বাংলাস্ফিয়ার: চুঁচুড়ার পুরনো বাড়িগুলিতে দুর্গাপুজো দেখতে গেলে দেবীর পরিচিত মূর্তিও নতুন করে চিনতে হয়। কোথাও তিনি শিবের কোলে বসা ঘরের মেয়ে, কোথাও মহিষাসুরমর্দিনী হয়েও বহন করছেন বৈষ্ণব পরিচয়ের চিহ্ন। হুগলির এই ঐতিহাসিক শহরের ঠাকুরদালানগুলিতে তাই পুজোর সঙ্গে মিশে থাকে পারিবারিক স্মৃতি, ধর্মাচারের বৈচিত্র্য এবং বহু সংস্কৃতির সহাবস্থানের ইতিহাস। প্রতিমার গড়ন থেকে খাদ্যবিধি, প্রতিটি বাড়ির নিজস্ব রীতি সেই বৈচিত্র্যকে দৃশ্যমান করে।

এই শহরের অতীতের সঙ্গে ওলন্দাজ বাণিজ্যের গভীর যোগ রয়েছে। ১৬৩৫ সালে এখানে বাণিজ্যবসতি গড়ে তোলে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। মসলিন, নুন, আফিম ও মশলার বাণিজ্য চলত এই কেন্দ্র থেকে। ১৭৪০ সালে তাদের বাণিজ্যকুঠি দুর্গে রূপান্তরিত হয়; দু’বছর পরে তার নাম হয় ফোর্ট গুস্তাভাস। নদীপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই যোগাযোগ চুঁচুড়াকে বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র করে তুলেছিল। সেই নগরজীবনের উত্তরাধিকার বহন করে আজকের পুরনো পাড়া ও বাড়িগুলি। ওলন্দাজদের পাশাপাশি ইংরেজ, আর্মেনীয় ও পারস্যের বণিক, মুঘল এবং নবাবি অভিজাতদের উপস্থিতিও শহরের সামাজিক পরিবেশকে সমৃদ্ধ করেছিল। স্থানীয় বাঙালি পরিবারগুলির উৎসব সেই বহমান নগরসংস্কৃতির মধ্যেই নিজস্ব রূপ নিয়ে টিকে থেকেছে।

কামারপাড়ার অধ্যবাটিতে বদনচন্দ্র আঢ্যের প্রবর্তিত পুজো এবার ২৯২ বছরে পড়েছে। এখানে দুর্গা আসেন হরগৌরী রূপে। শিবের কোলে বসা দেবীর দুটি হাত; মহিষাসুরের উপস্থিতি নেই। পরিবারের কাছে এই আরাধনা উমার ঘরে ফেরার উৎসব। একই পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্ম এখনও এক ছাদের নীচে থাকেন। ফলে পুজোর আয়োজনের সঙ্গে তাঁদের দৈনন্দিন পারিবারিক বন্ধনও জড়িয়ে রয়েছে।

অধ্যবাটির আচারেও বৈষ্ণব ভাবনার ছাপ স্পষ্ট। মহালয়া থেকে দশমীর ঘট বিসর্জন পর্যন্ত পরিবারের সদস্যেরা নিরামিষ আহার করেন। রথযাত্রায় কাঠামোপুজোর মধ্য দিয়ে প্রতিমা তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়। বংশপরম্পরায় যুক্ত থাকেন মৃৎশিল্পী ও পুরোহিতের পরিবার। অষ্টমীতে ধুনো পোড়ানো এবং নবমীতে কুমারীপুজোর রীতিও রয়েছে। সোনা ও রুপোর অলঙ্কারে সাজানো হয় দেবীকে। এই বাড়িতে দুর্গার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে কার্তিকেরও পুজো হয়।

বড় শীলবাড়ির স্থাপত্যে ধরা পড়ে চুঁচুড়ার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের আরেক দিক। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নীলাম্বর শীল ১৭৬৩ সালে ভারতীয় ও ওলন্দাজ স্থাপত্যরীতির মিশেলে বাড়িটি তৈরি করেন। তাঁর পুত্র মদনমোহনের তত্ত্বাবধানে ১৮০৩ সালে গড়ে ওঠে ঠাকুরদালান। এখানে একচালা প্রতিমায় দেবী হরগৌরী; হাতে অস্ত্র নেই। উল্টোরথে কাঠামোপুজো হয় এবং বাড়ির দালানেই তৈরি হয় প্রতিমা। পুরনো উঠোন আর দালান আজও এই পারিবারিক উৎসবের প্রধান পরিসর।

পরিবারের সদস্য রজত শীলের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের দুর্গাপুজোর বয়স প্রায় তিরিশ বছর হলেও কার্তিকপুজো চলছে ২২৪ বছর ধরে। চালচিত্রে ফুটে ওঠে শিবের সঙ্গে দুর্গার বিবাহ ও পারিবারিক জীবন। পুজোর সময়ে আমিষ বর্জন করা হয়। তবে এই খাদ্যবিধি পরিবারের সদস্যদের সারা বছরের ব্যক্তিগত জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে না।

হালদারবাড়িতে আবার বৈষ্ণব বিশ্বাসের মধ্যেই মহিষাসুরমর্দিনী রূপের আরাধনা হয়। পরিবারের সদস্য ও বর্তমান পুরোহিত দেবজ্যোতি হালদারের দাবি, তাঁদের পুজোর বয়স সাড়ে চারশো বছরের বেশি। এখানে দেবীর তৃতীয় নয়নের নীচে রয়েছে সাদা চিহ্ন, সিংহের রংও সাদা। এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে পরিবার নিজেদের বৈষ্ণব পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। ফলে অসুরবধের প্রচলিত মূর্তিও এখানে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে।

হালদারবাড়িতে নবমীতে পশুবলির পরিবর্তে চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। একই দিনে হয় কুমারীপুজো। দশমীতে বাড়িতে রান্না বন্ধ থাকে, আর সংলগ্ন পারিবারিক ঘাটেই প্রতিমার বিসর্জন হয়। তিন শরিকের এই পুজোর আয়োজন এখনও একত্রে করেন পরিবারের সদস্যেরা।

এই বাড়িগুলির পুজো পাশাপাশি দেখলে বোঝা যায়, দুর্গার আরাধনাকে একটি মাত্র প্রতিমার ছাঁচে ধরা যায় না। কোথাও দাম্পত্যের কোমল ছবি, কোথাও শক্তির প্রকাশ, কোথাও কঠোর খাদ্যাচার। চুঁচুড়ার উৎসবের আকর্ষণ এই বহুত্বেই—একই দেবীকে ঘিরে নানা পরিবারের নানা স্মৃতি, অথচ প্রত্যেকের কাছেই তাঁর আগমন ঘরে ফেরার আনন্দ।