হিসেবে। সেখানে সমাজের হয়ে কথা বলার অধিকার আদায় করতে গিয়ে ছাপার অক্ষরেই লড়াই চলত—কেউ হয়ে উঠতেন ‘সিরীয়’, কেউ ‘লেবাননীয়’।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নিউ ইয়র্কের ‘কমিটি ফর দ্য লিবারেশন অব সিরিয়া অ্যান্ড লেবানন’-এর নেতৃত্বে ছিলেন জিব্রান ও রিহানি। অন্য দিকে ছিলেন লেবাননীয় জাতীয়তাবাদী নাউম মোকারজেল। দীর্ঘকাল ধরে প্রকাশিত আরবি দৈনিক আল-হুদার প্রকাশক মোকারজেল ফরাসি সুরক্ষাধীন লেবাননের পক্ষে ছিলেন। বাওয়ার্দির ভাষায়, “তিনি ছিলেন ফরাসিদের এজেন্ট।”

তবু আজকের লেবাননের সীমানার মধ্যে জন্ম নেওয়া অনেকেই নিজেদের সিরীয় বলতেন। বৃহত্তর লেবানন ঘোষণার ছ’বছর পর, ১৯২৬ সালে, নাউমের ভাই সাল্লুম আমেরিকায় জন্মানো প্রজন্মের জন্য ইংরেজি পত্রিকা দ্য সিরিয়ান ওয়ার্ল্ড প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম সংখ্যাতেই জিব্রান লেখেন ‘সিরীয় বংশোদ্ভূত তরুণ আমেরিকানদের প্রতি বার্তা’।

সেখানে তাঁর বক্তব্য ছিল, সিরীয় বংশোদ্ভূত একজন ভাল আমেরিকান হওয়ার অর্থ হল বলতে পারা: “আমি সেই জনগোষ্ঠীর উত্তরসূরি, যারা দামাস্কাস, বিব্লস, টায়ার, সাইডন ও অ্যান্টিয়ক গড়ে তুলেছিল। আর এখন আমি এখানে এসেছি, তোমাদের সঙ্গে দৃঢ় সংকল্পে নির্মাণের কাজে হাত মেলাতে।”

যে পাড়া হারিয়ে গেল, হারাল তার নামও

এদিকে লিটল সিরিয়ার অস্তিত্ব ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছিল। ১৯২৪ সালের অভিবাসন আইন অনুযায়ী, ১৮৯০ সালের জনগণনায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রতিটি জাতীয়তার বিদেশে জন্মানো মানুষের সংখ্যার দুই শতাংশের বেশি মানুষ বছরে প্রবেশ করতে পারতেন না। সিরিয়ার জন্য বার্ষিক কোটা দাঁড়ায় মাত্র ১০০ জনে। যে অভিবাসনের ঢেউ প্রায় ৯৫ হাজার মানুষকে আমেরিকায় এনেছিল, তা কার্যত থেমে যায়। নতুন করে অভিবাসনের পথ খুলতে অপেক্ষা করতে হয় ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত।

পরিবারগুলি আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যত্র চলে যেতে শুরু করে—প্রথমে ব্রুকলিনের আটলান্টিক অ্যাভিনিউ অঞ্চলে, পরে বে রিজে। নগর পরিকল্পনাবিদ রবার্ট মোজেস এবং তাঁর ব্রুকলিন-ব্যাটারি টানেলের প্রকল্পকে প্রায়ই লিটল সিরিয়ার পতনের জন্য দায়ী করা হয়। কিন্তু জেকবসের মতে, বিষয়টি এত সরল নয়। টানেলের জন্য উচ্ছেদের নোটিসগুলির মধ্যে তিনি হয়তো মাত্র দশটি সিরীয় নাম পেয়েছেন। তাঁর ধারণা, অধিকাংশ বাসিন্দাই তার আগেই এলাকা ছেড়েছিলেন।

বসতিটি ফাঁকা হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিচয়ের নামও বদলাতে থাকে। হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির অন্তর্বর্তী সভাপতি পলা হাজর নিজের শৈশবেই এই পরিবর্তন দেখেছেন। ১৯৫৮ সালে সিরিয়া মিশরের সঙ্গে মিলে সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্র গঠন করলে আমেরিকানদের চোখে সিরিয়া ক্রমশ উগ্রপন্থী, সোভিয়েত-ঘনিষ্ঠ ও সন্দেহজনক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হয়। অন্য দিকে, লেবাননকে দেখা হত সুন্দর, পশ্চিমপন্থী ও পুঁজিবাদী দেশ হিসেবে।

