বাংলাস্ফিয়ারঃ পানীয় জলের সংকট, বন্ধ হস্টেলের মেস। তবু ক্যাম্পাস ছাড়ার নির্দেশ মানতে এখনও নারাজ কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের আন্দোলনকারী পড়ুয়ারা। উপাচার্য সন্তোষ আজমেরার পদত্যাগ এবং নিরাপত্তার দাবিতে তাঁদের অবস্থান অব্যাহত। প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলা অচলাবস্থায় পঠনপাঠনের পাশাপাশি বিপর্যস্ত হয়েছে আবাসিকদের দৈনন্দিন জীবন।

পড়ুয়াদের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে কলকাতা পুরসভার জলের ট্যাঙ্কার আসেনি; জল পরিশোধনের ব্যবস্থাও কাজ করছে না। প্রশাসনিক ভবন বন্ধ থাকায় সেখানকার সর্বক্ষণ ব্যবহারযোগ্য শৌচাগারেও ঢোকা যাচ্ছে না। ছাত্র সুদীপ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, ক্যাম্পাসে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ জন রয়েছেন। বাইরে থেকে ৫০–৬০ জনের খাবার কিনে ভাগ করে খেতে হচ্ছে। কেউ ঘরেই রান্না করছেন। মেসে ৬০ টাকায় খাবার মিলত; সেটি বন্ধ হওয়ায় খরচ বেড়েছে।

খাবার পৌঁছে দেওয়ার কর্মীদের ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ। ফলে খাবার সংগ্রহ করতে প্রধান ফটকে যেতে হচ্ছে পড়ুয়াদের, যেখানে তাঁরা নিরাপত্তাহীন বোধ করছেন। উৎসবের সময়ে যাতায়াতের বাড়তি খরচ এবং দূরের বাড়িতে ফেরার অসুবিধার কথাও জানিয়েছেন অনেকে। জলসংকটের অভিযোগ নিয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ওই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। পড়ুয়াদের বক্তব্য, অনেকেই খণ্ডকালীন কাজ করে নিজের দৈনন্দিন খরচ চালান। প্রতিদিন বাইরের খাবার কেনা তাঁদের পক্ষে কঠিন। অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করার আগে মূল অভিযোগগুলি মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল বলে তাঁদের মত।

কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ফিল্ম এবং ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ডিজিটাল মিডিয়া বিভাগের নিয়মিত শিক্ষাক্রম ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত। মেসও ওই দিন পর্যন্ত অথবা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। উৎসব এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনের কথা জানিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্যাম্পাস ছাড়তে বলা হয়েছিল। তবে স্বল্পমেয়াদি আইটিইসি প্রশিক্ষণ নির্দিষ্ট নির্দেশ মেনে চালু রাখার কথা জানানো হয়।

এর মধ্যেই উপাচার্য ও কর্মীদের হেনস্থা, ভাঙচুর এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ছয় পড়ুয়াকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ছাত্র সংসদ অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল। তাদের আরও অভিযোগ, পূর্বসমঝোতা অনুযায়ী আগাম না জানিয়েই প্রশাসনিক ভবনে সিসিটিভি বসানো হচ্ছিল। সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদকে ঘিরে বিরোধ তীব্র হয়। বহিষ্কারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের কথাও জানিয়েছেন ছাত্র প্রতিনিধিরা। তাঁদের দাবি, প্রতিবাদ দমাতেই পুলিশ ডাকা হয়েছে; প্রশাসনের অভিযোগগুলির সঙ্গে আন্দোলনের প্রকৃত চরিত্রের মিল নেই। ছাত্র সংসদের দাবি, ক্যামেরা বসানোর জায়গা নির্ধারণে তাদের যুক্ত রাখার কথা ছিল। উপাচার্যও নতুন ক্যামেরা বসানোর তিন দিন আগে জানানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে উপাচার্য আজমেরা জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে প্রশাসন সম্মান করে। তবে ছুটি ঘোষণা হওয়ায় পড়ুয়াদের বাড়ি যাওয়া উচিত ছিল। তাঁর বক্তব্য, পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হস্টেল খালি করা প্রয়োজন; নির্দেশ অমান্য করে অবস্থান করলে প্রতিষ্ঠানের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। কর্তৃপক্ষের তরফে আন্দোলনের বিবরণকে একপেশেভাবে না দেখার আবেদনও জানানো হয়েছে।

পড়ুয়াদের দাবি, সেপ্টেম্বরের শেষ এবং অক্টোবরের গোড়ার অশান্তির পরে তাঁদের নিরাপত্তা ও আস্থার সংকট কাটেনি। ছাত্রী স্নেহা মালাকার অভিযোগ করেছেন, ওয়াইফাই অচল, মেস ও ক্যান্টিন বন্ধ; অভিভাবকদের ইমেল পাঠিয়েও ক্যাম্পাস ছাড়ার চাপ দেওয়া হচ্ছে। প্রাক্তনীদের একাংশের মতে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির মধ্যে যোগাযোগ ভেঙে পড়েছে। হঠাৎ হস্টেল ছাড়ার নির্দেশ পড়ুয়াদের অসহায় করেছে, আস্থা ফেরাতে সময় লাগবে।

আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন কানজয়ী পরিচালক পায়েল কাপাডিয়া। তাঁর বক্তব্য, পড়ুয়াদের নিরাপত্তার অভিযোগের নিষ্পত্তি না করে তাঁদের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা উদ্বেগজনক। কাপাডিয়া সংশ্লিষ্ট হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, প্রশাসনকে জবাবদিহি করতে বলায় পড়ুয়ারাই কেন শাস্তির মুখে পড়বেন? প্রশাসনের প্রতিনিধিরা অবশ্য পাল্টা দাবি করেছেন, নিরাপত্তা বাড়ানোর পরেও আপত্তি উঠছে এবং আন্দোলনকারীদের দাবির অবস্থান বদলাচ্ছে। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যেই ছাত্ররা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান চলবে।