পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিই জাতীয় নিরাপত্তা আইন বা এনএসএ-তে কাউকে আটকে রাখার একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর এই নীতি স্পষ্ট করে ২০২৪ সালের সম্ভল হিংসায় অভিযুক্ত মোল্লা আফরোজের প্রতিরোধমূলক আটকের নির্দেশ বাতিল করল সুপ্রিম কোর্ট। বেআইনি আটকের জন্য উত্তরপ্রদেশ সরকারের উপর ১০ লক্ষ টাকা খরচও চাপিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।

বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি শীল নাগুর বেঞ্চ আফরোজের আটক বহাল রাখা এলাহাবাদ হাই কোর্টের ৮ জুনের রায় খারিজ করেছে। পাশাপাশি বাতিল হয়েছে জেলা প্রশাসনের আটকের নির্দেশ এবং রাজ্য সরকারের অনুমোদন। অন্য কোনও মামলায় হেফাজতের প্রয়োজন না থাকলে তাঁকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে বলা হয়েছে। এক মাসের মধ্যে ওই ১০ লক্ষ টাকা আফরোজকে দিতে হবে রাজ্যকে।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর। আদালতের নির্দেশে উত্তরপ্রদেশের সম্ভলের শাহি জামা মসজিদে সমীক্ষা চলাকালীন সংঘর্ষে চার জনের মৃত্যু হয়। পুলিশের অভিযোগ, জনতাকে উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে আফরোজের ভূমিকা ছিল। ২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। সেই বছরের ১৩ অক্টোবর, তিনি বিচারবিভাগীয় হেফাজতে থাকাকালীনই, সম্ভলের জেলাশাসক তাঁর বিরুদ্ধে এনএসএ প্রয়োগ করেন।

আফরোজের অভিযোগ ছিল, পুলিশ নির্যাতন এবং ‘এনকাউন্টার’-এর ভয় দেখিয়ে তাঁর স্বীকারোক্তি আদায় করেছে। ফলে সেই বক্তব্যের উপর নির্ভর করে তাঁকে আটক রাখা যায় না। সুপ্রিম কোর্ট লক্ষ করেছে, নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকির এই অভিযোগের জবাব রাজ্য সরকারের হলফনামা কিংবা লিখিত বক্তব্যে পাওয়া যায়নি। এই পরিস্থিতিতে স্বীকারোক্তিকে স্বেচ্ছায় দেওয়া বক্তব্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না বলে জানিয়েছে বেঞ্চ।

উত্তরপ্রদেশ সরকারের যুক্তি ছিল, আফরোজের মুক্তিতে ফের হিংসা ছড়ানো এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই বিপদ ঠেকাতেই প্রতিরোধমূলক আটক প্রয়োজন। এলাহাবাদ হাই কোর্টও প্রশাসনের সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছিল। হাই কোর্টের মতে, ঘটনার জেরে মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছিল, আতঙ্ক ছড়িয়েছিল এবং জনশৃঙ্খলা বিপন্ন হয়েছিল। আটকের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে প্রশাসন প্রাসঙ্গিক উপাদান বিবেচনা করেছে বলেই তখন মনে করেছিল আদালত।

কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, স্বীকারোক্তিকে সমর্থন করার মতো স্বাধীন তথ্যপ্রমাণ ছাড়া শুধু সেই বক্তব্য থেকে আটকের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। আইন যে ধরনের বক্তব্যকে সন্দেহের চোখে দেখে, তার উপর দাঁড়িয়ে নাগরিকের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার নির্দেশ টিকতে পারে না। অন্য উপাদান থাকলে সেগুলি পৃথকভাবে যাচাই করে দেখতে হবে, আটকের বৈধ ভিত্তি সত্যিই রয়েছে কি না।

বেঞ্চ সাংবিধানিক সুরক্ষার কথাও মনে করিয়েছে। আটক ব্যক্তিকে আটকের কারণ জানানো এবং সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দ্রুত বক্তব্য পেশের সুযোগ দেওয়া তাঁর অধিকার। কারণগুলি প্রাসঙ্গিক ও স্পষ্ট না হলে কার্যকরভাবে আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকে না। অস্পষ্ট কিংবা আইনগতভাবে অপ্রাসঙ্গিক অভিযোগের উপর নির্ভরশীল আটক এই সুরক্ষাকেই দুর্বল করে। তাই প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ভিত্তি বিচারিক পর্যালোচনার বাইরে থাকতে পারে না।

আদালত আরও বলেছে, একাধিক ফৌজদারি মামলা থাকলেই প্রতিরোধমূলক আটক ন্যায্য হয় না; প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য উপাদান। ভবিষ্যতে ক্ষতিকর কাজ ঠেকানোর প্রয়োজন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চলমান মামলার অভিযোগ পুনরাবৃত্তি করে আটক বজায় রাখা যায় না। এই মামলায় আটকের প্রয়োজনীয়তা এবং প্রশাসনের বিবেচিত উপাদানের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে বেঞ্চ। আফরোজ সংশ্লিষ্ট সব মামলায় জামিন পেয়েও দীর্ঘদিন স্বাধীনতা হারিয়েছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই ঘটনায় প্রক্রিয়াটিকেই কার্যত শাস্তিতে পরিণত করা হয়েছিল।

তবে এই রায় আফরোজের বিরুদ্ধে মূল ফৌজদারি অভিযোগগুলির নিষ্পত্তি নয়। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে, ওই মামলাগুলির গুণাগুণ সম্পর্কে কোনও মত দেওয়া হচ্ছে না। সেগুলি আইন অনুযায়ী চলবে এবং এই রায়ের পর্যবেক্ষণ দ্বারা প্রভাবিত হবে না। ফলে সিদ্ধান্তটির কেন্দ্রবিন্দু অভিযুক্তের অপরাধ নির্ধারণ নয়, তাঁকে এনএসএ-তে আটকে রাখার আইনগত বৈধতা।