লগইনসদস্যতালেখক
হোম›মতামত›গুরুতর আহত ছাত্রকে হাতকড়া! ব্রিটিশ পুলিশের ‘অতি-সতর্কতা’ বনাম বর্ণবাদ বিতর্ক, রণক্ষেত্র সাউদাম্পটন
মতামত

গুরুতর আহত ছাত্রকে হাতকড়া! ব্রিটিশ পুলিশের ‘অতি-সতর্কতা’ বনাম বর্ণবাদ বিতর্ক, রণক্ষেত্র সাউদাম্পটন

হাইলাইটস: ১৮ বছরের ছাত্র হেনরি নোভাককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে ২৩ বছরের ব্রিটিশ নিহং শিখ বিক্রম ডিগওয়া। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ প্রথমে আহত নোভাককেই অভিযুক্ত হিসেবে ধরে হাতকড়া পরায়। পরে প্রকাশিত বডি-ক্যামেরা…

গুরুতর আহত ছাত্রকে হাতকড়া! ব্রিটিশ পুলিশের ‘অতি-সতর্কতা’ বনাম বর্ণবাদ বিতর্ক, রণক্ষেত্র সাউদাম্পটন

হাইলাইটস:

  • ১৮ বছরের ছাত্র হেনরি নোভাককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে ২৩ বছরের ব্রিটিশ নিহং শিখ বিক্রম ডিগওয়া।
  • ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ প্রথমে আহত নোভাককেই অভিযুক্ত হিসেবে ধরে হাতকড়া পরায়।
  • পরে প্রকাশিত বডি-ক্যামেরা ফুটেজে দেখা যায়, নোভাক বারবার জানান যে তিনি ছুরিকাহত হয়েছেন, কিন্তু পুলিশ তা গুরুত্ব দেয়নি।
  • ঘটনার পর ব্রিটেনে ডাইভারসিটি, ইকুইটি অ্যান্ড ইনক্লুশন (DEI) নীতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
  • মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ধনকুবের ইলন মাস্কও এই বিতর্কে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন।
  • নিহতের পরিবার রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ঘৃণার রাজনীতি থেকে দূরে থাকার আবেদন জানিয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: ১৮ বছরের ব্রিটিশ ছাত্র হেনরি নোভাকের হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এটি ব্রিটেনে পুলিশি আচরণ, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি (DEI), অভিবাসন, জাতিগত সম্পর্ক এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন রাজনৈতিক সম্পর্কের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

এই ঘটনার জেরে স্বাধীন তদারকি সংস্থা হ্যাম্পশায়ার পুলিশের কার্যকলাপ খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে ব্রিটেনের পুলিশ বাহিনীতে জাতিগত সংবেদনশীলতা ও বৈষম্যবিরোধী প্রশিক্ষণ কতটা কার্যকর, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

কী ঘটেছিল সেদিন?

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে সাউদাম্পটনের পোর্টসউড এলাকায় রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ বাড়ি ফেরার পথে হেনরি নোভাকের সঙ্গে দেখা হয় ২৩ বছরের বিক্রম ডিগওয়ার।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিগওয়ার হাতে একটি বড় ব্লেড দেখতে পেয়ে নোভাক মোবাইলে তার ভিডিও করতে শুরু করেন। তিনি ডিগওয়াকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি কি “খারাপ লোক”। এরপর ডিগওয়া নোভাকের ফোন কেড়ে নেয় এবং ২১ ইঞ্চি দীর্ঘ ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে পাঁচবার আঘাত করে।

আঘাত লাগে নোভাকের বুকে ও পায়ে।

পরে ডিগওয়াই জরুরি পরিষেবায় ফোন করে অভিযোগ করে যে নোভাক নাকি তাকে বর্ণবিদ্বেষমূলক গালি দিয়েছিলেন এবং তার পাগড়ি টেনে ধরেছিলেন। এরই মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান ডিগওয়ার পরিবারের সদস্যরাও।

পুলিশের আচরণ কেন প্রশ্নের মুখে?

সম্প্রতি প্রকাশিত পুলিশি বডি-ক্যামেরার ফুটেজ পুরো ঘটনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, গুরুতর আহত নোভাক পুলিশকে বারবার বলছেন—

“আমাকে ছুরি মারা হয়েছে… আমি শ্বাস নিতে পারছি না।”

কিন্তু এক পুলিশ কর্মকর্তা উত্তর দেন—

“না বন্ধু, আমার তা মনে হচ্ছে না।”

ডিগওয়ার অভিযোগকে সত্য ধরে নিয়ে পুলিশ প্রথমে নোভাককেই মাটিতে ফেলে হাতকড়া পরায়। প্রায় তিন মিনিট ধরে তারা বুঝতেই পারেনি যে নোভাক অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।

শুধু তখনই পরিস্থিতির গুরুত্ব তারা উপলব্ধি করে, যখন নোভাক প্রায় অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হয়।

এই ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর ব্রিটেনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

আদালত কী বলেছে?

ডিগওয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্তত ২১ বছর তাকে কারাগারে কাটাতে হবে।

বিচারক উইলিয়াম মাউসলি কেসি রায়ে স্পষ্টভাবে বলেন, ডিগওয়ার বর্ণবিদ্বেষমূলক আচরণের অভিযোগের কোনও ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও বলেন, শিখ ধর্মাবলম্বীদের কৃপাণ বহনের ধর্মীয় অধিকার থাকলেও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটি সাধারণ কৃপাণের তুলনায় অনেক বড় ছিল এবং ধর্মীয় প্রথার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই।

ডিগওয়ার মা-ও দোষী সাব্যস্ত হন, কারণ তিনি হত্যার অস্ত্রটি বাড়িতে লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিলেন।

কেন DEI বা বৈচিত্র্যনীতি নিয়ে বিতর্ক?

ঘটনার পর মূল প্রশ্ন উঠেছে—পুলিশ কি জাতিগত সংবেদনশীলতা দেখাতে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করতে ব্যর্থ হয়েছিল?

ব্রিটেনের ন্যাশনাল পুলিশ চিফস কাউন্সিল (NPCC) বর্তমানে তাদের “অ্যান্টি-রেসিজম কমিটমেন্ট” নথি পুনর্বিবেচনা করছে।

সেই নথিতে বলা হয়েছিল— “পুলিশি সেবায় সমতা আনার অর্থ সবার সাথে একইভাবে আচরণ করা নয়।”

এই ধরনের নীতির উৎস ১৯৯৯ সালের ম্যাকফারসন রিপোর্ট এবং ২০২৩ সালের কেসি রিভিউ। উভয় রিপোর্টেই লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশকে “প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্ণবাদী” বলে সমালোচনা করা হয়েছিল।

এরপর থেকেই পুলিশ বাহিনীতে বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তি এবং জাতিগত সংবেদনশীলতা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়।

২০২২ সালে চালু হয় “পুলিশ রেস অ্যাকশন প্ল্যান”। শুধু হ্যাম্পশায়ার পুলিশই প্রায় ১০ লক্ষ পাউন্ড ব্যয় করে পক্ষপাত, আগ্রাসন ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে আচরণ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণে।

সমালোচকদের মতে, নোভাকের ঘটনায় এই অতিরিক্ত সতর্কতা পুলিশকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। ডিগওয়ার বর্ণবাদ সংক্রান্ত অভিযোগের মুখে পুলিশ হয়তো এতটাই সতর্ক হয়ে পড়েছিল যে আহত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার মতো মৌলিক দায়িত্বও অবহেলিত হয়।

তবে DEI-র সমর্থকরা বলছেন, এই একক ঘটনা দিয়ে পুরো নীতিকে বাতিল করা যায় না। কারণ এখনও ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীতে জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব কম এবং বৈষম্যের অভিযোগও অব্যাহত রয়েছে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে।

৯ জুন সাউদাম্পটনে শত শত মানুষ প্রতিবাদে নামেন। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় শিখ সম্প্রদায়কে ঘিরেও ছোটখাটো উত্তেজনার খবর পাওয়া যায়।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, এটি কোনও সাম্প্রদায়িক ঘটনা নয়, বরং একটি অপরাধমূলক হত্যাকাণ্ড।

অন্যদিকে নাইজেল ফারাগে অভিযোগ করেন, এই ঘটনা ব্রিটেনে “দুই স্তরের পুলিশি ব্যবস্থা”র প্রমাণ। তিনি জনগণকে “ঠান্ডা, নির্মম ক্ষোভ” দেখানোর আহ্বান জানান।

স্টারমার তার এই বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন।

কেন জেডি ভ্যান্স ও ইলন মাস্ক জড়িয়ে পড়লেন?

ঘটনাটি দ্রুত আটলান্টিকের ওপারেও রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক মাধ্যমে ইউরোপীয় নেতৃত্বকে আক্রমণ করে বলেন, ইউরোপের শাসকগোষ্ঠী “গণ-অভিবাসন” রোধে ব্যর্থ হয়েছে।

তার দাবি, নোভাকের মৃত্যু পশ্চিমা সভ্যতার অবক্ষয়ের প্রতীক।

অন্যদিকে ইলন মাস্ক এমন একটি পোস্টের সঙ্গে একমত হন, যেখানে বলা হয়েছিল ডিগওয়ার মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। তিনি ঘটনাস্থলের পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য দেওয়ানি মামলায় আর্থিক সহায়তার কথাও বলেন।

সমালোচকদের মতে, নোভাক হত্যাকাণ্ডকে মার্কিন ডানপন্থী রাজনীতি DEI ও অভিবাসনবিরোধী বক্তব্যকে জোরদার করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

নিহতের পরিবারের অবস্থান

এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেই সবচেয়ে সংযত বক্তব্য এসেছে নোভাক পরিবারের কাছ থেকে।

হেনরির বাবা মার্ক নোভাক প্রকাশ্যে বলেছেন— “আমরা চাই না তার মৃত্যুকে আরও বিভাজন, ঘৃণা বা উত্তেজনা তৈরির জন্য ব্যবহার করা হোক।”

ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি জেডি ভ্যান্সকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন যে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গণ-অভিবাসনের কোনও সম্পর্ক নেই।

বৃহত্তর তাৎপর্য

হেনরি নোভাক হত্যাকাণ্ড ব্রিটেনের জন্য একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

একদিকে পুলিশি বর্ণবাদ রোধের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অন্যদিকে সেই প্রচেষ্টাই যদি কোনও কর্মকর্তাকে বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নে দ্বিধাগ্রস্ত করে তোলে, তাহলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে—নোভাকের মৃত্যু সেই বিতর্ককে সামনে এনেছে।

একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে, একটি স্থানীয় অপরাধ কীভাবে দ্রুত জাতীয় রাজনীতি, পরিচয়-রাজনীতি, অভিবাসন বিতর্ক এবং আন্তর্জাতিক মতাদর্শিক সংঘাতের অংশ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু নিহতের পরিবারের আহ্বান স্মরণ করিয়ে দেয়—সব রাজনৈতিক তর্কের আড়ালে একজন তরুণের করুণ মৃত্যু রয়েছে, যা কোনও মতাদর্শিক যুদ্ধের অস্ত্র হয়ে ওঠার আগেই মানবিক দৃষ্টিতে দেখা প্রয়োজন।

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক