নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের সামনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে মোহন ভাগবত বলেন, কোনও দেশ শুধু একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়। প্রত্যেক দেশেরই একটি নির্দিষ্ট কর্তব্য থাকে। স্বামী বিবেকানন্দের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রত্যেক দেশেরই পৃথিবীর কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার, একটি লক্ষ্য পূরণ করার এবং একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছনোর দায়িত্ব রয়েছে। ভারতের লক্ষ্য হল—বৈচিত্র্যের মধ্যেও যে গভীর ঐক্য রয়েছে, তা গোটা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা।
তিনি বলেন, “ভারতের ক্ষেত্রে ঐক্য ও বৈচিত্র্য—দুটিই আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বৈচিত্র্যকে উদ্যাপন করতে হবে, সম্মান করতে হবে এবং মেনে নিতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমরা সবাই এক। এই একাত্মতার অনুভূতি বাস্তব।”
আরএসএসের শতবর্ষ উপলক্ষে আন্তর্জাতিক প্রচার কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘এহেড ফোরাম’ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। তবে অনুষ্ঠানটি ঘিরে নিউইয়র্কে বিতর্কও তৈরি হয়। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি সপ্তাহের শুরুতেই জানিয়েছিলেন, তিনি আরএসএসের এই অনুষ্ঠানকে সমর্থন করেন না। তাঁর অভিযোগ, আরএসএস এমন একটি আন্দোলনের অংশ, যার দৃষ্টিভঙ্গি অন্যদের বাদ দেওয়ার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, তিনি যে বহুত্ববাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে দেখে বড় হয়েছেন, আরএসএসের আদর্শ তার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মামদানি বলেছিলেন, “আমি এই সমাবেশকে সমর্থন করি না। তবে কোনও বেসরকারি অনুষ্ঠান বাতিল করার আইনি ক্ষমতা শহর প্রশাসনের রয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।”
এই বিতর্কে বিভিন্ন ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার সংগঠনও যোগ দেয়। ‘হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটস’, ‘ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিল’ এবং ‘ইন্টারফেইথ সেন্টার অব নিউইয়র্ক’-সহ কয়েকটি সংগঠন সিটি হলের বাইরে সাংবাদিক বৈঠক করে ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনের অনুষ্ঠান বাতিল করার দাবি জানায়।
এই বিতর্কের মধ্যেই ভাগবত তাঁর বক্তৃতায় ভারত সম্পর্কে আরএসএসের ধারণা এবং বিশ্বসভায় ভারতের সভ্যতাগত ভূমিকা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন। নিউইয়র্কের অন্যতম বিখ্যাত প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠানটি হলেও, দর্শকদের অধিকাংশই ছিলেন আমেরিকায় বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ।
ভাগবত বলেন, একাত্মতার ধারণা শুধু দার্শনিক চিন্তা নয়। মানুষ অন্য মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করবে, তার সঙ্গেও এই ধারণার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তিনি শ্রোতাদের একটি পরিস্থিতি কল্পনা করতে বলেন—একজন মানুষ খাচ্ছেন, আর তাঁর সামনে একজন ক্ষুধার্ত মানুষ বসে তা দেখছেন। ভাগবতের মতে, একজন মানুষের পক্ষে তখন নিশ্চিন্তে খেয়ে যাওয়া কঠিন হবে। কারণ অন্যের কষ্ট দেখলে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই সহানুভূতি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, “আপনি খেতে পারবেন না। কারণ আমরা মানুষ।”
এরপর ভাগবত দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেন। একটি হল, “নিজে বাঁচো এবং অন্যকেও বাঁচতে দাও।” অন্যটি হল, “শুধু তাদেরই বাঁচতে দাও, যারা আমাদের কথা মেনে চলে।” তাঁর মতে, যারা কেবল অনুগত ও বাধ্য মানুষদের রক্ষা করে, তারা ‘রাক্ষস’। আর যারা কেউ কাজে লাগুক বা না লাগুক, বাধ্য হোক বা না হোক—সব মানুষের কথা ভাবে, তারা ‘দেবতা’র আদর্শ অনুসরণ করে।
ভাগবত বলেন, ভারতীয় সভ্যতার মূল উপলব্ধি হল—আত্মার মাধ্যমে সমস্ত মানুষ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। একটি সুতোয় যেমন অনেকগুলি পুঁতি গাঁথা থাকে, তেমনই সব মানুষ একটি অদৃশ্য বন্ধনে বাঁধা। মানুষের শরীর, পোশাক কিংবা উপাসনার পদ্ধতি আলাদা হতে পারে। কিন্তু সেই বাহ্যিক পার্থক্য মানুষের অন্তর্নিহিত ঐক্যকে নষ্ট করে না।
তিনি বলেন, “এই দর্শন আমাদের জানায়, আপনাদের দেখতে আলাদা মনে হলেও আসলে আপনারা আলাদা নন। একদিন এই সমস্ত পার্থক্য মুছে যাবে। শরীরের মৃত্যু হবে, কিন্তু এমন কিছু থেকে যাবে, যা চিরস্থায়ী। আমরা সবাই পরস্পরের আপনজন।”
ভাগবতের দাবি, ভারতের পূর্বপুরুষেরা এই উপলব্ধিই বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁরা হিমালয়ের দক্ষিণ থেকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ডের মানুষকে একটি জাতি হিসেবে সংগঠিত করেছিলেন। এই জাতির দায়িত্ব ছিল মানবসমাজের পারস্পরিক ঐক্যের জ্ঞান পৃথিবীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।
তিনি বলেন, “ভারতকে এই লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। শুধু উপদেশ দিয়ে নয়, নিজেদের কাজ ও আচরণের মাধ্যমে তা দেখাতে হবে। এটিই ভারতের নিয়তি।”
আমেরিকায় বসবাসকারী ভারতীয়দের উদ্দেশে ভাগবত বলেন, তাঁদের প্রথম দায়িত্ব আমেরিকার প্রতি। কারণ আমেরিকাই এখন তাঁদের ‘কর্মভূমি’। তাঁরা যদি ভারতের জন্য কিছু করতে চান, তবে প্রথমে যে দেশে বসবাস করছেন, সেই দেশের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে থাকা ভারতীয়দের ভারতের কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবোধ অনুসরণ করে জীবনযাপন করা উচিত। তাঁর কথায়, “আমরা পৃথিবীর কাছ থেকে অনেক কিছু গ্রহণ করি। তাই আমাদেরও পৃথিবীকে কিছু ফিরিয়ে দিতে হবে। আমরা কত উপার্জন করলাম, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা কতটা অন্যদের মধ্যে বিলিয়ে দিলাম, সেটিই আসল।”
মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক নিয়েও ভাগবত কথা বলেন। ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারির স্যাপিয়েন্স বইয়ের উল্লেখ করে তিনি বলেন, খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে মানুষের উঠে আসার জন্য অন্য বহু প্রজাতিকে মূল্য দিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, “মানুষ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী এবং এই সৃষ্টির মালিক—এই অহংকার তার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু সেই কারণেই অন্য জীবজগৎকে রক্ষা করার দায়িত্বও মানুষের। শুধু অন্যকে বাঁচতে দিলেই হবে না; অন্যরা যাতে বাঁচতে পারে, তার জন্য আমাদের সাহায্য করতে হবে।”
ভাগবত বলেন, ভারতীয় সভ্যতার শিক্ষা শত্রুকে ধ্বংস করার কথা বলে না। কোনও মানুষের মধ্যে দুষ্ট চিন্তা বা অন্যায় প্রবণতা থাকলে, সেই মানুষটির ধ্বংস কামনা না করে তার খারাপ মানসিকতা দূর হওয়ার প্রার্থনা করা উচিত।
তিনি বলেন, “এমনকি আমাদের শত্রু এবং আমরাও মূলত এক।” তাঁর মতে, শত্রুতা মানুষেরই তৈরি। ভিন্ন পরিস্থিতি ও ভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের মধ্যে শত্রুতা জন্ম নেয়।