স্কুলপড়ুয়াদের সাইকেল দেওয়ার প্রকল্পের নাম বদলে তার পরিধি বাড়াল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের চালু করা ‘সবুজ সাথী’ এখন ‘সারথি’। মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, হাওড়ার ব্যাঁটরার মধুসূদন পাল চৌধুরী হাইস্কুলে প্রকল্পের সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর ঘোষণা, নবম শ্রেণির পরিবর্তে এবার অষ্টম শ্রেণি থেকেই পড়ুয়ারা সাইকেল পাবে। ২০২৬–২৭ সালে ১২ লক্ষ ৫৯ হাজার পড়ুয়ার হাতে সাইকেল তুলে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে ৮,২২৮টি স্কুল, ৩৩৪টি ব্লক এবং ১২৫টি পুরসভা ও পুরনিগম। নতুন সাইকেলের রং হবে গেরুয়া। প্রকল্পের নাম ও প্রতীকের পাশাপাশি সাইকেলের গুণমানেও পরিবর্তন আনার দাবি করেছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, পড়ুয়াদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে আলো, টায়ার এবং অন্যান্য সরঞ্জামের মান যাচাই করা হয়েছে। সাইকেলগুলি তিন স্তরের গুণমান পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এসেছে বলে সরকারি তরফে জানানো হয়েছে।
সাইকেল সরবরাহের সঙ্গে রাজ্যের শিল্পোৎপাদনকেও যুক্ত করতে চাইছে সরকার। শুভেন্দু জানিয়েছেন, হাওড়ায় উন্নতমানের সাইকেল তৈরির কারখানা গড়ার জন্য জমি বরাদ্দ করা হবে। আগের সরকারের বিরুদ্ধে নিম্নমানের সাইকেল কেনার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। তবে সেটি মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিযোগ; এই ঘোষণার সঙ্গে অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাহিদার সঙ্গে রাজ্যের কারখানাগুলির যোগসূত্র তৈরি হতে পারে।
‘সবুজ সাথী’র সূচনা হয়েছিল ২০১৫–১৬ সালে। সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল এবং মাদ্রাসার নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের সাইকেল দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে প্রকল্পটি চালু হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব যেন পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কারণ না হয়। বিশেষত আর্থিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের ছেলেমেয়েদের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষায় ধরে রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। ছাত্রীদের চলাচলের স্বাধীনতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানোও ছিল প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। পরিবেশবান্ধব যাতায়াতকে উৎসাহ দেওয়ার বিষয়টিও প্রকল্পের মূল ভাবনায় ছিল। ফলে সাইকেল বিতরণকে শিক্ষার সুযোগ এবং সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছিল।
সেই পটভূমিতে অষ্টম শ্রেণিকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তের তাৎপর্য রয়েছে। একজন পড়ুয়া আগের তুলনায় এক বছর আগে যাতায়াতের এই সুবিধা পাবে। গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যালয়ে পৌঁছতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয় যাদের, তাদের জন্য সাইকেল দৈনন্দিন সময় ও যাতায়াতের খরচ বাঁচানোর উপায় হতে পারে। তবে অষ্টম শ্রেণিতে সম্প্রসারণের বাস্তব ফল বুঝতে বিতরণের সময়সূচি, প্রাপকদের তালিকা এবং নিয়মিত ব্যবহারের তথ্য প্রয়োজন হবে।
একই অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়শিক্ষার আরও কয়েকটি বিষয় নিয়েও বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। স্কুলের পোশাকের রং ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ই ঠিক করবে বলে তিনি জানান। সরকারের নজর থাকবে পোশাকের মানের দিকে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ভবন, খেলার মাঠ, গ্রন্থাগার ও পরীক্ষাগারের পরিকাঠামো উন্নয়নের কথাও বলেন তিনি। ফলে সাইকেল বিতরণের অনুষ্ঠানটি শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনা তুলে ধরার মঞ্চ হয়ে ওঠে।
পড়ুয়াদের মোবাইল ব্যবহারের প্রসঙ্গও ওঠে। শুভেন্দু জানান, একাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের মোবাইল কেনার জন্য আর্থিক সহায়তার বদলে পড়াশোনার উপযোগী ট্যাবলেট দেওয়ার ব্যবস্থা বিবেচনা করছে সরকার। প্রয়োজন হলে বরাদ্দ বাড়ানোর কথাও বলেছেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা দফতরকে ভাবনাচিন্তা করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, এই অংশটি এখনও বিবেচনাধীন প্রস্তাব; সাইকেল প্রকল্পের ঘোষিত সম্প্রসারণের সঙ্গে একে একই পর্যায়ের কার্যকর সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না।
নতুন নামের প্রকল্পে তাই প্রধান পরিবর্তন সুবিধা পাওয়ার বয়স এগিয়ে আনা এবং গুণমান উন্নয়নের সরকারি প্রতিশ্রুতি। নাম, প্রতীক ও রঙের পরিবর্তনের পাশাপাশি পড়ুয়াদের কাছে সময়মতো ব্যবহারযোগ্য সাইকেল পৌঁছনোই হবে বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। স্কুলে যাতায়াত সহজ করা এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহায়তা করার পুরনো উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে, নতুন ব্যবস্থার মূল্যায়নেও সেই প্রশ্নটি কেন্দ্রে থাকবে।