লগইনসদস্যতালেখক
হোম›সর্বশেষ›চার বছরের বিরতির পর কৈলাসযাত্রা: ২০২৬ সালে লম্বা লাইন
সর্বশেষ

চার বছরের বিরতির পর কৈলাসযাত্রা: ২০২৬ সালে লম্বা লাইন

করোনা অতিমারি ও গলওয়ান সংঘর্ষের জেরে বন্ধ হয়ে যাওয়া কৈলাস মানস সরোবর যাত্রা ফের শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালে। এ বছর তাতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। বিদেশ মন্ত্রক কৈলাসযাত্রার…

চার বছরের বিরতির পর কৈলাসযাত্রা: ২০২৬ সালে লম্বা লাইন

করোনা অতিমারি ও গলওয়ান সংঘর্ষের জেরে বন্ধ হয়ে যাওয়া কৈলাস মানস সরোবর যাত্রা ফের শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালে। এ বছর তাতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে।

বিদেশ মন্ত্রক কৈলাসযাত্রার সরকারি কোটা ৭৫০ থেকে বাড়িয়ে ১,০০০ করেছে। তবে নেপালের রাসুয়াগঢ়ি ও হিলসার মতো সীমান্তপথ দিয়ে যাত্রী নিয়ে যাওয়া বেসরকারি ভ্রমণ সংস্থাগুলির কাছে ২০২৬ সালে বুকিং অনেকটাই বেড়েছে। এ বছর বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে কত জন ভারতীয় কৈলাসযাত্রায় নাম লিখিয়েছেন, তার সঠিক সরকারি হিসাব এখনও সংকলিত হয়নি। তবে নেপালের বিভিন্ন পথ দিয়ে ভারতীয় পাসপোর্টধারীদের যাত্রার জন্য চলতি মরসুমে সর্বোচ্চ ২৪ হাজার জনের কোটা ঘোষণা করেছিল চিন। ২০২৫ সালে এই কোটা ছিল ২০ হাজার।

কাঠমান্ডুর একটি বড় ভ্রমণ সংস্থা ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে জানিয়েছে, নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজে বেরোনো বিপুল সংখ্যক ভারতীয় পর্যটক তাদের মাধ্যমে কৈলাসযাত্রায় নাম লিখিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয় পাসপোর্টধারীর সংখ্যাই এক হাজারের বেশি। বছরের শুরু থেকেই যাত্রা সম্পর্কে খোঁজখবর আসছিল।

সংস্থার এক কর্তা বলেন, ‘‘মূল্যবৃদ্ধি এবং আনুষঙ্গিক পরিষেবার মাশুল বেড়ে যাওয়ায় খরচ বাড়লেও, এ বছর এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বুকিং হয়েছে।’’ তাঁর বক্তব্য, যাত্রীদের মধ্যে শুধু পুণ্যার্থীরাই নন, নতুন অভিজ্ঞতার সন্ধানে যাওয়া বহু তরুণ-তরুণীও রয়েছেন।

জুনে যাত্রা শুরু হওয়ার পরেই খবর আসে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাওয়া বেশ কয়েক জন ভারতীয় তিব্বতে ঢোকার আগে নেপালে আটকে পড়েছেন। ২৭ জুন বিদেশ মন্ত্রক একটি পরামর্শবার্তা জারি করে ভারতীয় নাগরিকদের জানায়, প্রয়োজনীয় সমস্ত অনুমতিপত্র হাতে না পাওয়া পর্যন্ত যেন তাঁরা যাত্রা শুরু না করেন।

মন্ত্রক জানিয়েছিল, ‘‘বেসরকারি সংস্থার আয়োজিত কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় গিয়ে চিনে প্রবেশের প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র ও ভিসা না থাকায় নেপালে আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকদের কাছ থেকে সাহায্যের একাধিক আবেদন এসেছে।’’

সরকারি ব্যবস্থায় কত জন যান

২০২০ সালে যাত্রা বন্ধ হওয়ার আগে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সাধারণত বছরে ৮০০ থেকে ১,০০০ পুণ্যার্থী অংশ নিতেন। ২০২৫ সালে ঘোষিত যাত্রীসংখ্যা ছিল ৭৫০। তাঁদের মধ্যে পাঁচটি দলে ২৫০ জনের লিপুলেখ দিয়ে এবং দশটি দলে ৫০০ জনের নাথু লা দিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি কৈলাসযাত্রা আয়োজন ও যাতায়াতের দিক থেকেও বিশ্বের অন্যতম জটিল তীর্থযাত্রা। কৈলাস চিনের তিব্বত স্বশাসিত অঞ্চলে অবস্থিত। ফলে এই যাত্রার জন্য নয়াদিল্লি ও বেজিংয়ের মধ্যে ব্যাপক কূটনৈতিক সমন্বয় প্রয়োজন। অত্যধিক উচ্চতা ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে দরকার নিখুঁত পরিকল্পনা এবং কঠোর স্বাস্থ্যপরীক্ষাও।

