সরকারি দফতরের দায়িত্ব, কবিতা লেখা, প্রবন্ধ রচনা—এই পরিচিত জীবনের বাইরে ষাট বছর বয়সে হঠাৎই ক্যামেরার সামনে। পঞ্জাব সরকারের ভাষা দফতরের অধিকর্তা এবং বিশিষ্ট পঞ্জাবি কবি যশবন্ত সিং জাফরের জীবনে এমনই এক অপ্রত্যাশিত মোড় এনে দিয়েছে গুরবিন্দর সিং পরিচালিত ‘রেহমত’। আর প্রথম ছবিতেই বাজিমাত—সুইৎজ়ারল্যান্ডের মর্যাদাপূর্ণ লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবে হয়েছে ছবিটির বিশ্বপ্রথম প্রদর্শন।

জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালক গুরবিন্দরের এই পঞ্জাবি ছবি ৭৯তম লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নিয়েছিল। স্বর্ণচিতাবাঘ পুরস্কারের দৌড়ে থাকা একমাত্র ভারতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ছিল ‘রেহমত’। ছবির অন্যতম আকর্ষণ বর্ষীয়ান অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ। তাঁরও এটি প্রথম পঞ্জাবি ছবি। সঙ্গে রয়েছেন সুবিন্দর ভিকি, মিতা বশিষ্ঠ, নবজ্যোত রণধাওয়া, দিয়া কম্বোজ এবং যশবন্ত সিং জাফর।

অভিনয়টা এল হঠাৎই

যশবন্তের অভিনয়ে আসার গল্পটাও ছবির মতোই খানিকটা অপ্রত্যাশিত। পরিচালক গুরবিন্দর তাঁকে আগে থেকেই চিনতেন কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে। ছবির একটি চরিত্রের জন্য তাঁর প্রয়োজন ছিল এমন একটি মুখ, যিনি অভিনয়ের জগতের নিয়মিত মানুষ নন, কিন্তু পঞ্জাবের মাটি, ভাষা ও সমাজকে গভীর ভাবে চেনেন।

সেই ভাবনা থেকেই যশবন্তের কাছে প্রস্তাব যায়। প্রথমে স্বাভাবিক ভাবেই কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন তিনি। অভিনয় তো তাঁর পেশা নয়! শেষ পর্যন্ত অবশ্য রাজি হন। তাঁর স্বাভাবিক উপস্থিতি, কথাবলার ধরন এবং পঞ্জাবের সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই চরিত্রটিকে পর্দায় আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

ইতিহাসের ক্ষত, মানুষের মমতা

প্রখ্যাত পঞ্জাবি লেখিকা অজিত কৌরের একাধিক ছোটগল্প অবলম্বনে তৈরি ‘রেহমত’। তিনটি পরস্পর-সংযুক্ত গল্পের মধ্যে দিয়ে দেশভাগ, আশির দশকের পঞ্জাবের সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, প্রবাস, হারিয়ে যাওয়া স্বজন এবং স্মৃতির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতকে তুলে ধরেছেন গুরবিন্দর।

তবে ‘রেহমত’ শুধুই হিংসা ও ইতিহাসের ছবি নয়। বিভেদের মধ্যেও মানুষের প্রতি মানুষের মমতা, বিপন্নকে আশ্রয় দেওয়ার সংস্কৃতি এবং অপরিচিতকেও আপন করে নেওয়ার পঞ্জাবি ঐতিহ্য ছবিটির কেন্দ্রে। ‘রেহমত’ শব্দটির অর্থও তো অনুগ্রহ, দয়া বা করুণা।

নাসিরুদ্দিনের চরিত্রে ফিরতি যাত্রা

ছবিতে নাসিরুদ্দিন শাহ অভিনয় করেছেন রশিদের চরিত্রে। দেশভাগের পর পঞ্জাব ছেড়ে যাওয়া এক মুসলিম পরিবারের উত্তরসূরি তিনি। মারণরোগে আক্রান্ত রশিদ ম্যানচেস্টার থেকে ফিরে আসেন পূর্বপুরুষের ভিটের খোঁজে। সেই প্রত্যাবর্তনের পথেই তাঁর ব্যক্তিগত গল্প জড়িয়ে যায় জঙ্গি আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক পরিবারের জীবনের সঙ্গে।

রশিদের নিজের হারানোর গল্প ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে বৃহত্তর পঞ্জাবের ইতিহাসের দরজা খোলার চাবি। ব্যক্তিগত স্মৃতি, বিচ্ছেদ ও শিকড়ের টান মিলেমিশে যায় এক অস্থির সময়ের সামাজিক ক্ষতের সঙ্গে।

বিশ্বমঞ্চে আবার পঞ্জাব

‘অন্ধে ঘোড়ে দা দান’ এবং ‘চৌথি কূট’-এর মতো আন্তর্জাতিক ভাবে প্রশংসিত ছবির পরিচালক গুরবিন্দর সিং ফের পঞ্জাবের মাটি, মানুষ ও ইতিহাসকে নিয়ে হাজির হয়েছেন বিশ্বমঞ্চে। আর তাঁর হাত ধরেই যশবন্ত সিং জাফরের অভিনয়জীবনের প্রথম অধ্যায় শুরু হল এমন এক মঞ্চে, যেখানে পৌঁছনোই বহু অভিনেতার স্বপ্ন।

ষাট বছর বয়সে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যশবন্ত যেন মনে করিয়ে দিলেন—জীবনের গল্পে নতুন অধ্যায় শুরু করার কোনও নির্দিষ্ট বয়স হয় না।