বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার পঞ্চাশতম আসরের কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে ‘বন্দে মাতরম্’-এর ১৫০ বছর। আগামী ২০২৭ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলা চলবে। সোমবার আয়োজকদের তরফে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। বিশেষ অতিথি দেশ হিসেবে ইজরায়েলের নাম বিবেচনায় থাকলেও সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সুবর্ণজয়ন্তীর আয়োজনে বিষয় নির্বাচন থেকে পরিচালনব্যবস্থা—একাধিক ক্ষেত্রে পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বইমেলার উপদেষ্টা কমিটির আহ্বায়ক প্রসেনজিৎ বক্সী জানিয়েছেন, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, জাতীয়তাবাদ এবং ইতিহাসের সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম্’-এর সম্পর্ককে সামনে রেখেই এই বিষয় বেছে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলার ইতিহাস, সাহিত্য এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের বিভিন্ন দিকও আগামী মেলায় তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় ভাবনার সঙ্গে একাধিক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ যুক্ত হতে পারে।
পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে দেশভাগের ইতিহাস এবং পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পটভূমি। বাংলার নবজাগরণও গুরুত্ব পাবে। রাজনারায়ণ বসুর জন্মের দ্বিশতবর্ষকে ঘিরে অনুষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত করার কথা ভাবছে কমিটি। জনপ্রিয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও কয়েকটি প্রস্তাব বিবেচনাধীন। উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’-র শতবর্ষকে মেলার কর্মসূচিতে জায়গা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে এসব অনুষ্ঠানের বিস্তারিত সূচি এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
অতিথি দেশ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইজরায়েলকে ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে চান উপদেষ্টা কমিটির সদস্যেরা। বক্সী জানিয়েছেন, এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হবে। ফলে ইজরায়েলের অংশগ্রহণকে এখনই নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া যাচ্ছে না। মূল বিষয় এবং অতিথি দেশ—এই দুই পৃথক দিক মাথায় রেখেই মেলার প্রস্তুতি এগোচ্ছে।
এবার মেলার আয়োজন যৌথভাবে করবে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট এবং পূর্বাঞ্চলীয় সংস্কৃতি কেন্দ্র। গত মাসে রাজ্য সরকার বইমেলার তত্ত্বাবধানের জন্য ২৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। তাতে রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ এবং প্রকাশক সংগঠনের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। এই কাঠামোর মধ্যেই পঞ্চাশতম আসরের আয়োজন এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
স্টল বণ্টনেও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকাশকেরা সেই ব্যবস্থায় আবেদন করতে পারবেন। আন্তর্জাতিক বইমেলাগুলিতে ব্যবহৃত আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণের কথা জানিয়েছেন আয়োজকেরা। প্রকাশক, মুদ্রক ও বইবিক্রেতাদের জন্য মেলাকে আরও উন্মুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এর আগে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বইমেলায় ভারতীয় পরিচয় প্রতিফলিত করার এবং প্রকাশনা জগতের সব অংশের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছিলেন।
বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জেরে ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের বইমেলায় বাংলাদেশ অংশ নেয়নি। আগামী আসরে তাদের উপস্থিতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র ও বিদেশ মন্ত্রকের অবস্থানের উপর নির্ভর করবে বলে জানিয়েছেন বক্সী। ফলে অতিথি দেশ নির্বাচনের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রকাশকদের অংশগ্রহণের প্রশ্নটিও এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। প
‘বন্দে মাতরম্’-কে ঘিরে এই আয়োজনের ঐতিহাসিক পটভূমিও বিস্তৃত। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনা স্বাধীনতা আন্দোলনে ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধের অন্যতম ধ্বনি হয়ে উঠেছিল। বিশেষত ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে গানটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯০৬ সালে বরিশালে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এই ধ্বনি তোলায় প্রতিনিধিদের পুলিশি দমনপীড়নের মুখে পড়তে হয়েছিল। স্বাধীন ভারতে ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদে রাজেন্দ্রপ্রসাদ স্বাধীনতা সংগ্রামে গানটির ঐতিহাসিক ভূমিকা স্মরণ করে তাকে ‘জনগণমন’-এর সমান সম্মান দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। সেই সাহিত্যিক সৃষ্টি, রাজনৈতিক আন্দোলন এবং জাতীয় স্মৃতির দীর্ঘ সম্পর্কই আগামী বইমেলার কেন্দ্রীয় বিষয়ের ঐতিহাসিক ভিত্তি।