বাংলাস্ফিয়ার: ক্যালিফোর্নিয়ায় নকশা, চিনে উৎপাদন—অ্যাপলের ব্যবসার এই পরিচিত বর্ণনার আড়ালে ছিল দুই দেশের কর্মীদের নিরন্তর যাতায়াত। নতুন যন্ত্রের পরিকল্পনাকে লক্ষ লক্ষ বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত করতে শুধু নকশা পাঠিয়ে দিলেই চলত না। প্রয়োজন হতো কারখানায় দাঁড়িয়ে সমস্যা চিহ্নিত করা, উৎপাদনপদ্ধতি সংশোধন এবং নির্মাতাদের সঙ্গে নিবিড় সহযোগিতা। সেই প্রয়োজনেই সান ফ্রান্সিসকো থেকে সাংহাইয়ের বিমানপথে অ্যাপলের বার্ষিক ব্যয় পৌঁছেছিল সাড়ে তিন কোটি ডলারে।

ব্যয়ের এই অঙ্ক প্রকাশ্যে আসে ২০১৯ সালে। ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের কর্মীদের জন্য তৈরি একটি প্রচারপত্রের ছবি ছড়িয়ে পড়ে। তাতে বলা হয়েছিল, সান ফ্রান্সিসকো–সাংহাই পথে প্রতিদিন গড়ে ৫০টি উচ্চশ্রেণির আসন কিনত অ্যাপল। অর্থাৎ, বছরে ১৮ হাজারের বেশি আসন। সাংহাইয়ের পুডং বিমানবন্দর থেকে চিনের বিভিন্ন উৎপাদনকেন্দ্রের কাছাকাছি পৌঁছনোর সুবিধা ছিল। ফলে এই শহর অ্যাপলের কর্মীদের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

তবে সাড়ে তিন কোটি ডলারকে অ্যাপলের সমস্ত চিন সফরের মোট খরচ ভাবলে ভুল হবে। এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট বিমানপথে ব্যয়ের হিসাব। তখন ইউনাইটেডের কাছে অ্যাপলের সামগ্রিক বার্ষিক ব্যবসার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫ কোটি ডলার। প্রকাশ্যে আসা প্রচারপত্রের সত্যতা স্বীকার করেছিল বিমান সংস্থাটি। তারা জানিয়েছিল, তথ্যটি অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়েছিল; জনসমক্ষে প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল না। পরে সেটি সরিয়ে নেওয়া হয়।

কেন এত মানুষকে পাঠাতে হতো? বিনিয়োগকারী রাহুল মাথুরের তুলে ধরা বিবরণ অনুযায়ী, সফরকারী দলে থাকতেন উৎপাদনপ্রক্রিয়ার ইঞ্জিনিয়ার, নকশাকার, পরিচালন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী এবং পণ্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের বিশেষজ্ঞরা। নতুন পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর সময়ে তাঁরা কারখানায় কাজ করতেন। লেখক ড্যান ওয়াংয়ের ‘ব্রেকনেক’ বইয়ের আলোচনাতেও উঠে এসেছে ক্যালিফোর্নিয়া ও চিনের এই পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি।

এই ব্যবস্থার তাৎপর্য সহজ। পরীক্ষাগারে একটি যন্ত্র তৈরি করা এবং একই মান বজায় রেখে বিপুল সংখ্যায় সেটি উৎপাদন করা আলাদা চ্যালেঞ্জ। কোথাও যন্ত্রাংশ বসাতে সমস্যা হলে, কোথাও পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়লে, তার সমাধান উৎপাদনের গতির সঙ্গে মিলিয়েই করতে হয়। নকশা ও বাস্তব নির্মাণের মধ্যে সেই সমন্বয় যত দ্রুত হয়, সময়মতো বাজারে পণ্য পৌঁছনোর সম্ভাবনাও তত বাড়ে। অ্যাপলের বিমানযাত্রার বিপুল ব্যয়কে তাই উৎপাদনব্যবস্থারই একটি অংশ হিসেবে দেখা যায়।

অতিমারি এই কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতিমারির আগে প্রতি মাসে শত শত মার্কিন ইঞ্জিনিয়ার চিনে যেতেন চুক্তিভিত্তিক নির্মাতাদের কাজ তদারক করতে। যাতায়াতে বাধা তৈরি হলে চিনে কর্মরত ইঞ্জিনিয়ারদের উপর নির্ভরতা বাড়ায় অ্যাপল। স্থানীয় কর্মীরা আরও দায়িত্ব পান।

দূর থেকে সহযোগিতার ব্যবস্থাও বাড়ে। কারখানার সরাসরি দৃশ্য সম্প্রচার, আইপ্যাডে যোগাযোগ এবং বাস্তব দৃশ্যের উপর ডিজিটাল তথ্য দেখানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্যালিফোর্নিয়ার বিশেষজ্ঞরা সমস্যা বুঝতে সাহায্য করতেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও পণ্যের নকশার কাজ প্রধানত সদর দফতরেই থাকত।

সাড়ে তিন কোটি ডলারের এই পুরনো হিসাব তাই একটি বড় বাস্তবতা বোঝায়: অ্যাপলের সাফল্যে আকর্ষণীয় নকশার পাশাপাশি কারখানার দক্ষতা এবং দুই প্রান্তের কর্মীদের নিয়মিত সহযোগিতারও বড় ভূমিকা ছিল। বিমানভাড়া ছিল সেই সংযোগ বজায় রাখার মূল্য।