শুভ্রাংশু মুখোপাধ্যায় | ডেটলাইন মিউনিখ

বিদেশে থাকার একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। নতুন দেশের উৎসব দেখতে দেখতে হঠাৎ কখন যে নিজের ছোটবেলায় ফিরে যাওয়া যায়, তা বোঝাই যায় না। কখনও কোনও খাবারের গন্ধে, কখনও কোনও গান শুনে, আবার কখনও রাস্তায় ভূত দেখে! হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন, ভূত দেখে।

অক্টোবরের শেষ দিকে মিউনিখে রাস্তায় বেরোলে ভূতের অভাব হয় না। অবশ্য এরা আমাদের কলকাতার পরিচিত শাঁকচুন্নি, পেত্নি কিংবা ব্রহ্মদৈত্য নয়। এরা একটু অন্যরকম। কারও মুখে রক্তের দাগ, কারও মাথায় ডাইনির টুপি, কেউ আবার আস্ত কঙ্কাল সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এদের অধিকাংশই দিব্যি হাসছে!

ভূতেদেরও এখানে সাজগোজের প্রতিযোগিতা!

৩১ অক্টোবর হ্যালোউইন। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকেই মিউনিখের দোকানগুলোয় উৎসবের প্রস্তুতি চোখে পড়ে। কোথাও কুমড়োর মুখে ভয়ংকর হাসি, কোথাও ঝুলছে মাকড়সার জাল। কোনও কোনও বাড়ির সামনে আবার এমন সব কঙ্কাল বসানো থাকে যে সন্ধ্যাবেলায় হঠাৎ চোখ পড়লে চমকে উঠতে হয়।

শুধু দোকানপাট বা বাড়িঘর নয়, শহরের গণপরিবহণেও যেন হ্যালোউইনের ছোঁয়া! মিউনিখের U-Bahn-এ ঘোষণার কণ্ঠস্বরও কখনও এমন ভূতুড়ে শোনায় যে মনে হয়, পরের স্টেশনের নাম বুঝি কোনও ভূতই জানাচ্ছে! ব্যাপারটা বেশ মজার। মনে হয়, শহরটাও যেন তার বাসিন্দাদের উৎসবের পুরো স্বাদ দিতে আয়োজনে শামিল হয়েছে।

এই সাজসজ্জা দেখলে আমার ছোটবেলার Go As You Like প্রতিযোগিতার কথা মনে পড়ে। আমাদের ওখানে কেউ ডাক্তার সাজত, কেউ পুলিশ, কেউ বা কোনও বিখ্যাত চরিত্র। আর এখানে মনে হয় প্রতিযোগিতার একটাই বিষয়, কে কত ভয়ংকর ভূত হতে পারে!

চকোলেটের বিনিময়ে ভূতেদের সঙ্গে সন্ধি

হ্যালোউইনের সবচেয়ে মজার বিষয় হল Trick or Treat। জার্মানিতে ছোটরা বলে Süßes oder Saures। অর্থাৎ মিষ্টি কিছু দাও, নইলে দুষ্টুমি করব।

সন্ধ্যা নামতেই ছোট ছোট ভূত, ডাইনি আর ভ্যাম্পায়াররা বাড়ি বাড়ি হাজির হয়। দরজা খুললেই চকোলেটের দাবি। ব্যাপারটা অনেকটা আমাদের পাড়ার চাঁদা তোলার মতো, শুধু এখানে চাঁদার রসিদ নেই, আর নগদ টাকার বদলে চকোলেটেই মিটমাট।

আমাদের ছোটবেলায় ভূতের গল্প শুনে রাতে একা বাথরুমে যেতে ভয় লাগত। আর এখানে ভূতেরা নিজেরাই দরজায় এসে দাঁড়ায়! তাও আবার হাতে চকোলেট তুলে দিলে হাসিমুখে বিদায় নেয়।

বাগুইআটির ছাদে ছয় ভাইয়ের মহাযজ্ঞ

মিউনিখের হ্যালোউইন আমাকে প্রতি বছর ফিরিয়ে নিয়ে যায় কলকাতার বাগুইআটিতে। বিশেষ করে কালীপুজোর আগের সেই দিনগুলোয়।

আমাদের কাছে ভূতচতুর্দশী মানেই ছিল পরের দিনের কালীপুজোর কাউন্টডাউন। সকাল থেকেই বাড়িতে একটা চাপা উত্তেজনা। বাজি কেনা হয়েছে, এবার সেগুলো গুছিয়ে রাখা, রোদে দেওয়া আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ, হিসাব মেলানো।

আমরা ছয় খুড়তুতো ভাই। কাজেই বুঝতেই পারছেন, বাজির হিসাব মেলানোর ব্যাপারটা মোটেই সহজ ছিল না!

