বাংলাস্ফিয়ার: উত্তরাখণ্ডে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আবেদন ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে সমতলের চার জেলা। রাজ্যের তেরো জেলার মধ্যে উধম সিং নগর, হরিদ্বার, দেরাদুন এবং নৈনিতাল থেকেই এসেছে মোট ফর্ম-৭ আবেদনের ৮৫ শতাংশের বেশি। কেন এমন কেন্দ্রীভবন? জনসংখ্যা ও মানুষের স্থানান্তরকে কারণ বলছে বিজেপি। কংগ্রেসের অভিযোগ, বিরোধী দলের সমর্থক জনগোষ্ঠীকে বেছে নিশানা করা হচ্ছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সংগ্রহ করা সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যজুড়ে জমা পড়েছে ১ লক্ষ ৩০ হাজার ৩৮২টি ফর্ম-৭। উধম সিং নগরে ৪৩,৮৭৮টি, হরিদ্বারে ২৯,৩৬৯টি, দেরাদুনে ১৯,৪০২টি এবং নৈনিতালে ১৮,৩০১টি। চার জেলার যোগফল ১ লক্ষ ১০ হাজার ৯৫০। উধম সিং নগর একাই রাজ্যের মোট আবেদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের উৎস। ফলে অনুসন্ধানের প্রধান প্রশ্ন হয়ে উঠেছে এই ভৌগোলিক অসমতা।
পাহাড়ি জেলাগুলির সঙ্গে ফারাকও বড়। পৌরি গাড়োয়ালে আবেদন ৫,৪২৪টি, পিথোরাগড়ে ৩,০৪৪টি এবং আলমোড়ায় ২,৯৯৯টি। বাগেশ্বরে মাত্র ৬১৮টি, রুদ্রপ্রয়াগে ৩৮২টি। তবে শুধু মোট সংখ্যার তুলনা দিয়ে অনিয়ম প্রমাণ হয় না। সংশ্লিষ্ট জেলার মোট ভোটারের কত শতাংশের বিরুদ্ধে আপত্তি উঠেছে, সেই অনুপাত জানলে তুলনাটি আরও অর্থবহ হবে।
রাজ্যের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী তথা বিজেপি বিধায়ক খাজান দাসের ব্যাখ্যা, এই চার জেলা রাজ্যের বড় জনবসতি ও মানুষের যাতায়াতের প্রধান কেন্দ্র। এখানে অন্য জায়গা থেকে আসা এবং অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। তাঁর যুক্তি, বাসস্থান বদলালেও আগের ঠিকানার ভোটার তালিকায় নাম থেকে যেতে পারে। সেই কারণেই সংশোধন এবং নাম বাদ দেওয়ার আবেদন বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংখ্যালঘুদের বেছে নিশানা করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, সমস্যার উৎস মানুষের আসা-যাওয়া, ধর্মীয় পরিচয় নয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যা যাচাই করতে আবেদনগুলিতে উল্লেখ করা কারণের পৃথক হিসাব প্রয়োজন। কত ক্ষেত্রে স্থায়ী স্থানান্তর, কত ক্ষেত্রে মৃত্যু, কত ক্ষেত্রে একাধিক জায়গায় নাম থাকার অভিযোগ—সেই বিভাজন ছাড়া সামগ্রিক দাবি পরীক্ষা করা কঠিন।
কংগ্রেসের বক্তব্য ভিন্ন। উত্তরাখণ্ড প্রদেশ কংগ্রেসের প্রবীণ সহসভাপতি সূর্যকান্ত ধাসমার অভিযোগ, মুসলিম, অন্যান্য সংখ্যালঘু, দরিদ্র, তফসিলি জাতি ও জনজাতির মানুষকে লক্ষ্য করা হচ্ছে, কারণ তাঁরা কংগ্রেসের সমর্থনভিত্তি। দল বিশেষ নিবিড় সংশোধনের বিরোধী নয় বলে জানিয়েছেন তিনি; আপত্তি প্রয়োগপদ্ধতি এবং নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য নিয়ে। কমিশন বিজেপির স্বার্থে কাজ করছে বলেও অভিযোগ তাঁর।
নির্বাচন কমিশনের এক আধিকারিক অবশ্য সংখ্যার ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে নিষেধ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এগুলি দাবি ও আপত্তির পর্যায়ে জমা পড়া আবেদনমাত্র। কোনও জেলায় মানুষ কতটা সক্রিয়ভাবে তালিকা পরীক্ষা করছেন, তার উপরেও আবেদনের সংখ্যা নির্ভর করতে পারে। অর্থাৎ, ভৌগোলিক কেন্দ্রীভবনের তথ্য নিশ্চিত হলেও তার কারণ নিয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যাগুলি এখনও পরস্পরবিরোধী।
