বাংলাস্ফিয়ারঃ আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের জামিন নিয়ে ফের প্রশ্ন তুললেন নিহত চিকিৎসকের বাবা-মা। শনিবার, ২৪ অক্টোবর তাঁরা মেয়ের মৃত্যুর তদন্তে দায় নির্ধারণের দাবি জানান। একই দিনে ‘ভয়েস অব অভয়া’ ও ‘ভয়েস অব উইমেন’ সিবিআই দফতর অভিযানের ডাক দিয়েছে। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ১২ নভেম্বর আর জি কর হাসপাতাল থেকে মিছিল শুরু হবে।

নিহত চিকিৎসকের মায়ের প্রশ্ন, মৃত্যুর আগের কয়েক ঘণ্টায় মেয়ের সঙ্গে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের ভূমিকা যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি কেন? তাঁর দাবি, সেই সময়ে দ্রুত পদক্ষেপ করা হলে এবং প্রমাণ নষ্ট হতে না দেওয়া হলে তদন্ত অন্যভাবে এগোতে পারত। কার নির্দেশে প্রমাণ লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তা খুঁজে বের করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্যসচিব এন এস নিগম এবং সন্দীপ ঘোষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতের মা। এগুলি তাঁর অভিযোগ। নিহতের বাবা মনে করেন, সন্দীপের যাবজ্জীবন সাজা হওয়া উচিত ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বিচার পাওয়ার আশা ছাড়ছেন না তাঁরা।

সন্দীপের সাম্প্রতিক জামিন অবশ্য হাসপাতালের আর্থিক দুর্নীতির মামলায়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ ও বিচারপতি পি বি বরালের বেঞ্চ দীর্ঘ কারাবাস এবং বিচারের ধীরগতি বিবেচনা করেছে। আদালতের নজরে এসেছে, তিনি দু’বছরের বেশি হেফাজতে রয়েছেন, অথচ ১৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র সাতজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। কলকাতা হাই কোর্টের জামিন প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি শীর্ষ আদালতে গিয়েছিলেন। জামিন মঞ্জুর হওয়া মামলায় অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়া নয়।

এই মামলার সঙ্গে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় প্রমাণ লোপাটের অভিযোগের তদন্তের পার্থক্যও রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চার্জশিট জমা না পড়ায় প্রমাণ লোপাটের মামলায় সন্দীপ ও টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মণ্ডল জামিন পেয়েছিলেন। তবে আর্থিক দুর্নীতির মামলার জন্য সন্দীপকে বন্দি থাকতে হয়েছিল। অন্যদিকে, চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় দোষী সঞ্জয় রায়কে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

পরিবারের সঙ্গে তদন্তকারী সংস্থার দূরত্বের অভিযোগও নতুন নয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালতে নিহতের বাবা-মা অভিযোগ করেছিলেন, তদন্ত কত দূর এগিয়েছে, তাঁদের জানানো হচ্ছে না। সিবিআই তখন সেই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছিল, প্রমাণ বিকৃতি বা ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল কি না, তার তদন্ত চলছে এবং পরিবারকে অন্ধকারে রাখা হয়নি।

সাম্প্রতিক জামিনের পরেও সিবিআইয়ের কাজ নিয়ে সরব হয়েছিল পরিবার এবং জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অব ডক্টর্স। নিহতের বাবা ধর্ষণ ও খুনের মামলায় সন্দীপের বিরুদ্ধে চার্জশিটের দাবি পুনরায় জানান। তাঁর বক্তব্য, তদন্তকারী সংস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে কাজের জবাবদিহি জরুরি। নিহতের মা সিবিআইকে স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করে বলেছিলেন, তাদের কাজের জন্য তাদেরই উত্তর দিতে হবে।

শনিবারের কর্মসূচি ঘোষণায় নতুন করে তদন্তের দাবিও উঠেছে। সার্ভিস ডক্টর্স ফোরাম, মেডিক্যাল সার্ভিস সেন্টার এবং নার্সেস ইউনিটি-সহ ৬৫টি সংগঠনের যৌথ মঞ্চ জানিয়েছে, বহু প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। মঞ্চের সম্পাদক বিপ্লব চন্দের অভিযোগ, অনেককে এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। চিকিৎসক অনিকেত মাহাতোও সম্পূরক চার্জশিট জমা দেওয়ার দাবিতে সিবিআইয়ের উপর চাপ বজায় রাখার কথা জানিয়েছেন। বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অবস্থান জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। ফলে জামিনের বিরোধিতার পাশাপাশি তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিচ্ছে চিকিৎসক ও নাগরিক সংগঠনগুলি।

আয়োজকেরা বিশেষ করে মহিলাদের মিছিলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, হতাশ হয়ে সরে গেলে চলবে না; উপলব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার দাবিতে নাগরিকদের সক্রিয় থাকতে হবে। মেয়ের মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ বিচার চেয়ে পরিবারের লড়াইয়ের পাশে থাকার ডাকই দেওয়া হয়েছে এই কর্মসূচিতে।