বাংলাস্ফিয়ার: বাল্যবিবাহ রুখতে রাজ্যজুড়ে কঠোর অভিযানের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর নবান্নে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরে তিনি জানান, বাড়ি বাড়ি গিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে এবং অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনা চিহ্নিত করবে প্রশাসন। বাল্যবিবাহে যুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার, কারাদণ্ডের পাশাপাশি সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা বন্ধ করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

শুভেন্দুর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু নাবালিকাকে বিয়ে করা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েই থামবে না সরকার। এই ধরনের বিয়ের আয়োজন, পরিচালনা কিংবা সহায়তায় যাঁরা যুক্ত থাকবেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনি পদক্ষেপ করা হবে। বিয়ে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত পুরোহিত ও কাজিদের পাশাপাশি বর এবং কনের পরিবারের সংশ্লিষ্ট সদস্যদেরও অভিযানের আওতায় আনার কথা বলেছেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে হয়েছে বলে চিহ্নিত মহিলাদের স্বামীদের কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হবে। তাঁদের স্ত্রীর বয়সের বৈধ প্রমাণপত্র পেশ করতে হবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন, ২০০৬ এবং শিশুদের যৌন অপরাধ থেকে সুরক্ষার পকসো আইন প্রয়োগের কথা বলেছেন শুভেন্দু। তাঁর ঘোষণা, কোনও ধর্মের ক্ষেত্রেই এই অভিযান শিথিল হবে না।

এই সিদ্ধান্তের পটভূমিতে স্বাস্থ্য দফতরের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে রাজ্যের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে প্রায় ৬০ হাজার অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে সন্তান প্রসব করেছে। অর্থাৎ, সংখ্যাটি ওই সময়ের নথিভুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের; একে একই সময়ে সংঘটিত বাল্যবিবাহের মোট সংখ্যা বলে ধরে নেওয়া যায় না।

জেলাভিত্তিক হিসাবেও উদ্বেগজনক ছবি তুলে ধরেছেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদে এই সময়ে ১২ হাজার ৮৪৭ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সন্তান প্রসবের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় সংখ্যাটি ৪ হাজার ১৭৮। দু’টি জেলার এই পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি রাজ্যজুড়ে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। প্রকাশিত সংখ্যাগুলি মুখ্যমন্ত্রীর উদ্ধৃত সরকারি তথ্য হিসেবেই সামনে এসেছে।

বাল্যবিবাহ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় মাতৃত্বের জন্য পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারকে দায়ী করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকার সংশ্লিষ্ট তথ্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠায়নি। তিনি আরও দাবি করেন, বাল্যবিবাহ ও আঠারো বছরের আগে সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ দেশের শীর্ষে রয়েছে। তবে এই অবস্থান মুখ্যমন্ত্রীর দাবি; তাঁর বক্তব্যে উল্লিখিত পরিসংখ্যান থেকে একা সর্বভারতীয় তুলনার সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।

আঠারো বছর হওয়ার আগে কোনও বিবাহিত মেয়ে মা হলে তার স্বামীর বিরুদ্ধে পকসো আইনে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করার কথাও জানিয়েছেন শুভেন্দু। অভিযুক্তদের সরকারি সুযোগসুবিধা ও সামাজিক ভাতা থেকে বঞ্চিত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। বাল্যবিবাহের ব্যাপকতা বোঝাতে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, সংশ্লিষ্ট সকলকে ধরলে রাজ্যের জেলগুলিতে জায়গার অভাব দেখা দিতে পারে। তবু গ্রেফতারি এবং আইনি পদক্ষেপের পথে এগোনোর কথাই বলেছেন তিনি।

আগামী দিনে এই বিষয়ে আরও বড় প্রচারাভিযানের কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর ঘোষণায় প্রশাসনিক অনুসন্ধান, বয়সের নথি পরীক্ষা, ফৌজদারি মামলা এবং সরকারি সুবিধা প্রত্যাহার—এই কয়েকটি পদক্ষেপ একসঙ্গে উঠে এসেছে। ফলে বিয়ে চিহ্নিত করার পরে কার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেটি অভিযানের বাস্তব প্রয়োগ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

তবে সরকারি সুবিধা বন্ধের ঘোষণা কী ভাবে কার্যকর হবে, তার বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলিতে নেই। কোন কোন প্রকল্প এর আওতায় আসবে, অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং নির্যাতিত নাবালিকার প্রাপ্য সুবিধার মধ্যে কী ভাবে পার্থক্য করা হবে, তাও স্পষ্ট নয়। বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েটি ও তার সন্তানের সহায়তা যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, সেই প্রশ্ন তাই ঘোষণাটির বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বয়স যাচাইয়ের নথি, অভিযোগের ভিত্তি এবং সুবিধা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশাসনিক নির্দেশ সামনে এলে ঘোষণার পরিধি আরও পরিষ্কার হবে। আপাতত মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যেই প্রস্তাবিত অভিযানের প্রাথমিক কাঠামো জানা গিয়েছে।