বাংলাস্ফিয়ার: আবদুল এল-সায়েদ এমন এক পরিবর্তনের জন্য লড়ছেন, যা রাজনীতি থেকে টাকার দাপট সরাবে এবং সাধারণ মানুষের পকেটে টাকা পৌঁছে দেবে—শনিবার ডেট্রয়েটের জনসভায় এই ভাষাতেই ডেমোক্র্যাট সেনেট প্রার্থীর পাশে দাঁড়ালেন বারাক ওবামা। মিশিগানে আগাম ভোটদানের প্রথম দিনে এল-সায়েদ এবং দলের অন্য প্রার্থীদের সমর্থনে প্রচারে নেমেছিলেন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ডেট্রয়েটের ক্যাস টেকনিক্যাল হাইস্কুলে হাজার হাজার মানুষের সামনে ওবামা বলেন, এল-সায়েদ “অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের মাধ্যমে আমরা যে কাজ শুরু করেছিলাম, তা শেষ করবেন এবং প্রত্যেক মার্কিন নাগরিকের জন্য মানসম্মত, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবেন।”
ভোটারদের ভোট দিতে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত সন্ধ্যার এই সমাবেশের প্রধান বক্তা ছিলেন ওবামা। সভাটি হয়েছিল মার্কিন সেনেটের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এল-সায়েদ এবং মিশিগানের সেক্রেটারি অব স্টেট জসলিন বেনসনের সমর্থনে। বেনসন গভর্নর পদে দলের প্রার্থী।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে “নিজের ও পরিবারের সম্পদ বাড়ানোর” অভিযোগ তোলেন ওবামা। তাঁর বক্তব্য, এই প্রশাসন ক্ষমতার শীর্ষে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার এক সংস্কৃতি তৈরি করেছে। তিনি বলেন, “এ ভাবে সুবিধা বেচতে এতটা মরিয়া কোনও প্রেসিডেন্ট কখনও দেখিনি।”
মিশিগানে আগাম ভোটদানের প্রথম দিনেই এই জনসভা হয়। সাধারণ নির্বাচন ৩ নভেম্বর। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ওবামার সশরীরে প্রচারে নামারও এটি প্রথম সপ্তাহান্ত। শনিবার দিনের শুরুতে তিনি ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডে প্রাক্তন সেনেটর শেরড ব্রাউন এবং গভর্নর পদের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাক্টনের হয়ে প্রচার করেন। সেখানেও হোয়াইট হাউস ও রিপাবলিকানদের নিশানা করে একই রকম তীব্র আক্রমণ শানিয়েছিলেন তিনি।
ডেট্রয়েটের সভাই এল-সায়েদের প্রতি ওবামার প্রথম প্রকাশ্য সমর্থন। অগস্টে দলের প্রার্থী বাছাইয়ের তিক্ত লড়াইয়ে ওবামা কোনও পক্ষ নেননি। পেশায় চিকিৎসক এবং ওয়েন কাউন্টির প্রাক্তন স্বাস্থ্যকর্তা এল-সায়েদ সেই প্রাইমারিতে পরাজিত করেন মধ্যপন্থী কংগ্রেস সদস্য হেইলি স্টিভেন্সকে। স্টিভেন্সের পিছনে ছিল ডেমোক্র্যাট দলের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব এবং ইজরায়েলপন্থী সংগঠনগুলির সমর্থন।
প্রশাসনকে আক্রমণ করতে গিয়ে প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথকেও বিদ্রুপ করেন ওবামা। তাঁর কটাক্ষ, হেগসেথের সমস্ত মনোযোগ যেন “আমাদের সেনাদের চোয়ালের গড়ন আর টেস্টোস্টেরনের মাত্রা” নিয়ে। ওবামা প্রশ্ন করেন, “আপনাদের কী মনে হয়, এই লোকটা রোজ আয়নার সামনে কতটা সময় কাটান?”
শুল্কের প্রসঙ্গে ওবামা বলেন, ট্রাম্প সবচেয়ে কঠোর হয়েছেন “সেই সুপরিচিত অশুভ সাম্রাজ্যের” বিরুদ্ধে। তাঁর ইঙ্গিত কানাডার দিকে—ডেট্রয়েট থেকে সেতু পেরিয়ে গাড়িতে কয়েক মিনিটের পথ। ওবামা বলেন, “এরাই তো আমাদের মার্টিন শর্ট আর মেপল সিরাপ দিয়েছে।”
হোয়াইট হাউস সংস্কারের ট্রাম্পের উদ্যোগ নিয়েও কটাক্ষ করেন তিনি। হোয়াইট হাউসের বলরুম ও রোজ গার্ডেন-সহ ওয়াশিংটনের নানা সংস্কারকাজের প্রসঙ্গ তুলে ওবামা বলেন, “ওঁর তো এইচজিটিভিতে থাকা উচিত।” তাঁর আরও বিদ্রুপ, “হোয়াইট হাউসের এমন চেহারা করেছেন, যেন সাদ্দাম হুসেন সেখানে একটা চিজকেক ফ্যাক্টরি খুলেছেন।”
ওবামা আদৌ এল-সায়েদকে সমর্থন করবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। সবার জন্য ‘মেডিকেয়ার’ চালুর প্রবক্তা এল-সায়েদ একসময় ওবামার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অভ্যন্তরীণ সাফল্য অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টকে সীমিত সংস্কারের ব্যবস্থা বলে মন্তব্য করেছিলেন। প্রাইমারির পরে দু’জনের ফোনে কথা হয়। তার পর থেকে ওবামাকে নিজের পথপ্রদর্শক হিসেবে উল্লেখ করেছেন এল-সায়েদ।
ওয়েন কাউন্টিতেই এল-সায়েদকে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি পুষিয়ে নিতে হবে। ডেট্রয়েট এই কাউন্টির সদর শহর। অগস্টের প্রাইমারিতে এখানে স্টিভেন্স প্রায় ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে এল-সায়েদকে হারিয়েছিলেন; এল-সায়েদ পেয়েছিলেন প্রায় ৪৫ শতাংশ। ডেট্রয়েটের জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি কৃষ্ণাঙ্গ। ওবামা শেষবার এই শহরে প্রচারে এসেছিলেন ২০২৪ সালের অক্টোবরে, কমলা হ্যারিসের সমর্থনে। গত মাসে হ্যারিস নিজেও ডেট্রয়েটে এল-সায়েদের সঙ্গে প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন।
গত ২৫ বছরে মিশিগানের কোনও সেনেট আসন রিপাবলিকানদের দখলে যায়নি। তবে দেশজুড়ে ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকে যে আসনগুলি ছিনিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি বলে রিপাবলিকানরা মনে করছে, এটি তার অন্যতম। এল-সায়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাম্প-সমর্থিত প্রাক্তন কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্স। ২০২৪ সালের সেনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট এলিসা স্লটকিনের কাছে অর্ধেক শতাংশ পয়েন্টেরও কম ব্যবধানে হেরেছিলেন তিনি। কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের মূল্যায়নে এবারের লড়াই যে কোনও দিকে যেতে পারে।
সভায় অন্যতম বক্তা ছিলেন স্লটকিনও। জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, “মিশিগান লড়াকু মানুষদের নির্বাচিত করায় বিশ্বাস করে।” এল-সায়েদের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্যের প্রসঙ্গে স্লটকিনের বক্তব্য, “তাতে অসুবিধা নেই। কারণ, তার চেয়ে অনেক বেশি বিষয়ে আমরা একমত।”
তিনি বলেন, “হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চলেছি আমরা।”
অক্টোবরের মাঝামাঝি মিশিগানজুড়ে সম্ভাব্য ভোটদাতাদের মধ্যে মারিস্টের সমীক্ষায় এল-সায়েদের সমর্থন ছিল ৫০ শতাংশ এবং রজার্সের ৪৮ শতাংশ। এই ব্যবধান সমীক্ষার সম্ভাব্য ত্রুটিসীমার মধ্যেই পড়ে। কাছাকাছি সময়ে রিয়ালক্লিয়ারপলিটিক্সের বিভিন্ন সমীক্ষার গড়ে এল-সায়েদ প্রায় ২.৬ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন।
প্রচারপর্বজুড়ে এল-সায়েদকে আক্রমণ করেছেন ট্রাম্প। তাঁকে “জিহাদি” বলেছেন, তাঁর নামের মধ্যবর্তী অংশ টেনে এনেছেন এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। এল-সায়েদ এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। এই আক্রমণকে ঘিরে বছরের অন্যতম ভাইরাল মুহূর্তও তৈরি হয়েছে। বামপন্থী অনলাইন স্ট্রিমার হাসান পাইকারের সঙ্গে অনুষ্ঠানে হাজির হওয়ার জন্য ডেমোক্র্যাট দলের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের শিবির থেকেও লাগাতার সমালোচনার মুখে পড়েছেন এল-সায়েদ।
রবিবার ট্রাম্পেরও মিশিগানে যাওয়ার কথা। কানাডা সীমান্তবর্তী পোর্ট হিউরনে মিশিগানের রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে জনসভা করবেন তিনি। শহর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেন্ট ক্লেয়ার কাউন্টিতে এই প্রথম কোনও ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের সফর হতে চলেছে।
নির্বাচিত হলে এল-সায়েদ হবেন মার্কিন সেনেটের প্রথম মুসলিম এবং প্রথম মিশরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন সদস্য। অন্যদিকে গভর্নর পদে বেনসনের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য জন জেমস। জেমস জিতলে তিনিই হবেন মিশিগানের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর।
এল-সায়েদের সঙ্গে নিজের মতপার্থক্যের প্রসঙ্গে ফিরে ওবামা স্বীকার করেন, কেউ কেউ তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, এল-সায়েদ “প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন আপনার কিছু কাজ পছন্দ করেননি।”
ওবামা বলেন, “প্রতিটি বিষয়ের প্রতিটি খুঁটিনাটিতে আমরা একমত হব না।” তার পরেই তাঁর রসিকতা, “জানেন, আর কে আমার সব কাজের সঙ্গে একমত হন না? মিশেল ওবামা।”
ওবামার কথায়, “এই সমাজে প্রত্যেকে যাতে ন্যায্য সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করার মূল্যবোধে আমরা একমত। আর ব্যবস্থাটা যেন শুধু উপরে বসে থাকা মানুষগুলির স্বার্থেই না চলে।”