লগইনসদস্যতালেখক
হোম›সর্বশেষ›সুমিত সরকার (১৯৩৯–২০২৬): ইতিহাসের শ্রেণিকক্ষে যাঁর বক্তৃতা হয়ে উঠত রাগের আলাপ
সর্বশেষ

সুমিত সরকার (১৯৩৯–২০২৬): ইতিহাসের শ্রেণিকক্ষে যাঁর বক্তৃতা হয়ে উঠত রাগের আলাপ

বাংলাস্ফিয়ার: আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব সুমিত সরকার বৃহস্পতিবার প্রয়াত হয়েছেন। বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি অসুস্থ ছিলেন। ১৯৭৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন তিনি।…

সুমিত সরকার (১৯৩৯–২০২৬): ইতিহাসের শ্রেণিকক্ষে যাঁর বক্তৃতা হয়ে উঠত রাগের আলাপ

বাংলাস্ফিয়ার: আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব সুমিত সরকার বৃহস্পতিবার প্রয়াত হয়েছেন। বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি অসুস্থ ছিলেন। ১৯৭৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন তিনি। তাঁর গবেষণাগ্রন্থ যেমন ভারতীয় ইতিহাসচর্চাকে নতুন পথ দেখিয়েছে, তেমনই তাঁর অসামান্য বক্তৃতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছাত্রছাত্রীর ইতিহাসবোধ তৈরি করেছে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুমিত সরকারের বক্তৃতা থাকলে শ্রেণিকক্ষ ভরে যেত। এক প্রাক্তন ছাত্রের স্মৃতিতে, তিনি কথা বলা শুরু করলেই নেমে আসত পিনপতন নীরবতা। সুমিতবাবু কথা বলতেন নিচু স্বরে, ধীর ও শান্ত ভঙ্গিতে। বক্তৃতায় কোনও নাটকীয়তা বা চমক সৃষ্টি করার চেষ্টা থাকত না। কিন্তু তাঁর ব্যাখ্যার গভীরতা এবং চিন্তার প্রবাহে ছাত্রছাত্রীরা এতটাই মগ্ন হয়ে পড়তেন যে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলতেন।

১৯৩৯ সালে জন্ম সুমিত সরকারের। ইতিহাসচর্চার পরিবেশেই তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর বাবা সুশোভনচন্দ্র সরকার ছিলেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তনী সুমিত সরকার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করেন। পরে সেখানেই শিক্ষকতা করেন। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়িয়েছেন তিনি।

বাংলার স্বদেশি আন্দোলনের ইতিহাসচর্চার সঙ্গে সুমিত সরকারের নাম অবিচ্ছেদ্য। তাঁর ‘দ্য স্বদেশি মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল’ আধুনিক ভারতীয় ইতিহাসের একটি ভিত্তিমূলক গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। ‘মডার্ন ইন্ডিয়া’ দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসের ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ পাঠকের কাছে আধুনিক ভারতকে বোঝার অন্যতম প্রধান বই। ‘রাইটিং সোশ্যাল হিস্ট্রি’-তে ইতিহাস রচনার পদ্ধতি, সমাজ এবং রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে তাঁর গভীর অনুসন্ধানের পরিচয় পাওয়া যায়।

তাঁকে সাধারণত মার্কসবাদী ইতিহাসবিদ বলা হলেও, প্রাক্তন ছাত্র এবং সহকর্মীদের মতে, সেই একটি পরিচয়ের মধ্যে তাঁকে আবদ্ধ করা যায় না। মার্কসবাদের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল, কিন্তু কোনও তত্ত্বকে তিনি অনড় কাঠামো হিসেবে গ্রহণ করেননি। নিজের প্রশ্ন, সংশয় এবং অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে তিনি সেই কাঠামোকে ক্রমাগত বদলে নিয়েছেন।

সুমিত সরকারের ইতিহাসচর্চার সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত ‘নীচ থেকে চাপ’ বা ‘প্রেশার ফ্রম বিলো’ ধারণাটি। জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসকে শুধু নেতা, দল ও প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি সাধারণ মানুষের ভূমিকার দিকে দৃষ্টি ফেরান। নারী, আদিবাসী, দলিত, শ্রমিক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব দাবি, উদ্যোগ ও প্রতিরোধ কীভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামকে প্রভাবিত করেছিল, তাঁর লেখায় তা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রাক্তন ছাত্র নরেশ কুমারের কথায়, সুমিত সরকার ছিলেন পণ্ডিত ও শিক্ষকের এক বিরল সমন্বয়। তাঁর বক্তৃতার সময় তিনি একটি শব্দও লিখতেন না। কারণ সেই বক্তৃতা ছিল যেন রাগের আলাপ—ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করত, শ্রোতাকে আবিষ্ট করত এবং ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলত। তাঁর প্রয়াণে ভারত শুধু এক বিশিষ্ট ইতিহাসবিদকে নয়, এক অতুলনীয় শিক্ষককেও হারাল।

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক