মনোনয়নের শেষ দিন ১৮ নভেম্বর; আর্সেন ওয়েঙ্গারের নাম উঠলেও তাঁকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে না বলেই খবর

নিক এমস ও ম্যাট হিউজের বিশেষ প্রতিবেদন | দ্য গার্ডিয়ান
আপনার দেওয়া প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদ

ফিফা সভাপতি নির্বাচনে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো একজন প্রার্থী বেছে নেওয়ার প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে উয়েফা ও তার সহযোগীরা। আগামী সপ্তাহেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত হয়ে যেতে পারে।

মার্চের নির্বাচনে ইনফান্তিনোকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রস্তুতিতে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। যাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান, তাঁদের ১৮ নভেম্বরের মধ্যে প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে হবে। তবে বিকল্প প্রার্থী খোঁজার চেষ্টা সফল হতে পারে বলে ক্রমশ আশাবাদী হয়ে উঠছে উয়েফা। সাম্প্রতিক কয়েকটি ধাক্কা সত্ত্বেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল এশীয় ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল-খলিফার অবস্থান বদল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে চতুর্থ মেয়াদে ফিফা সভাপতি হওয়ার জন্য ইনফান্তিনোর উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছেন তিনি।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত হলে তা উয়েফার কার্যনির্বাহী কমিটির সামনে পেশ করা হবে। ইউরোপীয় কনফেডারেশনের সদস্য দেশগুলির ফুটবল সংস্থার প্রধানদের একটি অনলাইন বৈঠকেও নামটি তুলে ধরা হবে। ঘোষণা যতটা সম্ভব মনোনয়নের শেষ দিনের কাছাকাছি করার পক্ষেই মত রয়েছে। মূল উদ্দেশ্য, প্রস্তাবিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফিফার সম্ভাব্য ‘নোংরা কৌশলের’ প্রচারের সুযোগ কমিয়ে দেওয়া। তবে কয়েকটি সূত্রের ধারণা, প্রয়োজনীয় বৈঠকগুলি আগামী সাত দিনের মধ্যেই ডাকা হতে পারে।

ওয়েঙ্গার কি দৌড়ে?

সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে পরিচিত যে নামগুলি উঠে এসেছে, তাঁদের একজন আর্সেন ওয়েঙ্গার। ইউরোপীয় ফুটবলের কোনও কোনও মহলে তাঁকে এমন প্রার্থী হিসেবে পছন্দ করা হচ্ছে, যিনি বিভিন্ন পক্ষকে একজোট করতে পারবেন। কিন্তু আর্সেনালের প্রাক্তন ম্যানেজারকে বাস্তবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না। বর্তমানে ফিফার বিশ্ব ফুটবল উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ওয়েঙ্গারকে এই সপ্তাহেও আজারবাইজানে ফিফার অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপে দেখা গিয়েছে। সেখানে নিজের নিয়োগকর্তার নতুন প্রতিযোগিতার প্রশংসাই করেছেন তিনি।

ভোটের অঙ্ক কঠিন

যিনিই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করুন না কেন, ইনফান্তিনোকে হারানোর সম্ভাবনা নিয়ে তাঁকে গভীর সংশয়ের মুখে পড়তে হবে। ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ বা এফএফই কেলেঙ্কারিতে প্রবল ধাক্কা খাওয়ার পর গত কয়েক সপ্তাহে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক স্তরে তৎপরতা শুরু করেছেন ইনফান্তিনো।

তাঁকে হারাতে প্রয়োজনীয় ১০৬টি ভোট পেতে হলে ইউরোপের ভোটের পাশাপাশি এশিয়া, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল কনফেডারেশন কনকাকাফ ও আফ্রিকা থেকেও উল্লেখযোগ্য সমর্থন আদায় করতে হবে প্রতিদ্বন্দ্বীকে। এমনকি গোপন ব্যালটে ইউরোপের সব ভোটও যে তাঁর ঝুলিতে আসবে, তা নিশ্চিত নয়।

নির্বাচনের মাধ্যমে ইনফান্তিনোকে সরানো আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে কোনও কোনও মহলে। তাঁদের একাংশের মতে, রাবাতের নির্বাচনে ব্যাপক বয়কট অথবা ভোটদানে বিরত থাকাই বরং বেশি কার্যকর কৌশল হতে পারে। এতে ইনফান্তিনো আন্তর্জাতিক ফুটবলে একঘরে হয়ে পড়বেন বলে তাঁদের ধারণা। ফিফার বিপুল আয়ের জন্য ইউরোপের উপর নির্ভরশীলতার কথা ইনফান্তিনো নিজেও কখনও গোপন করেননি।

