লগইনসদস্যতালেখক
হোম›সর্বশেষ›হকার উচ্ছেদে কি বিজেপি নিজের পায়ে কুড়ুল মারছে?
সর্বশেষ

হকার উচ্ছেদে কি বিজেপি নিজের পায়ে কুড়ুল মারছে?

হাইলাইটস হকার উচ্ছেদে শহুরে মধ্যবিত্তের একাংশ খুশি হতে পারেন। কিন্তু জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ হতে পারেন লক্ষাধিক মানুষ। এই ক্ষোভকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা করছে সিটু ও বামপন্থীরা। পুনর্বাসন…

হকার উচ্ছেদে কি বিজেপি নিজের পায়ে কুড়ুল মারছে?

হাইলাইটস

  • হকার উচ্ছেদে শহুরে মধ্যবিত্তের একাংশ খুশি হতে পারেন।
  • কিন্তু জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ হতে পারেন লক্ষাধিক মানুষ।
  • এই ক্ষোভকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা করছে সিটু ও বামপন্থীরা।
  • পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ হলে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
  • তবে শুধুমাত্র হকার আন্দোলন দিয়ে বামেদের পুনরুত্থান নিশ্চিত নয়।

বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় নতুন সরকারের হকার উচ্ছেদ অভিযান শুরু হতেই একটি প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠেছে। বিজেপি কি অজান্তেই বামেদের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ করে দিচ্ছে? আরও স্পষ্ট করে বললে, এই অভিযান কি রাজনৈতিকভাবে কিছুটা আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে?

প্রশ্নটি অমূলক নয়। কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে হকার আন্দোলন বহুবার বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্ম দিয়েছে।

বিজেপির হিসাব কী?

সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি দেখলে ছবিটা অন্যরকম।

বহু বছর ধরে কলকাতার ফুটপাত দখল, যানজট, অগ্নিনিরাপত্তার ঝুঁকি এবং পথচারীদের দুর্ভোগ নিয়ে অভিযোগ ছিল। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্তের বড় অংশ মনে করেন ফুটপাত মূলত হাঁটার জন্য, দোকান বসানোর জন্য নয়।

তাই সরকার সম্ভবত মনে করছে, কঠোর পদক্ষেপ নিলে “আইনের শাসন” এবং “শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা”র বার্তা যাবে। শহরের রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত হলে তার রাজনৈতিক লাভও পাওয়া যেতে পারে।

অর্থাৎ বিজেপি এক অর্থে “শৃঙ্খলা বনাম বিশৃঙ্খলা”র রাজনীতি খেলতে চাইছে।

কিন্তু বিপদ কোথায়?

সমস্যা শুরু হয় যখন মানুষ উচ্ছেদকে প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে নয়, জীবিকার উপর আঘাত হিসেবে দেখতে শুরু করে।

একজন হকারের দোকান শুধু একটি কাঠামো নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, বহু বছরের আয়, ঋণ, সন্তানের পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন। যদি হাজার হাজার মানুষ মনে করেন তাদের জীবিকা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তাহলে ক্ষোভ জমা হতে বাধ্য। আর রাজনীতিতে ক্ষোভ কখনও অলক্ষ্যে থাকে না। কোনও না কোনও রাজনৈতিক শক্তি তাকে সংগঠিত করার চেষ্টা করে।

সিটু ও বামেদের সক্রিয়তা কেন বাড়ছে?

ঠিক এই জায়গাতেই সিটু এবং বামপন্থীরা সুযোগ দেখতে পাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে হকার সংগঠনগুলির উপর তৃণমূলের প্রভাব ছিল। কিন্তু সরকার বদলের পর সেই কাঠামো দুর্বল হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বামপন্থীরা নিজেদের আবার “গরিব মানুষের রক্ষক” হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।

তাদের বক্তব্য স্পষ্ট—পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ চলবে না।

হকারদের মধ্যে যদি অসন্তোষ বাড়ে, তাহলে সেই অসন্তোষকে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তর করার চেষ্টা করবে বামেরা।

তাহলে কি বামেদের পুনরুত্থান নিশ্চিত?

তা বলা যাবে না।

একটি আন্দোলন কোনও রাজনৈতিক দলের পুনর্জন্ম ঘটাতে পারে, কিন্তু শুধুমাত্র একটি ইস্যুর উপর দাঁড়িয়ে কোনও দল ক্ষমতার বিকল্প হয়ে ওঠে না।

বামেদের সামনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—

  • সাংগঠনিক দুর্বলতা,
  • নতুন নেতৃত্বের অভাব,
  • তরুণ ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা,
  • এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষয়।

তাই হকার আন্দোলন বামেদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু পুনরুত্থান নিশ্চিত করতে পারে না।

ইতিহাস কী বলছে?

এই প্রসঙ্গে ১৯৯৬ সালের অপারেশন সানশাইনের কথা মনে পড়ে।

তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার কলকাতা থেকে ব্যাপক হারে হকার উচ্ছেদ করেছিল। প্রথমদিকে অভিযান সফল বলেই মনে হয়েছিল।

কিন্তু পুনর্বাসন প্রকল্পগুলির অনেকগুলোই কার্যকর হয়নি। বহু হকার আবার পুরনো জায়গায় ফিরে আসেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, সেই সময় হকারদের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছিল।

ইতিহাস হুবহু পুনরাবৃত্তি না হলেও, তার শিক্ষা অবশ্যই আছে।

বিজেপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

আসল প্রশ্ন হকার উচ্ছেদ নয়।

আসল প্রশ্ন হলো—উচ্ছেদের পরে কী?

যদি সরকার শুধু দোকান ভেঙে দেয় কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না করে, তাহলে সমস্যা বাড়বে।

কিন্তু যদি—

  • নির্দিষ্ট হকার জোন তৈরি হয়,
  • বৈধ লাইসেন্স দেওয়া হয়,
  • পুনর্বাসন বাজারে ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়,
  • এবং জীবিকা বজায় রেখে ফুটপাত দখলমুক্ত করা যায়,

তাহলে সরকারের অবস্থান অনেক শক্তিশালী হবে।

শেষ কথা

হকার উচ্ছেদ অভিযান বিজেপির জন্য রাজনৈতিক সুযোগও হতে পারে, আবার রাজনৈতিক ঝুঁকিও হতে পারে।

সবকিছু নির্ভর করছে সরকার এই অভিযানকে কীভাবে পরিচালনা করছে তার উপর।

যদি মানুষ মনে করেন সরকার শহরকে সুশৃঙ্খল করছে, তাহলে লাভ বিজেপির।

আর যদি মানুষ মনে করেন সরকার জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে, তাহলে সেই ক্ষোভকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে বিরোধীরা, যার মধ্যে বামেরাও রয়েছে।

সুতরাং হকার উচ্ছেদের আসল লড়াই ফুটপাথে নয়, জনমতের ময়দানে। সেখানে কে জিতবে, তা নির্ধারণ করবে পুনর্বাসন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক বার্তার বিশ্বাসযোগ্যতা।

বাংলা.স্ফিয়ার