লগইনসদস্যতালেখক
হোম›মতামত›আন্দোলনে জয়, ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত
মতামত

আন্দোলনে জয়, ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত

বাংলাস্ফিয়ার: সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন যে এক সময় প্রায় উৎসবের আবহ তৈরি করেছিল, তার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। সরকার শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি মেনে নিয়েছে—ধর্মেন্দ্র প্রধান আর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী নন। কিন্তু এরপর…

আন্দোলনে জয়, ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত

বাংলাস্ফিয়ার: সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন যে এক সময় প্রায় উৎসবের আবহ তৈরি করেছিল, তার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। সরকার শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি মেনে নিয়েছে—ধর্মেন্দ্র প্রধান আর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী নন। কিন্তু এরপর কী?

এই আন্দোলন থেকে কয়েকটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা উঠে আসে।

প্রথমত, নির্বাচনে বড় জয় পেলেই যে সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ মুছে যায় না, এই আন্দোলন তা প্রমাণ করেছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আংশিক ধাক্কা খেলেও বিজেপি পরবর্তী একাধিক রাজ্যে বিপুল সাফল্য পেয়েছিল। তবু সেই সময়েই স্বাধীন ভারতের অন্যতম বৃহত্তম ছাত্র আন্দোলনের জন্ম হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, কোনও একটি ইস্যু যদি সাধারণ মানুষের মনে গভীরভাবে দাগ কাটে, তাহলে সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা ভেঙে আন্দোলন বিস্তৃত হতে পারে। শুধু সরকার নয়, বিরোধীরাও তার পরিধি আন্দাজ করতে ব্যর্থ হয়। এক অর্থে, এই আন্দোলন সংসদীয় রাজনীতির উপর অসংসদীয় গণআন্দোলনের শক্তিকেই প্রতিষ্ঠা করেছে।

তৃতীয়ত, এই আন্দোলনের পর ভারতের মূলধারার রাজনীতি আর আগের মতো থাকবে না। সরকার এখন থেকে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আরও সতর্ক থাকবে। একই সঙ্গে বিরোধী শিবিরও বিশ্বাস করতে শুরু করবে যে দলীয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ইস্যুতেও ব্যাপক সমর্থন সংগঠিত করা সম্ভব।

অবশ্য এই পর্যবেক্ষণগুলির অনেকটাই রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, নিছক তথ্য নয়। কিন্তু রাজনীতিতে অনিশ্চয়তার এই নতুন উপাদানই আগামী দিনের ঘটনাপ্রবাহকে আরও জটিল করে তুলবে।

পরিচয়ের রাজনীতির চেয়ে বড় হয়ে উঠল শ্রেণির প্রশ্ন

নরেন্দ্র মোদী সরকারের ১২ বছরের শাসনে কোনও গণআন্দোলনের চাপে সরকার নতি স্বীকার করেছে মাত্র তিনবার। প্রথমে ভূমি অধিগ্রহণ আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে, পরে কৃষি আইন প্রত্যাহারের সময় এবং সর্বশেষ শিক্ষামন্ত্রীকে সরানোর সিদ্ধান্তে।

তিনটি ক্ষেত্রেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে পরিচয়ভিত্তিক নয়, অর্থনৈতিক বা শ্রেণিভিত্তিক স্বার্থগোষ্ঠী—প্রথম দু’বার কৃষক, এবার ছাত্রসমাজ।

এ থেকেই বোঝা যায়, অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন বহু সময় ধর্ম, জাত বা বর্ণের বিভাজনকে ছাপিয়ে যেতে পারে। এমনকি বিজেপির সামাজিক সমর্থনভিত্তির মধ্যেও এই ক্ষোভের প্রভাব পড়েছে। ফলে শুধু পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি দিয়ে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে—এমন ধারণা বাস্তবের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

কৃষক আন্দোলনের শিক্ষাও একই কথা বলে

কৃষক আন্দোলনের সময় মনে করা হয়েছিল, গ্রামীণ ভারতে বিজেপি বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। বাস্তবে তা ঘটেনি।

হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশে বিজেপি ক্ষমতা ধরে রেখেছে। উত্তরপ্রদেশে আবার কৃষক আন্দোলনের অন্যতম মুখ জাঠ সমাজভিত্তিক রাষ্ট্রীয় লোকদলকেও নিজেদের জোটে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছে।

অর্থাৎ গণআন্দোলন এবং নির্বাচনী ফল সবসময় একই দিকে যায় না। ক্ষমতার ভাগাভাগি, সামাজিক সমীকরণ এবং রাজনৈতিক দরকষাকষি—এই সব মিলিয়েই ভোটের অঙ্ক তৈরি হয়। সেখানে পরিচয়ের রাজনীতি এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যুবসমাজের উদ্বেগ নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা

এই ছাত্র আন্দোলনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য অন্য জায়গায়।

এটাই প্রথম বড় আন্দোলন, যেখানে দেশের তরুণরা একটি অভিন্ন উদ্বেগকে সামনে এনেছে—ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারছে না।

শুধু মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনিয়মই এই আন্দোলনের কারণ ছিল—এমন ভাবা ভুল হবে। পুলিশের কঠোরতা আন্দোলনকে আরও তীব্র করেছে ঠিকই, কিন্তু মূল অসন্তোষ অনেক গভীরে।

বিশ্বের বৃহত্তম শিক্ষিত যুবসমাজ থাকা সত্ত্বেও ভারতের বিপুল সংখ্যক তরুণ তাদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। গত কয়েক দশকে চাকরি ও শিক্ষার প্রশ্নে বহু আন্দোলন হয়েছে, কিন্তু সেগুলি বেশিরভাগই সংরক্ষণ বা সুযোগ বণ্টনের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে।

এবারের আন্দোলনে প্রথমবার মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে শিক্ষার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা—শুধু সুযোগের বণ্টন নয়।

প্রশ্নফাঁস: এক বিকৃত শিক্ষা-বাণিজ্যের প্রতিচ্ছবি

প্রশ্নফাঁস আজ ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে কুৎসিত সংকটগুলির একটি।

শিক্ষা ও চাকরির আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে এক বিশাল বাণিজ্যিক চক্র গড়ে উঠেছে। বহু পরিবার সন্তানদের ভবিষ্যতের আশায় সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও অর্থ ব্যয় করছে। সেই সুযোগেই গড়ে উঠেছে শিক্ষা-কেন্দ্রিক এক আধা-অপরাধী শিল্পব্যবস্থা।

এই চক্র কোনও একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্র এবং শিক্ষা ব্যবসার মধ্যে দীর্ঘদিনের যোগসাজশ রয়েছে। বহু জনপ্রতিনিধিরও শিক্ষা ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক আছে।

শিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির অদক্ষতা কিংবা নিষ্ক্রিয়তাও এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির মতো প্রতিষ্ঠানও প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

সরকার বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু তদন্ত বা সুপারিশ করলেই সমস্যার সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া মানে রাজনৈতিক অর্থের একটি বড় উৎসেও আঘাত হানা।

গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক বার্তা

ধর্ম, জাতপাত বা পরিচয়ের রাজনীতি ভারতের বাস্তবতা থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে না। কিন্তু তার পাশাপাশি এমন কিছু সার্বজনীন প্রশ্নও আছে, যা সব বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে একত্রিত করতে পারে।

বিশেষ করে যখন সেই প্রশ্ন সরাসরি মানুষের ভবিষ্যৎ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়।

এই ধরনের আন্দোলন শুধুমাত্র আর্থিক দুর্দশার বিরুদ্ধে নয়; বরং উন্নত ভবিষ্যতের দাবি নিয়ে গড়ে ওঠে। ফলে শুধু সরকারি অনুদান বা ভর্তুকি দিয়ে সেই ক্ষোভ দীর্ঘদিন প্রশমিত করা কঠিন।

এই কারণেই সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন শুধু বিরোধী রাজনীতির জন্য নয়, ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষেও একটি ইতিবাচক ঘটনা। এটি দেখিয়েছে, মানুষ এখনও নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং সরকারকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করাতে সক্ষম।

এখন দেখার বিষয়, দেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলি এই বার্তাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে সংস্কারের পথে হাঁটে, নাকি নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে এই ঐতিহাসিক সুযোগও নষ্ট করে ফেলে। এখনই তার চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার সময় আসেনি।

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক