দেশের সরকারি স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার ভিত কতটা নড়বড়ে, তা ফের সামনে আনল ভারতের নিয়ন্ত্রক ও মহালেখা পরীক্ষক (সিএজি)-এর সাম্প্রতিক নিরীক্ষা রিপোর্ট। শিক্ষক সংকট, স্কুলছুটের উচ্চ হার এবং পরিকাঠামোগত ঘাটতির পাশাপাশি রিপোর্টের সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য—দেশের ৫২০টি সরকারি স্কুলে কর্মরত নেই একজনও শিক্ষক।

অর্থাৎ, স্কুল আছে, পড়ুয়া আছে—কিন্তু পড়ানোর জন্য শিক্ষক নেই।

সিএজি-র রিপোর্ট বলছে, শিক্ষা খাতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও তার সুফল দেশের সর্বত্র সমানভাবে পৌঁছচ্ছে না। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলিতে শিক্ষক নিয়োগ, তাঁদের উপস্থিতি এবং শিক্ষার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে।

ভর্তি হচ্ছে, পড়া শেষ করছে না

প্রাথমিক স্তরে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরও বহু পড়ুয়া মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছনোর আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে।

আর্থিক সংকট, পরিবারের দায়িত্ব, অল্প বয়সে কাজের বাজারে ঢুকে পড়া, মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ, নিরাপদ যাতায়াতের অভাব এবং স্কুলে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি—সব মিলিয়ে স্কুলছুটের হার এখনও উদ্বেগজনক।

সরকারি প্রকল্পগুলির লক্ষ্য ছিল প্রতিটি শিশুকে স্কুলের আওতায় আনা এবং নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত পড়াশোনা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্যের সঙ্গে এখনও বড় ফাঁক রয়েছে বলে সিএজি-র পর্যবেক্ষণ।

৫২০ স্কুলে শূন্য শিক্ষক

রিপোর্টের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য, ৫২০টি সরকারি স্কুলে একজনও শিক্ষক কর্মরত নেই।

কোথাও অন্য স্কুল থেকে অস্থায়ীভাবে শিক্ষক পাঠিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়। কোথাও আবার নিয়মিত পাঠদানই কার্যত ব্যাহত হয়।

ফলে শুধু পড়াশোনার ধারাবাহিকতাই নয়, শিক্ষার গুণগত মানও বড় ধাক্কা খাচ্ছে। অনেক পড়ুয়াকে দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত ক্লাস ছাড়াই থাকতে হচ্ছে।

একজন শিক্ষক, একাধিক শ্রেণি

শিক্ষকশূন্য স্কুলের পাশাপাশি আরও বড় সমস্যা রয়েছে বহু-শ্রেণির এক-শিক্ষক স্কুলগুলিতে।

একজন শিক্ষককেই একসঙ্গে একাধিক শ্রেণির পড়ুয়াকে সামলাতে হচ্ছে। তার উপর রয়েছে প্রশাসনিক কাজ, সরকারি সমীক্ষা, নির্বাচন সংক্রান্ত দায়িত্ব এবং নানা অতিরিক্ত কাজ।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি পড়ুয়ার প্রতি আলাদা নজর দেওয়া তো দূরের কথা, জাতীয় শিক্ষানীতিতে নির্ধারিত মান বজায় রাখাও অত্যন্ত কঠিন।

শুধু শিক্ষক নয়, পরিকাঠামোও বেহাল

সমস্যা শুধু শিক্ষক সংখ্যায় আটকে নেই। বহু সরকারি স্কুলে এখনও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই। কোথাও পানীয় জলের অভাব, কোথাও শৌচাগার অকেজো, আবার কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও তা নিয়মিত সচল নয়।

বিশেষ করে ছাত্রীদের জন্য আলাদা ও ব্যবহারযোগ্য শৌচাগারের অভাব গুরুতর সমস্যা। শিক্ষাবিদদের মতে, কিশোরীদের স্কুলে ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এই ধরনের পরিকাঠামোগত ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ে।

বরাদ্দ আছে, কাজ কোথায়?

সিএজি-র রিপোর্টে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সমগ্র শিক্ষা অভিযানের আওতায় কেন্দ্র বিপুল অর্থ বরাদ্দ করলেও বহু রাজ্যে সেই অর্থ সময়মতো খরচ হয়নি। কোথাও বরাদ্দ অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার করা যায়নি, কোথাও আবার প্রকল্প অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও বহু জায়গায় প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে।

অর্থাৎ, পরিকল্পনা রয়েছে, বরাদ্দ রয়েছে—কিন্তু বাস্তবায়নের স্তরেই তৈরি হচ্ছে বড় ফাঁক।

তথ্যেই যখন গলদ

সিএজি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতার দিকে নজর দিয়েছে—তথ্য পর্যবেক্ষণ ও নথিভুক্তকরণ।

বিভিন্ন রাজ্য থেকে পাওয়া তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। কোথাও ছাত্রসংখ্যা, কোথাও শিক্ষক উপস্থিতি, আবার কোথাও স্কুলের পরিকাঠামো সংক্রান্ত তথ্য যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নয়।

ফলে প্রকৃত সমস্যা কতটা বড়, তা নির্ভুলভাবে বোঝাই কঠিন হয়ে পড়ছে। আর ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের উপর ভিত্তি করে কার্যকর নীতিও তৈরি করা সম্ভব নয়।

ডিজিটাল শিক্ষা কি একাই সমাধান?

শিক্ষাবিদদের মতে, নতুন স্কুল তৈরি বা প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।

প্রথম প্রয়োজন পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ। তার সঙ্গে দরকার নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্থানীয় ভাষায় মানসম্মত শিক্ষাসামগ্রী এবং স্কুলছুট পড়ুয়াদের ফের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার কার্যকর ব্যবস্থা।

প্রযুক্তি অবশ্যই শিক্ষার পরিধি বাড়াতে পারে। কিন্তু যে স্কুলে শিক্ষকই নেই, সেখানে শুধু ডিজিটাল পর্দা বসিয়ে শিক্ষার ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।

জাতীয় শিক্ষানীতির সামনে বড় প্রশ্ন

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-র অন্যতম লক্ষ্য সকল শিশুর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু সিএজি রিপোর্টের তথ্য বলছে, সেই লক্ষ্য পূরণে এখনও তিনটি বড় বাধা রয়ে গিয়েছে—শিক্ষক সংকট, পরিকাঠামোগত দুর্বলতা এবং স্কুলছুট রোধে ব্যর্থতা।

এই সমস্যাগুলি দ্রুত সমাধান না হলে শুধু বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাই নয়, দেশের দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যও ধাক্কা খেতে পারে।

কারণ স্কুলে ভর্তি করানোই শিক্ষার শেষ কথা নয়।

শিক্ষকহীন ৫২০টি স্কুল যেন সেই কঠিন বাস্তবতারই প্রতীক—স্কুলের দরজা খোলা থাকলেই শিক্ষা নিশ্চিত হয় না।