এখানে আবেদন এবং চূড়ান্ত নাম বাদ দেওয়ার মধ্যে পার্থক্যটি জরুরি। কমিশনের নির্ধারিত ফর্ম-৭ ব্যবহার করা হয় তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে অথবা বিদ্যমান নাম বাদ দেওয়ার অনুরোধ করতে। নাম তোলার জন্য ফর্ম-৬, আর ঠিকানা পরিবর্তন ও তথ্য সংশোধনের জন্য ফর্ম-৮ রয়েছে। কাজেই কোনও এলাকায় ফর্ম-৭ বেশি জমা পড়লেই সেখানে ততজন ভোটার ভোটাধিকার হারিয়েছেন, এমন বলা ভুল।
উত্তরপ্রদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক নবদীপ রিনওয়া ফর্ম-৭ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন, আবেদন পেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাম কাটা যায় না। অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট ভোটারকে বক্তব্য এবং প্রমাণ পেশের সুযোগ দিতে হয়। যাচাইয়ের পরে সিদ্ধান্ত নেন নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক। আপত্তির গ্রহণযোগ্য কারণের মধ্যে মৃত্যু, নাগরিকত্বের অযোগ্যতা অথবা অন্যত্র নাম থাকার বিষয় রয়েছে। তাই প্রতিটি আবেদনের ভিত্তি এবং পরিচয় যাচাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রশাসনিক চাপও বিপুল। ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজ্যের মোট আবেদনের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৪,১৩২টির; বাকি ৮৬,২৫০টি প্রক্রিয়াধীন। উধম সিং নগরেই ঝুলছে ৩৪,৯০৩টি। হরিদ্বারে অনিষ্পন্ন আবেদন ১৭,৫৫৪টি, নৈনিতালে ১১,৪৯৮টি এবং দেরাদুনে ১১,২৬২টি। নিষ্পত্তি হয়েছে মানেই আবেদন মেনে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, এমনও নয়; গৃহীত ও প্রত্যাখ্যাত আবেদনের পৃথক হিসাব প্রয়োজন।
এর আগে ১৪ জুলাই প্রকাশিত খসড়া তালিকায় ভোটার ছিলেন প্রায় ৭১.৩৩ লক্ষ। ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত তালিকায় ছিলেন ৭৯.৫৮ লক্ষ। ব্যবধান প্রায় ৮.২৫ লক্ষ। খসড়ায় আরও ১৯.০৪ লক্ষ ভোটারের নথিতে অসংগতি চিহ্নিত হয়েছিল। এই পূর্ববর্তী সংখ্যাগুলির সঙ্গে বর্তমান ফর্ম-৭ আবেদন যোগ করে মোট নাম বাদ পড়ার হিসাব তৈরি করা ঠিক হবে না।
আরও একটি হিসাব বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। কমিশনের দপ্তর জানিয়েছে, সংশোধন প্রক্রিয়ায় জারি হওয়া প্রায় ২৪.৩০ লক্ষ নোটিসের ৯৯.৯৬ শতাংশের শুনানি শেষ হয়েছে। কিন্তু সেই সাফল্যের হার দিয়ে ফর্ম-৭ নিষ্পত্তির অগ্রগতি বোঝা যাবে না; এগুলি আলাদা হিসাব। একই সময়ে নাম অন্তর্ভুক্তির ১,১৪,৫৭৯টি ফর্ম-৬ এবং সংশোধনের ৩৮,২৪১টি ফর্ম-৮ আবেদনও প্রক্রিয়াধীন ছিল। ফলে প্রশাসনের কাজ শুধু নাম বাদ দেওয়ার আপত্তি মেটানো নয়, তালিকায় যোগ্য মানুষের নাম তোলা ও ভুল তথ্য সংশোধনও। চূড়ান্ত তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা বিচার করতে এই তিন ধরনের আবেদনের ফলাফলই জেলা ধরে একসঙ্গে দেখতে হবে।
দাবি ও আপত্তি নিষ্পত্তির সময়সীমা ৯ সেপ্টেম্বর থেকে বাড়িয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর করা হয়েছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের নতুন দিন ৩ অক্টোবর। বাড়তি সময় মিললেও মূল পরীক্ষা থেকে যাচ্ছে: প্রতিটি আপত্তির সঠিক তদন্ত, সংশ্লিষ্ট ভোটারের কাছে নোটিস পৌঁছনো এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ।
এই বিতর্ক মেটাতে প্রয়োজন আবেদনকারী, আপত্তির কারণ এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের স্বচ্ছ পরিসংখ্যান। তাতে যেমন ভুয়ো বা অযোগ্য নাম চিহ্নিত করা সহজ হবে, তেমনই যোগ্য ভোটারের নাম অন্যায়ভাবে বাদ পড়ার অভিযোগও পরীক্ষা করা যাবে। চার জেলার অস্বাভাবিক সংখ্যাই এখন প্রশ্ন তুলেছে; উত্তর মিলবে যাচাইয়ের মান এবং সিদ্ধান্তের নথিতে।