শ্রুতি মজুমদার
ঐতিহ্য বদলায়। তার সঙ্গে বদলায় ‘ঐতিহ্যবাহী’ পোশাকের সংজ্ঞা, পরিবারের ধারণা, এমনকি উৎসব পালনের ধরনও। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারাটাই বোধ হয় সময়ের দাবি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সকলের নজর কেড়ে নিল অন্য এক ধরনের সংক্ষিপ্ততা—রাখি উৎসব উপলক্ষে অভিনেত্রী কৃতি শ্যাননের পরনে থাকা ছোট ব্লাউজ।
কৃতির সম্পূর্ণ সাদা পোশাকটি কেমন ছিল, একটু দেখে নেওয়া যাক। কারুকাজ করা ছোট, হাতকাটা ব্লাউজ, তার উপর আলগা আবরণ এবং পা পর্যন্ত লম্বা, ঘেরওয়ালা ঘাগরা। কোনও পোশাকবিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞাসা করলে হয়তো বলতেন, উৎসবের জন্য বেশ মানানসই সাজ—উচ্ছলতা ও শালীনতার সুন্দর ভারসাম্য।
সমাজমাধ্যমের রায় অবশ্য অন্য। সেই রায়ে যোগ দিয়েছিলেন অন্তত এক জন মহিলা সাংসদও। তাঁর প্রশ্ন, “বিকিনি বা অন্তর্বাস পরে ভাইকে রাখি বাঁধতে যাবেন কেন?”
তার পর আপত্তির মাত্রা বাড়তে থাকে। রায় দেওয়া হয়, এই পোশাক ‘ভারতীয় সংস্কৃতি’র অঙ্গ নয়।
অথচ আমাদের অনেকের কাছেই দৃশ্যটি মোটেই অপরিচিত নয়। বিয়েবাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সামনে, ভাইদের উপস্থিতিতেও, মহিলাদের এমন পোশাক পরতে দেখেছি আমরা। নিজের বৃহত্তর পরিবারের নানা বিয়ের কথা মনে পড়ছিল। এক আত্মীয়ার পিঠখোলা ব্লাউজ, এক বোনের সরু ফিতের এবং পেটখোলা লেহঙ্গা-চোলি—এসবই তো দেখেছি।
খুব বেশি দিন আগের কথাও নয়, নিজের ভাইয়ের বিয়েতে আমিও অনেকটা পিঠখোলা ব্লাউজ পরেছিলাম। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেই ছবি প্রকাশ করে লিখেছিলাম, “সাজে একটু দুষ্টুমি, সঙ্গে পিঠের বাড়তি মেদও।”
এর মধ্যে অশালীনতা কোথায়?
হয়তো এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের কাছে নিরাপদ বোধ করার অনুভূতিটা। যেখানে ভাইয়েরাও আছেন, অথচ পোশাক দেখে কেউ বিচার করবেন—এমন আশঙ্কা নেই। সেই পোশাকগুলি কাউকে উত্তেজিত করতে বা অনভিপ্রেত নজর টানতে পরা হয়নি। পরেছিলাম, কারণ আমাদের মনে হয়েছিল, তাতে আমাদের সুন্দর দেখাচ্ছে।
এই বিতর্ক তাই বিজ্ঞাপনে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের চেয়ে পোশাক নিয়ে আপত্তি তোলা মানুষগুলির মানসিকতাই বেশি প্রকাশ করে। কোনও কিছু যদি সত্যিই ‘ইচ্ছাকৃত ভাবে অস্বস্তিকর’ হয়ে থাকে, তা হলে সেটি সম্ভবত পোশাক নয়, এই প্রতিক্রিয়াটিই।
পোষ্যটিও ‘সংস্কৃতিবিরোধী’!
বিজ্ঞাপনটি নিয়ে আপত্তি অবশ্য শুধু মুখ্য অভিনেত্রীর পোশাকে আটকে থাকেনি। একটি পোষ্যকে ঐতিহ্যবাহী উৎসবের কেন্দ্রে রাখাতেও কারও কারও আপত্তি হয়েছে। যুক্তি, সেটিও নাকি আমাদের ‘সংস্কৃতি’র বিরোধী।
সংস্কৃতি নিয়ে এত কথা বলা হয়, কিন্তু যাঁরা বলেন, তাঁরা কি সত্যিই জানেন, কী নিয়ে কথা বলছেন?
ভারতীয় পুরাণ, মহাকাব্য ও লোককথায় চারপেয়ে প্রাণী এবং পাখির উপস্থিতি অজস্র। দেবতা ও মানুষের জীবনে তারা কখনও সঙ্গী, কখনও বাহন, কখনও সহায়ক, আবার কখনও আত্মত্যাগের প্রতীক। তাহলে একটি পোষ্যকে উৎসবের ছবিতে দেখালেই সংস্কৃতি বিপন্ন হয়ে যায় কী করে?
কৃতির গলার কাট বনাম ‘সংস্কৃতি’
কটাক্ষের মুখেও নিজের পোশাকের পক্ষে অটল থেকেছেন কৃতি। তাঁর কথায়, “সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থাকে নারীর হৃদয়ে, তাঁর পোশাকের গলার কাটে নয়।”
কথাটা হয়তো বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা উচিত ছিল।
সংশ্লিষ্ট সংস্থাটি অবশ্য সেই সাহস দেখাতে পারেনি। পরের দিনই বিজ্ঞাপনটির প্রচার বন্ধ করে দেয় তারা। এর মধ্যে একমাত্র সান্ত্বনা এই হতে পারে—বিতর্কের জেরে মানুষ যদি সংস্থাটির পণ্য দেখতে গিয়ে কিছু কিনে থাকেন, তা হলে অন্তত ব্যবসায় কিছুটা লাভ হয়েছে!
এ বার, বিজ্ঞাপনটি ‘আপত্তিকর’ বলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে যখন, আশা করা যায় আমরা মহিলাদের পোশাকের গলার কাটের বাইরেও তাকাব।
কারণ ঐতিহ্য কোনও জাদুঘরে রাখা স্থির বস্তু নয়। সময়ের সঙ্গে তার চেহারা বদলায়। বদলায় ‘ঐতিহ্যবাহী’ পোশাকের সংজ্ঞা, বদলায় পরিবারের ধারণা, বদলায় উৎসবের উদ্যাপনও।
আমাদেরও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে এগোনোই ভাল। আর সংস্কৃতি রক্ষার নামে যদি কিছু বাঁচাতেই হয়, তা হলে নারীর পোশাকের মাপজোক নয়—তাঁর নিজের মতো করে বাঁচার অধিকারটুকুই আগে বাঁচানো যাক।