লগইনসদস্যতালেখক
হোম›খেলা›২৩ সেন্টিমিটারের ‘মানব লেজ’ অপসারণে নজির এসএসকেএমে, বিরল অস্ত্রোপচারে সুস্থ ১৩ বছরের কিশোর
খেলা

২৩ সেন্টিমিটারের ‘মানব লেজ’ অপসারণে নজির এসএসকেএমে, বিরল অস্ত্রোপচারে সুস্থ ১৩ বছরের কিশোর

হাইলাইটস কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে ১৩ বছরের এক কিশোরের ২৩ সেন্টিমিটার দীর্ঘ ‘ট্রু হিউম্যান টেল’ বা প্রকৃত মানব লেজের সফল অস্ত্রোপচার। চিকিৎসকদের দাবি, অপারেশন করা ‘ট্রু হিউম্যান টেল’-এর মধ্যে এটিই বিশ্বের…

২৩ সেন্টিমিটারের ‘মানব লেজ’ অপসারণে নজির এসএসকেএমে, বিরল অস্ত্রোপচারে সুস্থ ১৩ বছরের কিশোর

হাইলাইটস

  • কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে ১৩ বছরের এক কিশোরের ২৩ সেন্টিমিটার দীর্ঘ ‘ট্রু হিউম্যান টেল’ বা প্রকৃত মানব লেজের সফল অস্ত্রোপচার।
  • চিকিৎসকদের দাবি, অপারেশন করা ‘ট্রু হিউম্যান টেল’-এর মধ্যে এটিই বিশ্বের দীর্ঘতম নথিভুক্ত উদাহরণ।
  • জন্মগত বিরল শারীরিক অস্বাভাবিকতার কারণে কিশোরটি দীর্ঘদিন সামাজিক অস্বস্তি ও মানসিক চাপে ভুগছিল।
  • নিউরোসার্জন, প্লাস্টিক সার্জন ও অ্যানাস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
  • বর্তমানে কিশোর সুস্থ রয়েছে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছে।

বাংলাস্ফিয়ার: জন্ম থেকেই কোমরের নিচে অস্বাভাবিকভাবে ঝুলে থাকা একটি লম্বা অঙ্গ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটিও ক্রমশ দীর্ঘ হয়েছে। অবশেষে কলকাতার এসএসকেএম (এসএসকেএম) হাসপাতালের চিকিৎসকেরা ১৩ বছরের এক কিশোরের শরীর থেকে ২৩ সেন্টিমিটার দীর্ঘ ‘ট্রু হিউম্যান টেল’ বা প্রকৃত মানব লেজ সফলভাবে অপসারণ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বিরল নজির গড়লেন।

হাসপাতালের চিকিৎসকদের দাবি, চিকিৎসা-সাহিত্যে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারিত ‘ট্রু হিউম্যান টেল’-এর মধ্যে এটি বিশ্বের দীর্ঘতম নথিভুক্ত উদাহরণ। এমন ঘটনা এতটাই বিরল যে বিশ্বজুড়ে এ ধরনের কেস হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র রয়েছে।

চিকিৎসকদের ব্যাখ্যায়, ‘ট্রু হিউম্যান টেল’ সাধারণ কোনও টিউমার বা চামড়ার বৃদ্ধি নয়। এটি একটি জন্মগত অস্বাভাবিকতা, যা ভ্রূণের বিকাশের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে মানুষের ভ্রূণের একটি ক্ষুদ্র লেজের মতো অংশ তৈরি হয়। সাধারণত আট সপ্তাহের মধ্যেই সেটি শরীরের ভিতরে শোষিত হয়ে যায়। কিন্তু অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে সেই অংশ সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয় না এবং জন্মের পরও লেজের মতো গঠন হিসেবে থেকে যেতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, প্রকৃত মানব লেজে সাধারণত চামড়া, চর্বি, সংযোজক কলা, রক্তনালি ও স্নায়ু থাকতে পারে, কিন্তু হাড় বা কশেরুকা থাকে না। এ কারণেই একে ‘ট্রু টেল’ বলা হয়। অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে যে লেজসদৃশ গঠন দেখা যায়, তা আসলে স্পাইনা বিফিডা, লিপোমা বা অন্য কোনও জন্মগত ত্রুটির বহিঃপ্রকাশ। সেগুলিকে ‘পসুডো টেল’ বা ছদ্ম মানব লেজ বলা হয়।

এই কিশোরের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের আগে একাধিক এমআরআই ও অন্যান্য পরীক্ষা করা হয়, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে লেজটির সঙ্গে মেরুদণ্ড বা স্পাইনাল কর্ডের কোনও বিপজ্জনক সংযোগ রয়েছে কি না। পরীক্ষার পর বিশেষজ্ঞদের দল সিদ্ধান্ত নেয় যে অস্ত্রোপচার নিরাপদভাবেই করা সম্ভব।

এরপর নিউরোসার্জারি, প্লাস্টিক সার্জারি এবং অ্যানাস্থেসিয়ার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বহুবিভাগীয় দল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করে। দীর্ঘ ও সূক্ষ্ম এই অস্ত্রোপচারে লেজের সম্পূর্ণ অংশ অপসারণ করা হয় এবং একই সঙ্গে কিশোরের শরীরের স্বাভাবিক গঠনও বজায় রাখা হয়।

চিকিৎসকদের বক্তব্য, অপারেশনের পরে কিশোরের স্নায়বিক কোনও জটিলতা দেখা যায়নি। সে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারছে এবং ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনে ফিরছে। অস্ত্রোপচারের পর নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে তাকে।

পরিবারের সদস্যদের কথায়, জন্মের পর থেকেই ছেলেটির শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে নানা কৌতূহল, কটাক্ষ ও সামাজিক অস্বস্তির মুখে পড়তে হয়েছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্কুল ও সামাজিক পরিবেশে মানসিক চাপও বেড়ে যায়। চিকিৎসার পর তারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘ট্রু হিউম্যান টেল’ অত্যন্ত বিরল একটি জন্মগত অবস্থা। বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা-সাহিত্যে এর নথিভুক্ত ঘটনা খুবই সীমিত। তাই এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে সঠিক রোগনির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাহ্যিকভাবে দেখতে একই রকম হলেও অনেক সময় এর আড়ালে মেরুদণ্ডের গুরুতর জন্মগত ত্রুটি লুকিয়ে থাকতে পারে, যার চিকিৎসার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা।

এসএসকেএম হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, এই অস্ত্রোপচার শুধু একটি বিরল শল্যচিকিৎসার সাফল্য নয়, বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের জন্মগত অস্বাভাবিকতার চিকিৎসা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করবে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে যে জটিল ও বিরল অস্ত্রোপচার পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালগুলিও আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন করেছে।

চিকিৎসকদের আশা, এই কিশোরের ঘটনাটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন আগ্রহ তৈরি করবে এবং বিরল জন্মগত অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতাও বাড়াবে। একই সঙ্গে সময়মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে এ ধরনের বিরল সমস্যারও সফল সমাধান সম্ভব—এই বার্তাই তুলে ধরছে এসএসকেএমের এই উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক