বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের বিমান পরিবহণ শিল্পে নতুন উদ্বেগের সঞ্চার করল এয়ার ইন্ডিয়ার (Air India) সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। ক্রমবর্ধমান জ্বালানি খরচ (Fuel Price Hike) এবং অপারেশনাল ব্যয়ের চাপে পড়ে সংস্থাটি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক— দুই ক্ষেত্রেই উড়ানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর (Air India reducing capacity) ঘোষণা করেছে। এর ফলে আগামী কয়েক মাসে বিমান ভাড়া আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্প বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে যাত্রীদের জন্য টিকিটের প্রাপ্যতাও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

উড়ান ছাঁটাইয়ের পরিসংখ্যান ও মূল কারণ

সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, অভ্যন্তরীণ রুটে উড়ান সংখ্যা প্রায় ২২ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও প্রায় ২৭ শতাংশ উড়ান কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রতিদিনের ২৫০-রও বেশি দেশীয় উড়ান সূচি থেকে বাদ পড়েছে। এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল বা এটিএফ-এর লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি।

বিশ্ববাজারে অশান্তির জেরে অপরিশোধিত তেলের দাম গত কয়েক সপ্তাহে দ্রুত বেড়েছে। পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সঙ্কট এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অস্থির হয়ে উঠেছে। ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ক্ষেত্রে তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিমান সংস্থাগুলির ওপর। কারণ, বিমান পরিচালনার মোট খরচের প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশই জ্বালানি বাবদ ব্যয় হয়। ফলে তেলের দাম সামান্য বাড়লেও বিমান সংস্থার আর্থিক ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।

সমগ্র বিমান পরিবহণ শিল্পেই সংকটের ছায়া

এয়ার ইন্ডিয়ার এই সিদ্ধান্তকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, এটি আসলে গোটা ভারতীয় বিমান শিল্পের বর্তমান সংকটের প্রতিফলন। করোনা-পরবর্তী সময়ে যাত্রী সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও বিমান সংস্থাগুলির লাভজনকতা তেমন বাড়েনি। বরং প্রতিযোগিতা, ডিসকাউন্ট ভাড়া, বিমান লিজের ব্যয় এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিন হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উড়ান সংখ্যা কমানোর মাধ্যমে সংস্থাগুলি মূলত বাজারে আসনসংখ্যা সীমিত করতে চাইছে। এতে একদিকে অপারেশনাল খরচ কিছুটা কমবে, অন্যদিকে কম সরবরাহের কারণে বিমান ভাড়া বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হবে। ইতিমধ্যেই দিল্লি-মুম্বই, কলকাতা-বেঙ্গালুরু, চেন্নাই-হায়দরাবাদের মতো জনপ্রিয় রুটে ভাড়া গত কয়েক সপ্তাহে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

ইন্ডিগো-র রুট পুনর্বিন্যাস ও ছোট শহরগুলিতে প্রভাব

শুধু এয়ার ইন্ডিয়া নয়, দেশের বৃহত্তম বিমান সংস্থা ইন্ডিগো-ও খরচ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন রুট পুনর্বিন্যাস করছে বলে খবর। ছোট শহরগুলির সঙ্গে সংযোগকারী কিছু রুটে উড়ান কমানো হতে পারে। এর ফলে টিয়ার-টু এবং টিয়ার-থ্রি শহরগুলির যাত্রীদের উপর প্রভাব বেশি পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পর্যটন শিল্পও এই পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন। গ্রীষ্মের ছুটি এবং উৎসবের মরসুম সামনে রেখে বহু মানুষ আগেভাগে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু বিমান ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেলে পর্যটন শিল্পে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত যাত্রীদের একাংশ আবার ট্রেন বা বাসের দিকে ঝুঁকতে পারেন।

করের বোঝা ও সরকারি নীতির সংস্কারের দাবি

অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, এই পরিস্থিতি ভারতের বিমান পরিবহণ নীতির কিছু পুরনো সমস্যাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। ভারতে বিমান জ্বালানির উপর রাজ্যভিত্তিক উচ্চ কর দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। বহু রাজ্যে এটিএফ-এর উপর ভ্যাট অত্যন্ত বেশি হওয়ায় বিমান সংস্থাগুলির ব্যয় আরও বেড়ে যায়। শিল্পমহলের দাবি, কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার যদি করের বোঝা কিছুটা কমায়, তাহলে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

একই সঙ্গে বিমান সংস্থাগুলিকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়েও ভাবতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শুধুমাত্র ভাড়া বাড়ানো বা উড়ান কমানো দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। জ্বালানি-সাশ্রয়ী বিমান ব্যবহার, রুট পরিকল্পনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানি প্রযুক্তির দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া জরুরি হয়ে উঠছে।

শেষ মুহূর্তের বুকিংয়ে পকেটে টান, আশঙ্কায় আমজনতা

তবে আপাতত যাত্রীদের জন্য বার্তা খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। সামনের মাসগুলিতে জনপ্রিয় রুটগুলিতে টিকিটের দাম আরও বাড়তে পারে। শেষ মুহূর্তের বুকিং প্রায় অসম্ভব ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। ব্যবসায়িক ভ্রমণ থেকে পারিবারিক ছুটি— সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়বে।

ভারতের বিমান পরিবহণ শিল্প গত এক দশকে দ্রুত প্রসারিত হয়েছে। সস্তার বিমান পরিষেবা বহু নতুন যাত্রীকে আকাশপথে এনেছে। কিন্তু বর্তমান সঙ্কট দেখিয়ে দিচ্ছে, এই শিল্প এখনও বহিরাগত ধাক্কার কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল। আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে সামান্য অস্থিরতাও কীভাবে দেশের আকাশপথকে প্রভাবিত করতে পারে, এয়ার ইন্ডিয়ার এই সিদ্ধান্ত তারই নতুন উদাহরণ।