হাইলাইটস

  • বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে সমর্থন জানাতে জাতীয় পতাকা টাঙিয়েও রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছেন অনেক সমর্থক।
  • অনেকে মনে করছেন, সেন্ট জর্জের পতাকাকে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতীক বানিয়ে ফেলা হয়েছে।
  • তাই পতাকায় লেখা হচ্ছে— “ফুটবলের জন্য, ফারাজের জন্য নয়”।
  • অভিবাসন, জাতিগত পরিচয় ও ইংরেজ জাতীয়তাবাদ নিয়ে ব্রিটেনে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু এখন জাতীয় পতাকা।
  • অন্যদিকে বহু ফুটবল সমর্থকের দাবি, পতাকার সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই; এটি শুধুই দলের প্রতি সমর্থনের প্রতীক।

বিশ্বকাপের উত্তেজনার মধ্যেই ইংল্যান্ডে জাতীয় পতাকা ঘিরে শুরু হয়েছে এক অন্যরকম রাজনৈতিক ও সামাজিক লড়াই। দেশের জাতীয় পতাকা সেন্ট জর্জের পতাকা—সাদা পটভূমিতে লাল ক্রস—যা একসময় নিছক দেশপ্রেম ও ফুটবল সমর্থনের প্রতীক ছিল, এখন অনেকের চোখে তা ডানপন্থী জাতীয়তাবাদ ও অভিবাসীবিরোধী রাজনীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

এই কারণেই এসেক্সের বাসিন্দা এবং ফুটবলপ্রেমী ফ্লো ফিঞ্চ নিজের বাড়ির সামনে পাঁচ ফুট লম্বা একটি ইংল্যান্ডের পতাকা টাঙিয়েছেন, তবে তাতে বিশেষ বার্তা লিখে—“ফুটবলের জন্য, ফারাজের জন্য নয়”।

ফিঞ্চের বক্তব্য, তিনি ইংল্যান্ডের ফুটবল দলকে ভালোবাসেন, কিন্তু সেই ভালোবাসাকে কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চান না। তাঁর কথায়, “আমি কাউকে আমার ইংল্যান্ড বা আমার ব্রিটেনকে এমন কিছুতে পরিণত করতে দেব না, যা আসলে নয়।”

এই পতাকাটি তিনি চতুর্থবার টাঙিয়েছেন। আগের তিনবারই কেউ সেটি ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিল বলে তাঁর অভিযোগ।

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর গোটা ইংল্যান্ডজুড়ে ঘরবাড়ি, পানশালা, দোকানপাট—সব জায়গাতেই সেন্ট জর্জের পতাকা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু অনেকের কাছে এখন এই পতাকা শুধুই ফুটবলের প্রতীক নয়; এটি জাতীয় পরিচয়, অভিবাসন ও জাতিগত রাজনীতিরও প্রতীক হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে ডানপন্থী দল Reform UK-এর জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। ফ্লো ফিঞ্চের বসবাস এসেক্সে, যেখানে স্থানীয় নির্বাচনে প্রথমবারের মতো কাউন্টি কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে এই দল। তাঁর দাবি, তারপর থেকেই আশপাশের এলাকায় ইংল্যান্ডের পতাকা টাঙানোর প্রবণতা অনেক বেড়েছে, যা তিনি অভিবাসীবিরোধী রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করেন।

নিজের পতাকার ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করার পর তা লক্ষ লক্ষ মানুষের নজর কেড়েছে। এরপর আরও অনেকে নিজেদের পতাকায় বিভিন্ন বার্তা লিখে জানাতে শুরু করেছেন যে তাঁরা ফুটবলকে সমর্থন করেন, কিন্তু বর্ণবিদ্বেষ বা অভিবাসীবিরোধী রাজনীতিকে নয়।