হাজরের কথায়, “ষাটের দশকের গোড়ায় লেবাননকে দেখা হত একটি সুন্দর ছোট্ট দেশ হিসেবে—বেড়াতে যাওয়ার জায়গা, পুঁজিবাদী এবং পশ্চিমপন্থী। সিরিয়ার উপর ছিল অন্ধকারের ছায়া, আর লেবাননের উপর উজ্জ্বল আলো।”

পরিচয় বদলে নেওয়াই হয়ে উঠেছিল নিরাপদ। “আমি যখন খুব ছোট, তখন আমি সিরীয়। কিন্তু ষাটের দশকের গোড়ায় মিডল স্কুলে পড়ার সময় নিজেকে লেবাননীয় বলে পরিচয় দিতে শুরু করেছিলাম,” বলেন হাজর।

পুরনো লিটল সিরিয়ার মাত্র তিনটি ভবন এখনও ওয়াশিংটন স্ট্রিটের দক্ষিণাংশে টিকে রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে সেন্ট জর্জেস সিরিয়ান ক্যাথলিক চার্চ। ২০০৯ সালে এটিকে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থাপনার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। শহরের ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিশনের মতে, এটি সেই সময়ের সবচেয়ে জীবন্ত স্মৃতিচিহ্ন, “যখন ওয়াশিংটন স্ট্রিট ছিল সিরীয় আমেরিকার প্রধান সড়ক”।

বাড়িঘর হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে থাকে পাড়াটির নামও। জেকবস বলেন, “আমি যত লেবাননীয় বা সিরীয় মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, তাঁদের কেউই ম্যানহাটনের এই বসতির কথা জানতেন না।” এমনকি ১৮৯৭ সাল থেকে ২ নম্বর ওয়াশিংটন স্ট্রিটে বসবাস করা তাঁর দিদিমাও কখনও ম্যানহাটনের কথা বলেননি। জেকবসের ধারণা, দারিদ্র্য ও ঘিঞ্জি ভাড়াবাড়ির স্মৃতি হয়তো তাঁদের কাছে সুখকর ছিল না। এক ঘরে সাত-আট জনের বাস—সেই জীবন ভুলে থাকতেই হয়তো তাঁরা চেয়েছিলেন।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, পুরনো বসতির কয়েক ব্লক দূরে ধসে পড়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার। তার পরের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরব ও মুসলিম সমাজের উপর সন্দেহ ও নজরদারি বাড়ে। নিউ ইয়র্ক পুলিশ বছরের পর বছর শহরের মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর নজরদারি চালায়। নজরদারির আওতায় ছিল আসাদ দান্দিয়ার মসজিদও। দান্দিয়া এখন ব্রুকলিন বরোর ইতিহাসবিদ। ২০১৩ সালে তিনি ও আরও কয়েকজন পুলিশের বিরুদ্ধে ধর্মের ভিত্তিতে অসাংবিধানিক নজরদারির অভিযোগে মামলা করেন। পরে শহর কর্তৃপক্ষ সমঝোতার মাধ্যমে মামলাটির নিষ্পত্তি করে।

নতুন প্রজন্ম, পুরনো প্রশ্ন

তবু আরব বংশোদ্ভূত নিউ ইয়র্কবাসীদের উপস্থিতি নতুন করে দৃশ্যমান হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক রাজ্যের তিন লক্ষেরও বেশি বাসিন্দা এখন নিজেদের আরব বংশোদ্ভূত বলে পরিচয় দেন। শহর পেয়েছে এমন এক মেয়র, যিনি নির্বাচনের রাতে সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, “স্টাইনওয়েতে আমরা যেমন বলি, আনা মিনকুম, ওয়া ইলাইকুম”—অর্থাৎ, আমি তোমাদেরই একজন, তোমাদেরই সঙ্গে আছি। তাঁর স্ত্রী রামা দুওয়াজি একজন সিরীয়-আমেরিকান শিল্পী।

আগস্টে নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিন-এর একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন শহরটিকে আখ্যা দেয় ‘হাবিবি সিটি’। দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার সংস্কৃতির নবজাগরণকে তুলে ধরা হয়েছিল সেখানে। সংক্ষেপে এই অঞ্চলকে বলা হয় ‘সোয়ানা’। এক শতাব্দী আগে লিটল সিরিয়ার সংবাদপত্রে অটোমান রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক হত; এখন ব্রুকলিনের বাড়ির পিছনের উঠোনে সাহিত্যপাঠের আসর বসে। আটলান্টিক অ্যাভিনিউ ও স্টাইনওয়ে স্ট্রিটের ইয়েমেনি ক্যাফেগুলি যেন নতুন করে সেই ভূমিকা নিচ্ছে, যা একসময় লিটল সিরিয়ার কফিহাউসগুলির ছিল।

গত শীতে নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি প্রথমবার এই ইতিহাস নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে—‘নিউ ইয়র্ক: শহরে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার জীবন’। প্রদর্শনীটির কিউরেটর ছিলেন গ্রন্থাগারের মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামি অধ্যয়ন বিভাগের কিউরেটর হিবা আবিদ।

ম্যাডের কথায়, “এই নবজাগরণে যুক্ত বহু সংস্কৃতির মধ্যেই একসঙ্গে থাকার একটা বোধ রয়েছে। আমার মনে হয়, এর মধ্যে বদলে দেওয়ার শক্তি আছে। জাতিগত ও জাতীয়তাবাদী আবেগের মধ্যে তৈরি দেওয়ালগুলি এটি ভাঙছে… এর জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে।”

কিন্তু এই নবজাগরণের সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার সিরীয়দের জন্য ২০১২ সাল থেকে চালু থাকা সুরক্ষিত মর্যাদা তুলে নিচ্ছে এবং রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে গ্রিন কার্ডধারীদের আটক করছে। দান্দিয়ার বক্তব্য, “ডোনাল্ড ট্রাম্পের মা আমেরিকান নাগরিকত্ব পাওয়ার ৬০ বছর আগে থেকেই সিরীয় সমাজ নিউ ইয়র্কে ছিল। আর এখন ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি জনগোষ্ঠীর মর্যাদা কেড়ে নিচ্ছে, যারা তাঁর জন্মের দু’প্রজন্ম আগে থেকে এখানে রয়েছে।”

পরিচয়ের এই টানাপোড়েন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মাহমুদ খলিলের ঘটনায়। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষোভের এই নেতাকে আটক করার পর কিছুদিনের জন্য তিনি হয়ে উঠেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পরিচিত গ্রিন কার্ডধারীদের একজন। সিরিয়ার একটি শরণার্থীশিবিরে প্যালেস্টাইনি বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে তাঁর জন্ম। মায়ের বংশসূত্রে তাঁর আলজিরিয়ার নাগরিকত্ব রয়েছে। তিনি নিজেকে প্যালেস্টাইনি বলেন এবং বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে অধিকাংশ মানুষ তাঁকে সেই পরিচয়েই চেনেন।

খলিল যখন লুইজিয়ানার একটি আটককেন্দ্রে বন্দি ছিলেন, তখন নিউ ইয়র্কে তাঁর ছেলের জন্ম হয়। জন্মস্থানের সরল হিসাব ধরলে, শিশুটি সিরীয় উৎসের এক তরুণ আমেরিকান—আক্ষরিক অর্থেই জিব্রানের চিঠির প্রাপক।

খলিলকে আটক করা সরকার যদি তাঁর বেছে নেওয়া পরিচয় মেনে নিতে পারে, তা হলে জিব্রানকে নিজেদের বলে দাবি করা দুই আধুনিক রাষ্ট্র কেন তাঁর নিজের পরিচয়কে অগ্রাহ্য করবে?

একটি ফলকে ছয়বার মুছে গেল ‘সিরীয়’

স্মারকটি তৈরিতে খরচ হয়েছে ১৬ লক্ষ ডলার। তার মধ্যে ১৪ লক্ষ ডলার দিয়েছে শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক অলাভজনক সংস্থা মেলন ফাউন্ডেশন। উদ্দেশ্য ছিল জিব্রানকে সম্মান জানানো এবং লিটল সিরিয়ার ইতিহাসকে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরা। কিন্তু সেই ইতিহাসকে ‘সিরীয়’ বলা হবে, না ‘লেবাননীয়’—সেই প্রশ্নেই শেষ পর্যন্ত বদলে গেল ফলকের ভাষা।

এপ্রিলের শেষ দিকে স্মারকটি যখন স্থাপিত হয়, তখন ফলকের খসড়া লিখেছিলেন জেকবস; সম্পাদনা করেছিল পার্কস বিভাগ। তাতে বলা হয়েছিল, অভিবাসীরা এসেছিলেন “বৃহত্তর সিরিয়া থেকে, যার মধ্যে ছিল আজকের লেবানন, সিরিয়া এবং ঐতিহাসিক প্যালেস্টাইন”। পাড়াটি পরিচিত ছিল ‘সিরীয় পাড়া’ বা ‘লিটল সিরিয়া’ নামে। সেখানে বাস করতেন ‘প্রায় ১,২০০ সিরীয়’।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লেবাননের বিদেশমন্ত্রী এক্স-এ জানান, তাঁর মন্ত্রকের উদ্যোগে ফলকটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নতুন ফলকে লেখকদের লেবাননীয় পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। জুলাইয়ের মধ্যে নতুন ফলক বসানো হয়।

দু’টি ফলক পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, শব্দ ধরে ধরে কী ভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে। ‘১,২০০ সিরীয়’ হয়ে যায় ‘১,২০০ অভিবাসী’। ‘একটি সিরীয় স্কুল’ হয়ে যায় ‘একটি স্কুল’। মোজাইকে খোদাই করা উদ্ধৃতিগুলি আগে ‘সিরীয় লেখকদের রচনা’ থেকে নেওয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছিল; পরে তা হয়ে যায় শুধু ‘সেই লেখকদের’ রচনা। লেখকেরা আগে ছিলেন ‘সমাজের সম্মানিত সদস্য’; নতুন ফলকে বলা হয়, তাঁরা সেখানে ‘অনুষ্ঠান করতেন’। ‘সিরীয়’ শব্দটি ছ’বার বাদ দেওয়া হয়। পাড়াটির নিজস্ব নাম ছাড়া আর কোথাও শব্দটি রাখা হয়নি।

পার্কস বিভাগের শিল্পকলা ও পুরাকীর্তি বিষয়ক পরিচালক জোনাথন কুনের মতে, এ ছিল নিয়মিত প্রক্রিয়া। “ওগুলি স্থায়ী ফলক নয়, অস্থায়ী ফলক। সময়ের সঙ্গে সেগুলি পরিবর্তন করা যেতে পারে,” বলেন তিনি।

কিন্তু স্মারক তৈরির সঙ্গে শুরু থেকে যুক্ত কয়েকজন এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হন। জুলাই মাসে ম্যাডে এবং হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা, ইতিহাসবিদ টড ফাইন তাঁদের আপত্তি নিয়ে কমিউনিটি বোর্ডের দ্বারস্থ হন। ফাইনের কথায়, “জনপরিসরে ইতিহাস তুলে ধরার কাজ আমরা সাধারণত এভাবে করি না।”

তবে লেবাননের আপত্তির গুরুত্বও তিনি বুঝতেন। “একটি দেশের সরকার নিজের দেশে যুদ্ধ চলার মধ্যেও এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সময় বের করেছে—এ থেকেই বোঝা যায়, বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার।” কিন্তু তাঁর মতে, সংশোধন করতে গিয়ে অনেক দূর চলে যাওয়া হয়েছে।

ম্যাডের কাছে নতুন ফলকটি লেখক ও তাঁদের সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকে মুছে দেওয়ার শামিল। তাঁর অভিযোগ, এতে মুছে গিয়েছে ঔপনিবেশিকতা সম্পর্কে লেখকদের অবস্থান এবং নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে তাঁদের ধারণাও।

তা সত্ত্বেও জিব্রানের আহ্বান এখনও অনুরণিত হয়। বব ম্যাডে তাঁর দাদুর উত্তরাধিকার রক্ষার জন্য কমিউনিটি বোর্ডে হাজির হয়েছেন। পলা হাজর নিজের জীবনে দেখেছেন, কী ভাবে এক ইঞ্চি জায়গা না বদলিয়েও পরিচয় বদলে যায়—শৈশবে সিরীয় থেকে মিডল স্কুলে ওঠার সময় তিনি হয়ে যান লেবাননীয়। আর লিন্ডা জেকবস, যিনি স্মারকটির কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব সামলেছেন, প্রথম ফলকের লেখা লিখেছিলেন, আবার দ্বিতীয় ফলকটিও মেনে নিয়েছেন।

তবে জেকবস চান না, এই বিবাদ স্মারকটির অর্জনকে আড়াল করে দিক। অক্টোবরে একটি ইমেলে তিনি লিখেছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আরবিভাষী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস অবশেষে স্বীকৃতি পাচ্ছে, স্মৃতিতে ধরে রাখা হচ্ছে। এর বড় কারণ এলিজাবেথ বার্গার পার্কের এই সুন্দর স্মারক। আরব হিসেবে এই অর্জনে আমাদের অত্যন্ত গর্বিত হওয়া উচিত।”