লগইনসদস্যতালেখক
হোম›সর্বশেষ›আতঙ্ক নয় শুধু, ভিড় যখন তরল: পদপিষ্ট হওয়ার নেপথ্যে পদার্থবিদ্যা ও মনস্তত্ত্ব
সর্বশেষ

আতঙ্ক নয় শুধু, ভিড় যখন তরল: পদপিষ্ট হওয়ার নেপথ্যে পদার্থবিদ্যা ও মনস্তত্ত্ব

বিহারের লখিসরাই জেলার অশোকধামের ইন্দ্রমণেশ্বর মন্দিরে সোমবারের দুর্ঘটনায় অন্তত সাত জনের মৃত্যু এবং বহু মানুষের আহত হওয়ার ঘটনাটি আবারও একটি পুরনো প্রশ্ন সামনে এনেছে—ভিড় হঠাৎ কী ভাবে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়?…

আতঙ্ক নয় শুধু, ভিড় যখন তরল: পদপিষ্ট হওয়ার নেপথ্যে পদার্থবিদ্যা ও মনস্তত্ত্ব

বিহারের লখিসরাই জেলার অশোকধামের ইন্দ্রমণেশ্বর মন্দিরে সোমবারের দুর্ঘটনায় অন্তত সাত জনের মৃত্যু এবং বহু মানুষের আহত হওয়ার ঘটনাটি আবারও একটি পুরনো প্রশ্ন সামনে এনেছে—ভিড় হঠাৎ কী ভাবে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়? প্রতিটি ঘটনার তাৎক্ষণিক কারণ আলাদা হতে পারে। কোথাও গুজব, কোথাও ব্যারিকেড ভেঙে যাওয়া, কোথাও সরু প্রবেশপথ, আবার কোথাও নির্দিষ্ট সময়ে দর্শন বা পুণ্যস্নানের তাগিদ। কিন্তু তার পরের ঘটনাক্রম প্রায় একই—এক জনের ভারসাম্য হারানো, কয়েক জনের পড়ে যাওয়া, পিছন থেকে অব্যাহত চাপ এবং মুহূর্তে মানুষের স্তূপ তৈরি হওয়া।

প্রচলিত ভাষায় একে ‘পদপিষ্ট’ বা ‘স্ট্যাম্পিড’ বলা হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ উন্মত্ত হয়ে দৌড়তে গিয়ে অন্যকে ইচ্ছাকৃত ভাবে মাড়িয়ে দেয় না। বরং অতি ঘন ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তির নিজের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাই হারিয়ে যায়। তাই গবেষকেরা এখন ‘ক্রাউড ক্রাশ’ বা ভিড়ের চাপে পিষ্ট হওয়ার কথাই বেশি বলেন।

ভিড়ের এই আচরণ বোঝার জন্য পদার্থবিদ্যা, পুরকৌশল, পরিবহণ পরিকল্পনা, গণিত এবং মনস্তত্ত্বকে একসঙ্গে কাজে লাগানো হয়। ঘনবদ্ধ ভিড়কে অনেক সময় তরলের সঙ্গে তুলনা করেন গবেষকেরা। তরলের মধ্যে অণুগুলি যেমন পরস্পরের উপর বল প্রয়োগ করে, তেমনই ঠাসাঠাসি ভিড়ে এক জনের শরীরের চাপ অন্য জনের শরীরে সঞ্চারিত হয়। কোনও ব্যক্তি হয়তো নিজে কাউকে ঠেলছেন না, অথচ বহু মানুষের সম্মিলিত চাপ তাঁর শরীরের মধ্য দিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ইটিএইচ জুরিখের গণনামূলক সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং জনসমাগমের গতিবিদ্যার বিশেষজ্ঞ ডার্ক হেলবিং এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে ‘কৃষ্ণগহ্বর প্রভাব’-এর কথা বলেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অত্যন্ত ঘন ভিড়ে নানা দিক থেকে আসা চাপ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অনিশ্চিত ‘বলশৃঙ্খল’ তৈরি করে। চাপ একটি সীমা অতিক্রম করলে কেউ ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান। তাঁর পড়ে যাওয়ায় ভিড়ের মধ্যে একটি ফাঁক সৃষ্টি হয়। আশপাশের মানুষ তখনও পিছন থেকে ধাক্কা খাচ্ছেন, কিন্তু সামনে আর সমান প্রতিরোধ নেই। ফলে তাঁরাও সেই ফাঁকের মধ্যে পড়তে থাকেন।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তৈরি হয় মানুষের স্তূপ। নীচে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উপর কয়েকটি দেহের সম্মিলিত ওজন এসে পড়ে। তখন প্রধান বিপদ শুধু পায়ের আঘাত নয়; বুক প্রসারিত করতে না পারায় শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সংকোচনজনিত শ্বাসরোধ। উদ্ধার দেরিতে হলে বাইরে থেকে গুরুতর ক্ষত দেখা না গেলেও মৃত্যু ঘটতে পারে। হেলবিংয়ের মতে, ২০২৪ সালের হাথরসের বিপর্যয়েও এমন প্রক্রিয়া কাজ করেছিল।