কার কাছে কত তুবড়ি, কত চরকি, কত রংমশাল, কার ফুলঝুরির সংগ্রহ সবচেয়ে বড়, এসব নিয়ে চলত বিস্তর আলোচনা। একজনের কাছে কোনও বাজি একটু বেশি থাকলেই অন্যদের নতুন করে হিসাব কষতে হত।

মাঝেমধ্যে মনে হত, আমরা যেন কোনও বড় ব্যবসার হিসাবরক্ষক। পার্থক্য শুধু এটুকু, আমাদের হিসাবের খাতায় টাকার বদলে লেখা থাকত তুবড়ি, চরকি আর রংমশালের সংখ্যা!

আজ মনে হয়, পরের দিনের বাজি ফাটানোর আনন্দের চেয়েও সেই অপেক্ষা, ছয় ভাইয়ের খুনসুটি আর বাজি গোনার মধ্যেই আনন্দটা ছিল সবচেয়ে বেশি।

চোদ্দো প্রদীপ, চোদ্দো শাক আর আমাদের কালীপুজো

বাংলার ভূতচতুর্দশীর কথা উঠলে চোদ্দো প্রদীপ আর চোদ্দো শাকের প্রসঙ্গ আসবেই। লোকাচার অনুযায়ী বহু বাড়িতে চোদ্দো প্রদীপ জ্বালানো হয়, চোদ্দো রকম শাক খাওয়ার রীতিও রয়েছে।

আমার কাছে অবশ্য দিনটার মূল আকর্ষণ ছিল ভাইদের সঙ্গে বাজির হিসাব মেলানো আর পরের দিনের কালীপুজোর অপেক্ষা।

তবে এখন মিউনিখে বসে যখন হ্যালোউইনের খুদে ভূতেদের চকোলেট সংগ্রহ করতে দেখি, তখন একটা তুলনা না করে পারি না। বাংলার ভূতচতুর্দশীর ঐতিহ্যে চোদ্দো শাক, আর জার্মানির হ্যালোউইনে চকোলেট!

আমাদের ছয় ভাইয়ের হাতে যদি ছোটবেলায় এমন চকোলেট সংগ্রহের সুযোগ থাকত, তাহলে বাজির হিসাবের পাশাপাশি চকোলেটের হিসাবও যে শুরু হত, সে বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই।

মিউনিখের ছোট্ট ঘরে আমাদের কালীপুজো

তবে বিদেশে এসে কালীপুজোর আনন্দ যে একেবারে হারিয়ে গেছে, তা নয়। কলকাতার মতো এখানে বাজির দোকান থেকে ইচ্ছেমতো বাজি কেনা কিংবা পাড়ার রাস্তায় বাজি ফাটানোর সুযোগ নেই। জার্মানিতে সাধারণ আতশবাজি ব্যবহারের নিয়ম বেশ কড়া। নববর্ষের সময় ছাড়া অনুমতি ছাড়া সেসব ফাটানো যায় না।

তাই বলে কি কালীপুজো হবে না?

আমাদের মিউনিখের ছোট্ট ঘরটাকেই আমরা সাজিয়ে তুলি। রঙিন বাল্ব আর LED আলোয় ঘরটা ঝলমল করে ওঠে। কলকাতার মতো বিশাল আলোকসজ্জা নেই, পাড়ায় পাড়ায় বাজির শব্দও নেই। তবু ওইটুকু আলোতেই যেন উৎসবটা নিজের হয়ে ওঠে।

আর একটা ছোট্ট ব্যবস্থা থাকে। আগের নববর্ষের সময়কার কিছু তারাবাতি যত্ন করে রেখে দিই কালীপুজোর জন্য। নিয়ম মেনে সেই তারাবাতির আলোয় একটু হলেও ছোটবেলার আনন্দটা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করি।