প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য পথে পুণ্যার্থীদের কয়েক দিন থেমে থাকতে হওয়া এখানে ব্যতিক্রম নয়, প্রায় নিয়মিত ঘটনা। তবে এমন মাত্রার বিপর্যয় আগে ঘটেনি। ২০২৬ সালের আগে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রার সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে ভয়াবহ নথিভুক্ত বিপর্যয় ছিল ১৯৯৮ সালে উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড় জেলার মালপায় ধস। তাতে ২২০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। মৃতদের মধ্যে ছিলেন কৈলাসের পথে যাওয়া ৬০ জন পুণ্যার্থী।

উচ্চতা ও দুর্গম পথের পরীক্ষা

কৈলাস পর্বতের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬,৬৩৮ মিটার। কাছেই মানস সরোবর হ্রদ রয়েছে ৪,৫৯০ মিটার উচ্চতায়। এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থিত মিষ্টি জলের হ্রদগুলির অন্যতম। পুণ্যার্থীরা প্রথাগত ভাবে ৫২ কিলোমিটার কৈলাস পরিক্রমা করেন, যা ‘কোরা’ নামেও পরিচিত। কিছু পথে এই পরিক্রমার দূরত্ব এখন কমে ১৩ কিলোমিটার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি ব্যবস্থাপনায় লিপুলেখ দিয়ে গেলে দিল্লি থেকে কৈলাস পর্যন্ত সড়কপথে প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার যেতে হয়। তার সঙ্গে রয়েছে ৫২ কিলোমিটার পরিক্রমা। সিকিমের নাথু লা দিয়ে বিকল্প পথে সড়কযাত্রা বেশি হলেও তুলনামূলক ভাবে কম হাঁটতে হয়। এই পথ সাধারণত কম পরিশ্রমসাধ্য বলে বিবেচিত হয়। তাই প্রবীণ পুণ্যার্থীদের জন্য এটি তুলনায় বেশি উপযোগী।

পুরো যাত্রায় সাধারণত প্রায় তিন সপ্তাহ লাগে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়া, স্বাস্থ্যপরীক্ষা, সীমান্ত পার হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা এবং তিব্বতের ভিতরে যাতায়াত। তবে আবহাওয়া ও প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী সময়সূচি বদলাতে পারে।

বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যাত্রার জন্য নাম নথিভুক্ত করা ৭৫০ জনের মধ্যে ৬৮৮ জন অংশ নিয়েছিলেন এবং যাত্রা সম্পূর্ণ করেছিলেন।

সরকারি সহায়তা ও উদ্ধারব্যবস্থা

কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের নিজস্ব খরচে যাত্রার ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করে বিদেশ মন্ত্রক। উত্তরাখণ্ড, দিল্লি ও সিকিম সরকার এবং ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে যাতায়াত, থাকা, খাওয়া, স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও পথপ্রদর্শকের ব্যবস্থা করা হয়।

বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যাওয়া ভারতীয় নাগরিকেরা নেপালে খারাপ আবহাওয়া, জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন কিংবা নথিপত্র ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সংক্রান্ত সমস্যায় পড়লে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে তাঁদের সাহায্য করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ভারতীয় দূতাবাসকে।

এর আগেও বড় সংখ্যক পুণ্যার্থীকে নিরাপদে ফেরানোর প্রয়োজন হয়েছিল। ২০১৮ সালের জুন-জুলাইয়ে বেসরকারি ভ্রমণ সংস্থার মাধ্যমে নেপাল হয়ে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া প্রায় ১,৫০০ পুণ্যার্থী ফেরার পথে আটকে পড়েন। খারাপ আবহাওয়ার কারণে বিমান চলাচল বাতিল হওয়ায় তাঁরা নেপালের হিলসা–সিমিকোট–নেপালগঞ্জ পথে আটকে ছিলেন।

সংসদে সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপাল সরকার, ভ্রমণ সংস্থা এবং স্থানীয় বিমান ও হেলিকপ্টার পরিষেবা প্রদানকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় করে কাঠমান্ডুর ভারতীয় দূতাবাস তাঁদের নিরাপদে ফেরার ব্যবস্থা করেছিল।

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক