প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নোটিস পাঠাল সুপ্রিম কোর্ট। পাশাপাশি, প্রতিবাদের নির্ধারিত স্থান হিসেবে যন্তর মন্তরের স্বীকৃতি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দায়ের হওয়া আবেদনগুলিও শুনতে রাজি হয়েছে শীর্ষ আদালত। নতুন ভোটারের নাম নথিভুক্ত করার আবেদনপত্র, অর্থাৎ ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন নিয়েও নির্বাচন কমিশনকে নোটিস দিয়েছে বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ।
‘রাহুল গান্ধী বনাম ভারতের নির্বাচন কমিশন’ মামলায় জ্ঞানেশ কুমারকে ব্যক্তিগতভাবে বিবাদী করা হয়েছে। ফলে তাঁকে নিজের বক্তব্য জানিয়ে জবাব দাখিল করতে হবে। অন্য দিকে, ইন্ডিয়া জোটের ১৩ জন আবেদনকারীর মধ্যে একজনের আচরণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আদালত। নাম উল্লেখ না করেই বেঞ্চ জানায়, অন্য আবেদনকারীদের নিয়ে তাদের কোনও সমস্যা নেই। তবে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীর আচরণকে মার্জনা করা হচ্ছে না। তাঁকে এ বিষয়ে হলফনামা জমা দিতে হবে।
যন্তর মন্তর নিয়ে টানাপড়েন
দিল্লিতে বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান হিসেবে যন্তর মন্তরের স্বীকৃতি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও এ বার আদালতের বিচারাধীন। গত ১২ অক্টোবর পুলিশ জানায়, বিক্ষোভের নির্দেশিকা সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশ সংশোধন করা হয়েছে। যন্তর মন্তরের পরিবর্তে বুরারি ময়দান, রামলীলা ময়দান এবং সিবিডি ময়দানকে প্রতিবাদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবেদনকারীদের পক্ষে সওয়াল করেন দিল্লি হাই কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি তথা প্রবীণ আইনজীবী মুক্তা গুপ্ত। তাঁর বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের আগের রায় অনুযায়ী, প্রতিবাদের স্থান এমন হওয়া প্রয়োজন, যেখানে বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য ক্ষমতাসীনদের কাছে পৌঁছতে পারে।
বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘শোনা’ শব্দটিকে প্রযুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করতে হবে। সরকারের হলফনামায় দাবি করা হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের ৯ অক্টোবরের একটি আদেশের পরিপ্রেক্ষিতেই যন্তর মন্তর নিয়ে এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। কিন্তু আবেদনকারীদের আইনজীবীরা বিষয়টি তুললে বিচারপতি বাগচী প্রশ্ন করেন, আদালতের মৌখিক পর্যবেক্ষণকে আইন হিসেবে গণ্য করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
দুই ধারার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ও ১৭২ ধারার সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানানো আবেদনগুলিও আদালতে উঠেছে। ১৬৩ ধারা অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসন নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ জারি করতে পারে। পুরনো ফৌজদারি কার্যবিধিতে এই বিধান ছিল ১৪৪ ধারায়। অন্য দিকে, ১৭২ ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেককে পুলিশের আইনসম্মত নির্দেশ মেনে চলতে হয়।
আবেদনকারীদের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন বলেন, দুটি ধারাই বিচার করে দেখা প্রয়োজন। প্রথমে বেঞ্চ শুধু ১৭২ ধারা নিয়ে নোটিস জারি করার পক্ষে ছিল। কারণ, ১৯৭০ সালে ‘মধু লিমায়ে বনাম সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ১৪৪ ধারার বৈধতা বহাল রেখেছিল।
তবে শঙ্করনারায়ণনের যুক্তি, গত পাঁচ দশকে সাংবিধানিক আইনের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তাই দুটি ধারারই নতুন করে বিচার হওয়া উচিত। তিনি এবং তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ তথা প্রবীণ আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী দিল্লি পুলিশকে ১৬৩ ধারায় জারি করা নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশগুলি আদালতে পেশ করার নির্দেশ দেওয়ারও আবেদন জানান। গুরুস্বামী একটি জনস্বার্থ মামলায় আবেদনকারী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর হয়ে সওয়াল করছিলেন।
সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা একটি আবেদনের ‘কৌতূহলোদ্দীপক প্রার্থনা’ আদালতের নজরে আনেন। সেখানে বলা হয়েছিল, যিনি প্রতিবাদের ডাক দেবেন, তাঁকেই তার পরিণামের দায় নিতে হবে। পাল্টা শঙ্করনারায়ণন বলেন, এই যুক্তি দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অর্থাৎ, পুলিশকেও নিজের পদক্ষেপের দায় নিতে হবে।
মহিলা সাংবাদিকদের হেনস্থার অভিযোগ
প্রতিবাদের সময় পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে মহিলা সাংবাদিকদের হেনস্থার অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন কমিটি গঠনের আবেদন জানিয়েছে সাংবাদিকদের সংগঠন ‘নেটওয়ার্ক অব উইমেন ইন মিডিয়া’। সংগঠনের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিংয়ের প্রস্তাব, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, পুলিশ আধিকারিক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে ওই কমিটি গঠন করা হোক।
জয়সিংয়ের বক্তব্য, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাঁরা নিজেরাই সেই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে পারেন না। তাই স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এক মহিলা সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যাতে কোনও ‘দমনমূলক ব্যবস্থা’ নেওয়া না হয়, সেই নির্দেশও চেয়েছেন তিনি। ওই সাংবাদিক এক অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অব পুলিশ বা এসিপি-র বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর নিজের বিরুদ্ধেই তফসিলি জাতি ও তফসিলি জনজাতি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইনে মামলা হয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়। অথচ সাংবাদিকের অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে কোনও এফআইআর দায়ের হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
জবাবে মেহতা বলেন, কে সাংবাদিক, তা নির্ধারণ করা কঠিন। তাঁর মন্তব্য, ‘আমাদের অভিজ্ঞতায়, মোবাইল ফোন থাকলেই যে-কেউ সাংবাদিক।’
বিচারপতি বাগচী বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি প্রত্যেক নাগরিককে সাংবাদিক হওয়ার অধিকার দেয়, তা আরও বিস্তৃতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, সাংবাদিকদেরও বিভিন্ন শ্রেণি রয়েছে এবং কর্মরত সাংবাদিকদের আইনেও শ্রেণিবিভাগ করা হয়েছে। ফলে কোনও কোনও গোষ্ঠী অন্যদের তুলনায় বেশি সুরক্ষা পেতে পারে।
হকারদের ক্ষতিপূরণের দাবিও শুনবে আদালত
প্রতিবাদের জেরে জীবিকা হারানোর অভিযোগ তুলে ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন পথবিক্রেতা ও হকারদের একাংশ। তাঁদের আবেদনও শুনতে রাজি হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আবেদনকারীদের এক আইনজীবী আদালতে বলেন, দশেরা ও দীপাবলির মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎসবের সময়েও তাঁরা পরিবারের জন্য ৫০০ টাকা পর্যন্ত রোজগার করতে পারেননি।
এ দিকে, বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র তথা প্রবীণ আইনজীবী গৌরব ভাটিয়া আদালতকে বলেন, বিচারব্যবস্থাকে ভয় দেখিয়ে চাপে ফেলার চেষ্টা চলছে। জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত আশ্বস্ত করেন, কেউ আদালতকে ভয় দেখিয়ে প্রভাবিত করতে পারবেন না। তাঁর কথায়, এ ধরনের চেষ্টাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আদালতের বাইরে এবং ভিতরে কী ঘটছে, বিচারপতিরা সে সম্পর্কে অবগত।
নির্বাচন কমিশন, প্রতিবাদের অধিকার, পুলিশের ক্ষমতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং হকারদের জীবিকা—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনায়। তবে বিভিন্ন আবেদনের শুনানিতে সম্মতি দেওয়া বা নোটিস জারি করার অর্থ এই নয় যে আদালত ইতিমধ্যেই কোনও পক্ষের দাবিকে চূড়ান্তভাবে মেনে নিয়েছে। মামলাগুলির পরবর্তী শুনানিতে এই বিষয়গুলির আইনি দিক আরও স্পষ্ট হতে পারে।