কলকাতায় একসময় তুবড়ি আর রংমশালের হিসাব মেলাতাম, আর মিউনিখে এখন কয়েকটা তারাবাতিই আমাদের উৎসবের আনন্দ বাড়িয়ে দেয়। আসলে কালীপুজোর আনন্দটা শুধু বাজির শব্দে নয়, আলো জ্বালানোর ইচ্ছেটার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।

একই অন্ধকার, আলাদা গল্প

হ্যালোউইনের শিকড় খুঁজলে পৌঁছে যেতে হয় প্রাচীন কেল্টিক জনগোষ্ঠীর Samhain উৎসবে। বছরের এই সময়ে জীবিত ও মৃতের জগতের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়, এমন একটি লোকবিশ্বাস প্রচলিত ছিল। পরে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথার প্রভাবে আজকের হ্যালোউইন গড়ে উঠেছে।

অন্যদিকে বাংলার ভূতচতুর্দশীর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পূর্বপুরুষদের স্মরণ, প্রদীপ জ্বালানো এবং অশুভ শক্তি দূরে রাখার লোকবিশ্বাস।

দুই উৎসবের জন্ম আলাদা সংস্কৃতিতে। তবু ভূত, অন্ধকার আর অজানা জগতের প্রতি মানুষের কৌতূহল যে দেশকাল মানে না, তা বেশ বোঝা যায়।

হ্যালোউইনের পরদিন, ১ নভেম্বর, বাভারিয়ায় Allerheiligen বা অল সেন্টস ডে উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকে। এই সময় অনেক পরিবার প্রয়াত স্বজনদের কবরেও যান। উৎসবের পাশাপাশি স্মরণের একটি দিকও রয়েছে এখানে।

বাগুইআটি আজও সঙ্গে আছে

২০১৫ সালে মিউনিখে আসার পর থেকে এখানকার অনেক উৎসব কাছ থেকে দেখেছি। অক্টোবরফেস্টের ভিড়, বড়দিনের আলোকসজ্জা কিংবা হ্যালোউইনের বিচিত্র সব পোশাক, প্রত্যেকটিরই নিজস্ব আনন্দ রয়েছে।

কিন্তু উৎসবের মাঝখানে কখনও কখনও মনটা ফিরে যায় বাগুইআটির সেই ছাদে। মনে পড়ে ছয় ভাইয়ের হাসাহাসি, বাজির বাক্স খুলে বারবার গোনা আর পরের দিনের অপেক্ষা।

আজ সেই ছয় ভাই আর ছোট নেই। সবাই নিজের নিজের জীবনে ব্যস্ত। কিন্তু কালীপুজোর কথা উঠলে এখনও মনে হয়, ছাদে বসে কেউ একজন বুঝি বলে উঠবে, তোর কাছে তুবড়ি কটা রে?

মিউনিখের ছোট্ট ঘরে যখন LED আলোগুলো জ্বলে ওঠে, তখন মনে হয় কলকাতা খুব একটা দূরে নেই। উৎসবের চেহারা বদলেছে ঠিকই, কিন্তু আনন্দটা এখনও সেই চেনা।

হ্যালোউইনের রাতে কোনও ছোট্ট ভূত দরজায় এসে Süßes oder Saures বললে তাই হাসি পায়। হাতে চকোলেট তুলে দিতে দিতে মনে মনে ভাবি, বাগুইআটির সেই ছয় ভাই যদি আজ এখানে একসঙ্গে থাকত, তাহলে কে কত চকোলেট সংগ্রহ করল, তার হিসাব মেলানো শুরু হয়ে যেত নির্ঘাত!

তবে একটা প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে। আমাদের কলকাতার শাঁকচুন্নি কিংবা ব্রহ্মদৈত্যকে চকোলেট দিয়ে সন্তুষ্ট করা সম্ভব কি না, তা জানি না।

কোনওদিন যদি সত্যিই তাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, একটা বড় চকোলেটের প্যাকেট সঙ্গে রাখব। বলা তো যায় না, বিদেশি ভূতেদের দেখে আমাদের দেশি ভূতেরাও হয়তো এখন চকোলেট খেতে শিখেছে!