বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতার দুর্গাপুজোর আনন্দে নেমে এল শোকের ছায়া। শনিবার, ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোমণ্ডপে ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে অন্তত ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত অন্তত ৩৫ জন। প্রথম দফার প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা ১৮ বলা হলেও রবিবার সকালের হালনাগাদ খবরে তা বেড়ে ১৯ হয়েছে। নিহতদের মধ্যে মহিলা ও শিশুও রয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুজোর ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

কলকাতা পুলিশের বিবৃতি অনুযায়ী, গিরিশ পার্ক থানা এলাকার সারদা পার্ক বা চোরবাগানের মণ্ডপের বেরোনোর দরজার কাছে সন্ধ্যা প্রায় ৭টা ৪০ মিনিটে বিপর্যয় ঘটে। তখন বৃষ্টি হচ্ছিল এবং মণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রবল ভিড় ছিল। আহতদের উদ্ধার করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ, দমকল, বিপর্যয় মোকাবিলা দল এবং চিকিৎসাকর্মীদের সঙ্গে অ্যাম্বুল্যান্স পাঠানো হয়। পরে দর্শনার্থীদের জন্য মণ্ডপ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে একাধিক সম্ভাব্য কারণ। মণ্ডপের আশপাশের রাস্তা সরু; কোথাও পাশাপাশি তিন থেকে চার জনের বেশি হাঁটা কঠিন। তার মধ্যেই বৃষ্টি নামায় বাইরে অপেক্ষমাণ দর্শনার্থীদের অনেকে আশ্রয়ের জন্য মণ্ডপের দিকে এগোতে থাকেন। ভেতরে থাকা মানুষ এবং বাইরে থেকে আসা জনতার চাপ কীভাবে সামলানো হচ্ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়েরা। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

আয়োজকদের একটি মাইকঘোষণার পর পরিস্থিতির অবনতি হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ভিড় নিয়ন্ত্রণ না হলে মণ্ডপ ভেঙে পড়তে পারে, এমন ঘোষণায় আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। তবে ঘোষণার সঠিক বক্তব্য, ঘটনার ধারাবাহিকতা এবং মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ তখনও তদন্তাধীন। ফলে বৃষ্টি, ভিড় কিংবা ঘোষণার কোনও একটিকেই বিপর্যয়ের চূড়ান্ত কারণ বলে প্রতিষ্ঠিত করা যাচ্ছে না।

মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, পুজোর উদ্যোক্তা এবং ভিড় সামলানোর জন্য নিয়োগ করা বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীদের আটক করেছে পুলিশ। সংবাদমাধ্যমের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, আটক হয়েছেন মোট ১২ জন। সিসিটিভির ফুটেজ পরীক্ষা করে আয়োজক, পুলিশ কিংবা নিরাপত্তাকর্মী—কার কোথায় দায়িত্ব পালনে ঘাটতি ছিল, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। ঘটনাস্থলে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, স্পেশাল টাস্ক ফোর্স এবং দমকলের দল তদন্তের কাজে যুক্ত হয়েছে।

দুর্ঘটনার পরে মুখ্যমন্ত্রী ও মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান। আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানোই তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে গুরুতর আহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদনে পার্থক্য রয়েছে। হাসপাতাল চত্বরে স্বজনদের খোঁজে উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। দুর্ঘটনা সম্পর্কে তথ্য দিতে রাজ্য সরকার টোল ফ্রি হেল্পলাইন চালু করেছে। স্বজনদের খোঁজ এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যের জন্য ১৮০০-৩৪৫-৫৬৭৮ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

মৃতদের মধ্যে হুগলির বৈদ্যবাটীর বাসিন্দা, বেসরকারি হাসপাতালের নার্স শ্রীপর্ণা পোদ্দারও রয়েছেন বলে জানা গেছে। ছুটির দিনে বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন তিনি। তাঁর পরিবারের প্রশ্ন, এত জনপ্রিয় পুজোয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা যথাযথ ছিল না কেন? একই ঘটনায় প্রাণ হারান পরিবারের সঙ্গে পুজো দেখতে আসা কল্পনা যাদব। উৎসবের সন্ধ্যা এভাবেই একাধিক পরিবারের কাছে স্বজন হারানোর রাতে বদলে যায়।

রাজ্য সরকারের তরফে প্রত্যেক মৃতের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা এবং পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি দেওয়ার ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। আহতদের জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা করে সাহায্যের কথাও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বড় পুজোমণ্ডপগুলির নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আয়োজকদের সঙ্গে পুলিশের সমন্বয় বাড়ানো এবং প্রবেশ ও বেরোনোর পথে ত্রুটি থাকলে দ্রুত সংশোধনের উপর জোর দিয়েছে প্রশাসন।

রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এই প্রাণহানিতে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে প্রত্যেক মৃতের নিকটাত্মীয়কে দু’লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে সাহায্যের ঘোষণা করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। দুর্ঘটনার জেরে রবিবার পশ্চিমবঙ্গে তাঁর নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত করে হাসপাতালে আহতদের দেখতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও শোকপ্রকাশ করেছেন এবং আহতদের সুস্থতা কামনা করেছেন। বিপর্যয়ের মধ্যে চিকিৎসা, উদ্ধার এবং পরিবারগুলিকে সহায়তার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

চোরবাগানের ঘটনার পর কলকাতার আরও কয়েকটি বড় পুজোয় দর্শনার্থীদের প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তালা প্রত্যয়, আলিপুর সর্বজনীন, চেতলা অগ্রণী এবং বালিগঞ্জ সর্বজনীনের মতো ভিড়টানা পুজো সেই তালিকায় রয়েছে। সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারেও প্রবেশ সীমিত করা হয়। বিধাননগরের কয়েকটি বড় পুজোতেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, অতিরিক্ত ভিড়ের খবর পাওয়া গেলেই সাময়িকভাবে প্রবেশ বন্ধ করতে বলা হয়েছে।

এই সাময়িক বিধিনিষেধের পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে প্রশাসনিক পর্যালোচনার কথাও জানানো হয়েছে। কলকাতায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার দুর্গাপুজোর আয়োজনের মধ্যে বিপুল দর্শনার্থীর চলাচল সামলানোর প্রশ্নটি ফের সামনে এল। বিশেষত বৃষ্টি নামলে মানুষ কোথায় আশ্রয় নেবেন, মণ্ডপের ভেতরের দর্শনার্থীরা কীভাবে বেরোবেন এবং বাইরে অপেক্ষারত জনতাকে কীভাবে আটকে রাখা হবে—চোরবাগানের ঘটনা সেই ব্যবস্থাগুলির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রেখে গেল।

তদন্তের ফলেই স্পষ্ট হবে কোথায় কী ব্যর্থতা ঘটেছিল এবং তার দায় কার। আপাতত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির কাছে সবচেয়ে জরুরি আহতদের চিকিৎসা, স্বজনদের নির্ভরযোগ্য খবর এবং প্রশাসনিক সহায়তা। পুজোর সৌন্দর্য, জনপ্রিয়তা ও বিপুল আয়োজনের সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনটাই এই মর্মান্তিক ঘটনা সামনে এনে দিয়েছে।