বর্ণবৈষম্যবিরোধী সংগঠন Hope Not Hate-এর গবেষণা বিভাগের প্রধান Joe Mulhall বলেন, পতাকাকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আসলে ব্রিটিশ জাতীয় পরিচয় নিয়ে চলা বৃহত্তর দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন। তাঁর মতে, এখন প্রশ্ন হচ্ছে—কে প্রকৃত ইংরেজ, আর সেই পরিচয়ের মধ্যে কারা জায়গা পাবেন।

গত বছর “অপারেশন রেইজ দ্য কালার্স” নামে একটি প্রচারের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের নানা শহরে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে সেন্ট জর্জের পতাকা ও ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ্যাক টাঙানো শুরু হয়। পরে জানা যায়, এই কর্মসূচির সূচনা করেছিলেন কয়েকজন পরিচিত কট্টর ডানপন্থী কর্মী। এরপর তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশের নানা জায়গায় মানুষ এতে যোগ দেন।

রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও Reform UK-এর সাবেক প্রার্থী Matt Goodwin দাবি করেছেন, বহু মানুষ মনে করেন মূলধারার সমাজ তাঁদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছে। তাঁর মতে, ইংরেজ পরিচয় মূলত একটি নির্দিষ্ট জাতিগত উত্তরাধিকারের সঙ্গে যুক্ত।

সমালোচকদের অভিযোগ, এই ধরনের বক্তব্য আসলে বর্ণ ও জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকেই শক্তিশালী করে।

অনেক স্থানীয় প্রশাসন অনুমতি ছাড়া সরকারি ল্যাম্পপোস্টে পতাকা টাঙানো বন্ধ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাতেই নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ, জাতীয় পতাকা টাঙানোকে নিষিদ্ধ করা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।

জো মুলহলের মতে, অনেক ক্ষেত্রে এই পতাকাগুলি শুধু দেশপ্রেম প্রকাশের জন্য নয়; বরং “আমরা” এবং “ওরা”—এই বিভাজন তৈরি করার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

Nigel Farage নিজেও এই বিতর্কে সরব হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, যারা রাস্তার খুঁটিতে ইংল্যান্ডের পতাকা টাঙাতে বাধা দেয়, তারা আসলে ইংল্যান্ডের পতাকাকে লজ্জার বিষয় বলে মনে করে। তাঁর আরও মন্তব্য, “যদি কেউ এই দেশে এসে আমাদের পতাকা পছন্দ না করে, তাহলে সে যেখানে থেকে এসেছে সেখানে ফিরে যেতে পারে।”

জনমত সমীক্ষা সংস্থা YouGov-এর এক সমীক্ষায় দেখা যায়, অধিকাংশ ব্রিটিশ নাগরিকের ধারণা, এখন ইংল্যান্ডের পতাকা অনেক সময় অভিবাসীবিরোধী বা সংখ্যালঘুবিরোধী মনোভাব প্রকাশের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অর্ধেকেরও বেশি উত্তরদাতা মনে করেন, সেন্ট জর্জের পতাকা এখন বর্ণবিদ্বেষের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

তবে সবাই এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন। দক্ষিণ লন্ডনের কিরবি এস্টেট আবাসনের বাসিন্দা Chris Dowse বহু বছর ধরে বিশ্বকাপ ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের সময় শত শত ইংল্যান্ডের পতাকা টাঙানোর আয়োজন করেন।

তাঁর বক্তব্য, “এটা শুধু ফুটবল। আমরা শুধু খেলাটাকেই উদ্‌যাপন করি।”

২০১২ সাল থেকে তাঁদের আবাসনে এই প্রথা চলছে। প্রতিটি বড় ফুটবল প্রতিযোগিতায় গোটা এলাকা লাল-সাদা পতাকায় ঢেকে যায়। এমনকি ইংল্যান্ড দলের ফুটবলাররাও সেখানে এসেছেন।

ডাউসের কথায়, “আমাদের কাছে ফুটবল মানে বন্ধুত্ব, আনন্দ আর একসঙ্গে উৎসব পালন। এখানে কোনও রাজনীতি নেই।”