বাংলাস্ফিয়ার: প্যারিসের আইফেল টাওয়ারে একটি ধর্মীয় সংগঠনের সফর ঘিরে বিতর্কের মধ্যে ওই সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ল কেন্দ্রীয় সরকার। অভিযোগ, সংগঠনটির ‘নারীবিরোধী’ দাবিকে কেন্দ্র করে এক দিনের জন্য বন্ধ রাখতে হয় বিশ্বখ্যাত এই পর্যটনস্থল। ঘটনাটি নিয়ে ফ্রান্সে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানায়, এই বিতর্কে ভারত সরকার কোনও ভাবেই জড়িত নয়।

প্যারিসের পুর কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছেন। যদিও বিএপিএস নামে পরিচিত ওই হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন মহিলা কর্মীদের সঙ্গে ‘যোগাযোগ সীমিত করার’ কোনও দাবি জানানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আইফেল টাওয়ার বন্ধ হওয়ার আগের দিনই প্যারিসের শহরতলিতে বিএপিএস নির্মিত একটি মন্দিরের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দশ মিনিটের ভার্চুয়াল ভাষণে তিনি মন্দির নির্মাণকে ভারত-ফ্রান্স সাংস্কৃতিক সম্পর্কের এক ‘নতুন অধ্যায়’ বলে বর্ণনা করেন। বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই এ ধরনের অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন। আইফেল টাওয়ারের বিতর্কের সঙ্গে ভারতের কোনও সম্পর্ক নেই।

আইফেল টাওয়ার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের দাবি, মন্দির উদ্বোধন উপলক্ষে প্যারিসে আসা বিএপিএস নেতারা সপ্তাহান্তে ওই দর্শনীয় স্থানটিতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁদের সন্ন্যাসীদের প্রতিনিধিদলের, বিশেষত ৯৩ বছর বয়সি ধর্মগুরুর দৃষ্টির আড়ালে মহিলা কর্মীদের সরিয়ে রাখার জন্য নির্দিষ্ট ভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছিল।

মহিলা সহকর্মীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে এক দিনের ধর্মঘট ডেকেছিল আইফেল টাওয়ারের কর্মী সংগঠন। তাদের অভিযোগ, কয়েকটি জায়গায় মহিলা কর্মীদের বদলে পুরুষদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিনিধিদল সেখানে থাকাকালীন মহিলাদের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা দিয়ে যাতায়াত করতেও নিষেধ করা হয়েছিল।

বিতর্ক নিয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘‘প্যারিস এলাকায় বিএপিএস সংস্থার একটি মন্দির উদ্বোধনের কথা আমরা জানি। তবে টাওয়ার-সংক্রান্ত বিষয়টি সম্পূর্ণ ভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির—বিএপিএস এবং আইফেল টাওয়ার কর্তৃপক্ষের—মধ্যেকার ব্যাপার।’’

মহিলা কর্মীদের আইফেল টাওয়ারের কিছু অংশে প্রবেশ করতে না দেওয়ার কথিত দাবি সম্পর্কে সরকার কি বিএপিএসের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে? অথবা সরকার কি এখন ওই সংগঠনের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখবে? ‘দ্য হিন্দু’র এই প্রশ্নের উত্তরে জয়সওয়াল বলেন, এমন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ‘শুভেচ্ছা জানানো’ একটি ‘প্রচলিত রীতি’। এ বিষয়ে আর কোনও মন্তব্য করা হবে না বলেও জানান তিনি।

চলতি বছরের গোড়ায় ফ্রান্সে ভারতের রাষ্ট্রদূত সঞ্জীব সিংলা ওই মন্দিরের একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেছিলেন। মঙ্গলবার সমাজমাধ্যমের একটি পোস্টে ইউনেস্কোয় ভারতের রাষ্ট্রদূত বিশাল বর্মাও বিএপিএসের প্রশংসা করেন। তিনি জানান, ২০২২ সালে তাঁর স্ত্রী মন্দিরের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন।

বোচাসনবাসী অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামীনারায়ণ সংস্থা, সংক্ষেপে বিএপিএস, দিল্লির অক্ষরধাম মন্দিরের জন্য পরিচিত। আহমেদাবাদে সদর দফতর থাকা এই সংগঠন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মন্দির পরিচালনা করে। সংগঠনে মহিলারা থাকলেও ব্রহ্মচর্য পালনকারী সন্ন্যাসীদের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ এবং নারী-পুরুষের মধ্যে পৃথকীকরণের রীতির জন্য এটি পরিচিত।

‘দ্য হিন্দু’কে দেওয়া লিখিত জবাবে অবশ্য এমন অনুরোধ করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিএপিএস। তাদের ফ্রান্স শাখা জানিয়েছে, ‘‘আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাবে স্পষ্ট করতে চাই, এই সমন্বয়ের উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভাবে ব্যবস্থাপনাগত সৌজন্য ও প্রয়োজনীয় বন্দোবস্ত নিশ্চিত করা, যাতে একটি বড় দলের সফর নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় এবং টাওয়ারের কর্মী বা সাধারণ মানুষের কোনও অসুবিধা না হয়।’’

প্রতিনিধিদলে একশোর বেশি সদস্য ছিলেন বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, ‘‘কোনও পর্যায়েই লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনও অনুরোধ জানানোর উদ্দেশ্য ছিল না। এর বিপরীত কোনও দাবি আমাদের ধর্মীয় সংগঠন বা প্রতিনিধিদলের ভাবনা ও মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করে না।’’

এদিকে সমাজমাধ্যমে ওয়েইল বলেছেন, ‘‘আইফেল টাওয়ারের কর্মীদের অনুভূতি আমি বুঝতে পারছি। সাধারণ মানুষকে স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রে লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনও ভেদাভেদ বা অন্য কোনও ধরনের বৈষম্যমূলক বিবেচনাকে ধর্মীয় কোনও যুক্তি দিয়েই সমর্থন করা যায় না।’’