ভিড়ের ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে বিপদ সরল অনুপাতে বাড়ে না; একটি নির্দিষ্ট সীমার পরে তা দ্রুত বহুগুণ হয়ে ওঠে। প্রতি বর্গমিটারে দুই থেকে তিন জন থাকলে সাধারণত মানুষ নিজের পথ বেছে নিতে পারেন। চার-পাঁচ জন হলে চলাচলের স্বাধীনতা কমে যায়। ছয়-সাত জনে পৌঁছলে শরীর প্রায় পরস্পরের সঙ্গে আটকে যায়; তখন ব্যক্তির ইচ্ছার বদলে সম্মিলিত চাপই তাঁকে চালিত করে। সরু পথ, বাঁক, বন্ধ দরজা, দুর্বল ব্যারিকেড অথবা প্রবেশ ও প্রস্থানের বিপরীতমুখী স্রোত পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে।

এখানেই মনস্তত্ত্বের ভূমিকা। দীর্ঘ অপেক্ষা, নির্দিষ্ট শুভক্ষণ হারানোর ভয়, দর্শন না-পাওয়ার আশঙ্কা, অস্পষ্ট ঘোষণা কিংবা হঠাৎ ছড়ানো গুজব মানুষের মধ্যে অধৈর্য ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সামনের লোকেরা কেন থেমেছেন, পিছনের মানুষ তা দেখতে পান না। তাঁরা এগোনোর চেষ্টা করেন। আবার কোনও অংশে মানুষ দ্রুত চলতে শুরু করলে অন্যদের মনে হয়, বিপদ ঘটেছে অথবা সুযোগ শেষ হয়ে যাচ্ছে। সেই ধারণাই চাপকে তরঙ্গের মতো ভিড়ের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে।

তবে বিপর্যয়ের দায় কেবল জনতার ‘আতঙ্ক’ বা ‘বিশৃঙ্খল আচরণ’-এর উপর চাপালে আসল ব্যর্থতা আড়াল হয়। নিরাপদ জনসমাবেশের দায়িত্ব আয়োজক ও প্রশাসনের। কত মানুষ আসতে পারেন, কোন পথে ঢুকবেন ও বেরোবেন, কোথায় ভিড় জমতে পারে, কত দ্রুত প্রবাহ কমানো দরকার—সবই আগে থেকে হিসাব করা সম্ভব।

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের অধ্যাপক আশিস বর্মার নেতৃত্বে ২০১৬ সালের উজ্জয়িনী কুম্ভমেলার ভিড় নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন অংশে মানুষের গতি ও ঘনত্বের তারতম্য থেকেই বিপজ্জনক বাধা তৈরি হয়েছিল। পাশ থেকে অনুমতি ছাড়া মিছিলে ঢোকার চেষ্টা এবং হাত ধরাধরি করে দল বেঁধে ভিড় ভেদ করার প্রবণতাও ভারসাম্য নষ্ট করেছিল। গবেষকেরা শক্ত ব্যারিকেড, প্রবেশের হার নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ঘনত্ব সীমিত রাখার সুপারিশ করেন।

২০০৬ সালের হজে ৩৬২ জনের মৃত্যুর পরে হেলবিংয়ের পরামর্শে মিনায় পথ ও আচারস্থলের নকশা বদলানো হয়, অতিরিক্ত প্রবেশপথ তৈরি হয় এবং তীর্থযাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক সময়সূচি চালু করা হয়। ভিডিয়ো বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল, স্বাভাবিক প্রবাহ প্রথমে ‘চলা-থামা’ তরঙ্গে এবং পরে অনিয়ন্ত্রিত অস্থিরতায় পরিণত হয়েছিল।

অশোকধামের মতো দুর্ঘটনা তাই আকস্মিক হলেও পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত নয়। নজরদারি ক্যামেরায় ঘনত্ব মাপা, ধাপে ধাপে প্রবেশের অনুমতি, পৃথক প্রবেশ ও প্রস্থানপথ, প্রশিক্ষিত কর্মী, স্পষ্ট ঘোষণা এবং জরুরি বহির্গমনপথ থাকলে বিপদের পূর্বলক্ষণ শনাক্ত করা যায়। বিজ্ঞান বলছে, জনসমাগমে মৃত্যু অনিবার্য নিয়তি নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা পরিকল্পনা, পরিকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতায় ঘটে যাওয়া প্রতিরোধযোগ্য বিপর্যয়।

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক