বাংলাস্ফিয়ার: দুর্গাপুজোর আনন্দ নষ্ট করার চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে পুজো উদ্যোক্তা, পুলিশ ও প্রশাসনকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর মুর্শিদাবাদের লালবাগে একটি সর্বজনীন পুজোর উদ্বোধনে তিনি বলেন, কিছু মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে উৎসবের পরিবেশ বিঘ্নিত করতে চাইছেন। তাঁদের সেই সুযোগ দেওয়া যাবে না। উৎসবের দিনগুলিতে নজরদারি বজায় রাখার উপর জোর দেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে মুর্শিদাবাদের দু’টি পুজোমণ্ডপে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ঘটনাগুলির তদন্ত চলছে। তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ওই দুর্ঘটনাগুলির পিছনে পরিকল্পিত নাশকতা প্রমাণিত হওয়ার কোনও তথ্য নেই। ফলে দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে তদন্ত এবং উৎসব বানচালের আশঙ্কা সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে পৃথকভাবে দেখা প্রয়োজন। তাঁর মূল আবেদন, কোনওভাবেই যেন মানুষের পুজোর আনন্দ মাটি না হয়।
পুজো আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু মুর্শিদাবাদেই আটশোর বেশি নতুন পুজোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পুজো কমিটিগুলিকে এক লক্ষ টাকা করে অনুদান, বিদ্যুতের খরচ মকুব এবং বিনামূল্যে অগ্নিনির্বাপণ সংক্রান্ত অনুমতি দেওয়ার কথাও জানান তিনি। পুজোর প্রসারের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বের কথাই উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।
এর আগের দিন, বুধবার দক্ষিণ কলকাতার বেহালায় পুজোর উদ্বোধনেও আয়োজনের রীতিনীতি নিয়ে বার্তা দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে উদ্যোক্তাদের সনাতনী ঐতিহ্য মেনে চলার আবেদন জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, দেবীর আরাধনায় শাস্ত্রীয় বিধান অনুসরণ করতে হবে। যে সমস্ত আয়োজক ধর্মীয় রীতি এবং বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বজায় রাখছেন, রাজ্য সরকার তাঁদের পাশে থাকবে বলেও আশ্বাস দেন।
বেহালার অনুষ্ঠানেই শুভেন্দু দাবি করেন, এ বছর রাজ্যে আটান্ন হাজার দুর্গাপুজো হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় তেরো হাজার বেশি। উৎসবের সরকারি আয়োজনেও পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেন তিনি। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে দশমীর পরে রেড রোডে আয়োজিত পুজো কার্নিভালের পরিবর্তে মহালয়ায় ইডেন গার্ডেন্সের অনুষ্ঠানের কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। দেবীর আগমনকে সামনে রেখেই ওই আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান। পরে নিউ আলিপুরের সুরুচি সঙ্ঘের পুজোও উদ্বোধন করেন তিনি। সেখানে জয় শ্রীরাম ও জয় মা দুর্গা ধ্বনি ওঠে।
সেপ্টেম্বরের পুজো প্রস্তুতি বৈঠকেও মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, পুজোর অনুমতির জন্য উদ্যোক্তাদের বাধার মুখে পড়তে হবে না। বাংলার রীতি ও সংস্কৃতি মেনে উৎসব আয়োজনের সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন তিনি। পাশাপাশি পর্যটন এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠান, ড্রোন প্রদর্শনী ও আতশবাজির আয়োজনের পরিকল্পনা জানিয়েছিলেন। সেই প্রস্তুতির ধারাবাহিকতায় এখন বিভিন্ন জেলায় গিয়ে পুজো উদ্বোধন করছেন মুখ্যমন্ত্রী এবং উদ্যোক্তাদের বার্তা দিচ্ছেন।
পুজো উদ্বোধনের মঞ্চ থেকে নাগরিকত্ব নিয়েও আশ্বাস দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। মঙ্গলবার উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁয় মতুয়াদের উদ্দেশে তিনি জানিয়েছিলেন, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে আবেদনকারীদের শংসাপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। জেলাশাসকের দপ্তর থেকে সরাসরি শংসাপত্র সংগ্রহের ব্যবস্থা করার কথাও বলেন। বনগাঁ উত্তরের বিধায়ক তথা খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়ার উদ্যোগে আয়োজিত গান্ধিপল্লি বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাবের পুজোয় তাঁর আশ্বাস ছিল, কোনও মতুয়া নাগরিকত্বের আওতার বাইরে থাকবেন না। তবে এটি মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত আশ্বাস; ব্যক্তিগত আবেদনের নিষ্পত্তি সম্পর্কে ওই বক্তব্য থেকে সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
এই ধারাবাহিক বক্তব্যে পুজোর আয়োজন, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং প্রশাসনিক দায়িত্বকে একই মঞ্চে তুলে ধরছেন মুখ্যমন্ত্রী। মুর্শিদাবাদের সতর্কবার্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল, তদন্তের ফল সামনে আসার আগে আশঙ্কাকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা বলে ধরে না নেওয়া। উদ্যোক্তাদের সতর্ক থাকতে বলা এবং কোনও নির্দিষ্ট ঘটনার জন্য কাউকে দায়ী করা আলাদা বিষয়। উৎসবের নিরাপত্তা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য। মণ্ডপের দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তেই স্পষ্ট হওয়ার কথা; সেই তথ্যই পরবর্তী পদক্ষেপের ভিত্তি হওয়া