বাংলাস্ফিয়ারঃ সুন্দরবনের নদীপথ দিয়ে বাংলাদেশ থেকে মাদক পাচার এবং বেআইনি অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার, ২৪ অক্টোবর দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপে প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠক ও জনপরিষেবা প্রদান কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে তিনি এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সফরে কাকদ্বীপকে পৃথক জেলা করা এবং গঙ্গাসাগর মেলাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
কাকদ্বীপের অনুষ্ঠানে শুভেন্দুর অভিযোগ, সীমান্তের ওপার থেকে নদীপথে গাঁজা ও হেরোইন আসছে। মাদক পাচার বন্ধ করতে সরকার কাজ করছে জানিয়ে বাসিন্দাদের ঐক্যবদ্ধভাবে নজর রাখার আবেদন জানান তিনি। অনুপ্রবেশের প্রসঙ্গ তুলে এলাকার জনবিন্যাস বদলে গিয়েছে বলেও দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে মাদক পাচারের পরিমাণ কিংবা জনবিন্যাস পরিবর্তনের সমর্থনে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানের উল্লেখ নেই প্রকাশিত প্রতিবেদনে।
প্রশাসনিক পুনর্গঠন নিয়ে শুভেন্দু জানান, কাকদ্বীপকে আলাদা জেলা করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগতে পারে। প্রয়োজনে দু’বছর পরেও সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন তিনি। বর্তমানে কাকদ্বীপ মহকুমার অন্তর্ভুক্ত কাকদ্বীপ, নামখানা, পাথরপ্রতিমা ও সাগর—এই চারটি ব্লক। সুন্দরবনের দ্বীপগুলির মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তুলে অঞ্চলটিকে উন্নয়নের আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। এই ঘোষণাটি মুখ্যমন্ত্রী করেছেন কাকদ্বীপ স্টেডিয়ামে সুন্দরবন বিষয়ক দফতরের আয়োজিত বিশেষ জনপরিষেবা প্রদান কর্মসূচির মঞ্চে।
আগামী জানুয়ারির গঙ্গাসাগর মেলার প্রস্তুতি ছিল প্রশাসনিক বৈঠকের অন্যতম প্রধান বিষয়। শুভেন্দু জানান, মেলাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই সরকারের লক্ষ্য। রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পরে এটিই বিজেপি সরকারের পরিচালনায় প্রথম গঙ্গাসাগর মেলা হতে চলেছে। প্রস্তুতির অগ্রগতি দেখতে ফের সাগরে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে মুড়িগঙ্গা সেতুর জন্য ২০২৯ সালের সময়সীমা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, ওই বছরের মধ্যে সেতুর উদ্বোধন হবে। পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকার প্রকল্পটি নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সুন্দরবনের উন্নয়নে ১,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানিয়ে শুভেন্দু দাবি করেন, আগের সরকার বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার করেনি।
২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও মাত্র ২০০ কোটি টাকার কাজ হয়েছিল বলে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর। সেই ব্যয়ের বড় অংশেও দুর্নীতি হয়েছে বলে তাঁর দাবি। সুন্দরবনের নদীবাঁধ মেরামতের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও জানিয়েছেন তিনি। উন্নয়ন ও অর্থব্যয়ের এই অভিযোগগুলি মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য হিসেবেই প্রকাশিত হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রথম দফায় ৫৫৩টি কাজের দরপত্র এবং দ্বিতীয় দফায় ২,৬৪৯টি প্রকল্পের কথা জানিয়েছেন শুভেন্দু। মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল জানিয়েছেন, সুন্দরবন বিষয়ক দফতরের সচিবালয় কাকদ্বীপে গড়ে তোলা হবে। কলকাতায় থাকবে শাখা কার্যালয়। সচিবালয়ের জন্য জমির ব্যবস্থা করবেন জেলাশাসক; দফতরের আধিকারিকেরা কাকদ্বীপ থেকেই কাজ করবেন।
পাশাপাশি পাঁচটি কংক্রিটের জেটি এবং একটি রোরো-কাম-এলসিটি জেটি নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। পর্যটনের পরিবেশগত প্রভাব কমাতে বৈদ্যুতিক নৌকার জন্য ১০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে বলেও তাঁর বক্তব্য। মৎস্যচাষে প্রশিক্ষণ এবং কৃষকদের ব্যাটারিচালিত স্প্রেয়ার দেওয়ার পরিকল্পনাও ঘোষণা করেন তিনি। তিনি জানান, ১,৪০৬ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১,১৬৯টি সড়ক প্রকল্পের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ১১০টি কালভার্ট তৈরি করা হবে। মৎস্যক্ষেত্রে ১৭ কোটি টাকা রাখা হয়েছে; কাঁকড়া মোটাতাজা করার প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন ১,৯৩১ জন।
অনুপ্রবেশের অভিযোগের পাশাপাশি শরণার্থীদের নাগরিকত্বের প্রসঙ্গও তুলেছেন শুভেন্দু। বাংলাদেশ থেকে জীবন ও ধর্ম রক্ষার জন্য আশ্রয় নেওয়া মানুষকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে দেখা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতায় আবেদনকারীদের শংসাপত্র দ্রুত দেওয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে বলেন মুখ্যমন্ত্রী। দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক ও কাকদ্বীপের মহকুমাশাসককে বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেন। গঙ্গাসাগর মেলার প্রস্তুতি দেখতে জানুয়ারিতে তাঁর পরবর্তী সফরের আগেই এই কাজ এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।