প্রশাসনে অচলাবস্থা

এখন ফিফার প্রশাসনিক ব্যবস্থাও এক ধরনের অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে। ২০২৯ সালের পুরুষদের ক্লাব বিশ্বকাপ তার অন্যতম উদাহরণ। প্রতিযোগিতাটির আয়োজক দেশ এখনও ঠিক হয়নি। কোন কাঠামোয় এবং কোথায় সেটি আয়োজন করা হবে, তা নিয়েও বিশেষ অগ্রগতি নেই। ফলে প্রস্তুতির কাজ কার্যত থমকে রয়েছে।

তা সত্ত্বেও মার্চে ইনফান্তিনোর মুখোমুখি হওয়ার সংকল্প থেকে সরছে না উয়েফা। প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তত দিনে পরিস্থিতি ফিফা সভাপতির আরও প্রতিকূলে চলে যেতে পারে। ব্যর্থ এফএফই প্রকল্পের নথি প্রকাশের দাবিতে আমেরিকার চারটি আদালতে আবেদন করেছে উয়েফা। ওই নথির ভিত্তিতে আর্থিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে সুইৎজারল্যান্ডে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করতে চায় তারা।

এই আইনি উদ্যোগের চাপও রয়েছে ইনফান্তিনোর উপর। ফিফা অবশ্য উয়েফার বিরুদ্ধে ‘হয়রানি’ এবং ‘ভুল তথ্য ছড়ানো’র অভিযোগ এনেছে। ইনফান্তিনো কোনও অন্যায় করেছেন, এমন অভিযোগও মানতে নারাজ তারা।

আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মামলার প্রাথমিক রায় আসতে পারে। তবে প্রতিকূল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফিফা আপিল করলে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মামলায় উয়েফা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারলে নির্বাচন বা প্রার্থী বাছাইয়ের গোটা প্রক্রিয়াই তখন গুরুত্ব হারাতে পারে।

৪২ প্রশ্নের জবাব কোথায়?

ফিফার পরিচালনব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে ৪২টি প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য সোমবার পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল উয়েফা। প্রশ্নগুলির মধ্যে রয়েছে এফএফই, ফিফার শান্তি পুরস্কার এবং বিশ্বকাপ চলাকালীন ফোলারিন বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত। গার্ডিয়ানের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, এখনও কোনও জবাব পায়নি উয়েফা।

ইনফান্তিনো অবশ্য গত সপ্তাহে বলেছিলেন, ফিফা ‘প্রক্রিয়া যতটা অনুমতি দেয় এবং আমাদের সামর্থ্যে যতটা কুলায়, সেই অনুযায়ী উত্থাপিত সব প্রশ্নের উত্তর দেবে’।

আমেরিকায়ও চাপ

মঙ্গলবারের আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনও ইনফান্তিনোর বিরোধীদের নতুন করে আশাবাদী করতে পারে। জুলাই মাসে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের বিচারবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য জেমি রাসকিন ইনফান্তিনো, ফিফা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে তদন্ত শুরু করেন। প্রাসঙ্গিক নথিপত্র জমা দেওয়ার পাশাপাশি এমন একটি সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার জন্য ইনফান্তিনোকে বলেছিলেন তিনি, যার বক্তব্য লিখিতভাবে নথিভুক্ত করা হবে। তবে সেই সাক্ষাৎকার এখনও হয়নি।

বর্তমানে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে রাসকিনের তদন্ত নতুন গতি পেতে পারে।

সব মিলিয়ে ১৮ নভেম্বরের আগে সময়টুকু উয়েফা এবং তার সভাপতি আলেকসান্দার চেফেরিনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্লোভেনিয়ার এই ফুটবল প্রশাসকই ফিফার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি। গত মাসে কোপেনহেগেনে ইউরোপীয় ফুটবল ক্লাবগুলির সাধারণ সভায় ইনফান্তিনোকে আক্রমণ করতে গিয়ে ‘রাজার নতুন পোশাক’-এর উপমা টেনে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন তিনি।

বাস্তবে ইনফান্তিনোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন, এমন একজন প্রার্থীকে সামনে আনতে পারলে উয়েফার এই অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই বাড়বে।

অনূর্ধ্ব-২০ মহিলা বিশ্বকাপের আগে উয়েফা যেভাবে পিছু হটেছিল, তার পুনরাবৃত্তি হলে অবশ্য বড় ধাক্কা খেতে পারে সংস্থাটি। সে বার প্রতিযোগিতা বয়কটের হুমকি দিয়েও শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল উয়েফা।