বাংলাস্ফিয়ার: তিন বছর ধরে ফাঁদ এড়িয়ে নিউজিল্যান্ডের বিরল দেশীয় বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে বিলুপ্তপ্রায় পাটেকে (Brown Teal) হাঁসের ওপর ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে আসা কুখ্যাত বন্য বিড়াল ‘নাইন লাইভস’ অবশেষে ধরা পড়েছে। পরে তাকে মানবিক উপায়ে গুলি করে মারা হয়েছে। এই বিড়ালটি এতবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিল যে সংরক্ষণকর্মীরাই তার নাম দিয়েছিলেন ‘নাইন লাইভস’।
নিউজিল্যান্ডের উত্তর দ্বীপের উত্তর প্রান্তে পুরেরুয়া উপদ্বীপে সংরক্ষণ প্রকল্প পেস্ট ফ্রি পুরেরুয়া-র কর্মীরা গত তিন বছর ধরে বিড়ালটিকে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। প্রকল্পের ব্যবস্থাপক অ্যান্ডি মেন্টর বলেন, “এতদিন ধরে এটি আমাদের বিভ্রান্ত করে রেখেছিল। তাই এবার সফল হতে পেরে আমরা সত্যিই স্বস্তি পেয়েছি।”
ধারণা করা হচ্ছে, এই বড় আকারের ধূসর ডোরাকাটা বিড়ালটি একাই নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বিরল মূল ভূখণ্ডের হাঁস পাটেকে-র কয়েক ডজন সদস্যকে মেরে ফেলেছে, যা গোটা প্রজাতির প্রায় ১ শতাংশ। পাশাপাশি এটি বহু কিউই পাখির ছানা, দেশীয় গেকো এবং অন্যান্য স্থানীয় প্রাণীও শিকার করেছে।
২০২৩ সালে পুরেরুয়া উপদ্বীপে প্রথম বিড়ালটির দেখা মেলে। ঠিক তার আগেই সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে ২০টি পাটেকে হাঁস ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। সংরক্ষণকর্মীদের ধারণা ছিল, এলাকায় বন্য বিড়ালের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম হাঁসটির মৃতদেহ পাওয়া যায়। নজরদারি ক্যামেরায় একই বিশেষ চিহ্নযুক্ত বিড়ালটিকে দেখা যায়। এরপর আরও ১৫টি হাঁস মারা পড়ে।
পরের বছর আরও ২০টি পাটেকে ছাড়া হলে একই ঘটনা ঘটে। আবারও ওই বিড়ালটি ১৫টি হাঁস মেরে ফেলে।
মেন্টর জানান, বিড়ালটির আচরণ ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক। কখনও সন্ধ্যায়, কখনও গভীর রাতে, কখনও ভোরে বা দিনের বেলায় দেখা যেত। আবার এক জায়গায় দেখা দেওয়ার পর দুই-তিন মাস তার কোনও হদিস মিলত না। এই অনিয়মিত চলাফেরার জন্যই তাকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছিল।
গত জুলাইয়ের শেষে সংরক্ষণকর্মীরা লক্ষ্য করেন, একটি পাথরখাদানে টানা তিন রাত বিড়ালটি এসেছে। এটি ছিল অস্বাভাবিক ঘটনা। এরপর সেখানে স্যালমন মাছ, ভাজা মুরগির মাংস এবং খরগোশের মাংস টোপ হিসেবে রেখে খাঁচা ও ফাঁদ পাতা হয়।
৩০ জুলাই মোবাইল-সংযুক্ত ক্যামেরায় একটি খাঁচার ভিতরে বিড়ালটিকে দেখা যায়। সঙ্গে সঙ্গে কর্মীরা সেখানে পৌঁছে নিশ্চিত হন যে সেটিই ‘নাইন লাইভস’। পরে তাকে মানবিক উপায়ে গুলি করে মারা হয়।
এখন বিড়ালটির পাকস্থলীর উপাদান পরীক্ষা করে দেখা হবে, সে ঠিক কী কী প্রাণী খেয়েছিল। এরপর তার দেহ সংরক্ষণ (ট্যাক্সিডার্মি) করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে মানুষকে বন্য বিড়ালের কারণে দেশীয় জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন করা যায়।
নিউজিল্যান্ডে প্রায় ২৫ লক্ষেরও বেশি বন্য বিড়াল বনাঞ্চল ও উপকূলবর্তী দ্বীপগুলোতে ঘুরে বেড়ায়। এদের দৈর্ঘ্য লেজসহ প্রায় এক মিটার পর্যন্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এরা বহু দেশীয় পাখি ও প্রাণীকে বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে নিউজিল্যান্ড সরকার গত নভেম্বরে বন্য বিড়ালকে দেশের উচ্চাভিলাষী ‘প্রিডেটর-ফ্রি ২০৫০’ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর লক্ষ্য শুধু সংখ্যা কমানো নয়, ভবিষ্যতে বন্য বিড়াল সম্পূর্ণ নির্মূলের চেষ্টা করা।
অ্যান্ডি মেন্টরের কথায়, ‘নাইন লাইভস’ যতই ধ্বংস ডেকে আনুক না কেন, তাকে একজন কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবেই মনে রাখা হবে। তাঁর ভাষায়, “নাইন লাইভসেরও একটা মর্যাদা প্রাপ্য। সে আমাদের সবচেয়ে ধূর্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল।”