হাইলাইটস
- আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও এখনই পেট্রল-ডিজেলের দাম কমার সম্ভাবনা নেই।
- কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী বলেছেন, আরও কয়েক সপ্তাহ দাম কম থাকলে মূল্যহ্রাস নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।
- সরকারের নজর আপাতত জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে—তেল মজুতের পরিকাঠামো বাড়ানো ও সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করার উপর।
- পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যপ্রবণতা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলি খুচরো দামে পরিবর্তন আনতে চাইবে না।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, এবার কি দেশের পেট্রল ও ডিজেলের দামও কমবে? এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিলেও কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন—এখনই মূল্যহ্রাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে পুরী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যদি আগামী কয়েক সপ্তাহ একইভাবে নিচু স্তরে স্থির থাকে, তাহলে পেট্রল ও ডিজেলের দাম কমানোর প্রশ্ন ওঠা একেবারেই স্বাভাবিক। তবে তিনি একইসঙ্গে বুঝিয়ে দেন, কেবল কয়েক দিনের দরপতনের ভিত্তিতে সরকার বা তেল সংস্থাগুলি সিদ্ধান্ত নেবে না। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও ভারত সরকার আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ জ্বালানির দাম নির্ধারণে শুধু বর্তমান বাজারদর নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ওঠানামা, আমদানি ব্যয়, মুদ্রা বিনিময় হার এবং সরবরাহ পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
কেন তাড়াহুড়ো করছে না সরকার?
গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে একাধিকবার তীব্র ওঠানামা হয়েছে। কখনও যুদ্ধ, কখনও উৎপাদনকারী দেশগুলির সিদ্ধান্ত, আবার কখনও বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতির কারণে দাম দ্রুত বেড়েছে বা কমেছে। ফলে কয়েক দিনের নিম্নমুখী প্রবণতাকে স্থায়ী ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। এই কারণেই সরকার অপেক্ষা করতে চাইছে, বর্তমান দরপতন সাময়িক নাকি দীর্ঘস্থায়ী—তা বোঝার জন্য।
জ্বালানি নিরাপত্তাতেই এখন বেশি গুরুত্ব
পুরী জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম থাকাকালীন ভারতকে এই সুযোগ কাজে লাগানো উচিত। তাঁর মতে, এই সময় আরও বেশি অপরিশোধিত তেল কিনে কৌশলগত মজুত বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি তেল ও জ্বালানি সংরক্ষণের পরিকাঠামো সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি জোরদার করাও জরুরি। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। দেশের প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আসে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে যে কোনও অস্থিরতা সরাসরি ভারতের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। সেই ঝুঁকি কমাতেই সরকার মজুত ক্ষমতা বাড়ানো ও আমদানির উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করার নীতিতে জোর দিচ্ছে।
পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির প্রভাব
সম্প্রতি পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় দাম আবার নেমে আসে। কিন্তু সরকার মনে করছে, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে যে কোনও সময় বাজারে নতুন অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ভারত তার জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে চাইছে।
খুচরো দামের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের সম্পর্ক
ভারতে পেট্রল ও ডিজেলের দাম প্রতিদিন সংশোধিত হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের পরিবর্তন সঙ্গে সঙ্গে খুচরো দামে প্রতিফলিত হয় না। কারণ এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পরিশোধন ব্যয়, পরিবহণ খরচ, কেন্দ্র ও রাজ্যের কর, বিপণন ব্যয় এবং তেল সংস্থাগুলির আর্থিক ভারসাম্য। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েক দিনের দরপতন হলেও খুচরো দামে পরিবর্তন আসতে কিছুটা সময় লাগে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির চাপে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ পেট্রল ও ডিজেলের দাম কমার অপেক্ষায় রয়েছেন। পরিবহণ খরচ কমলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থান থেকে স্পষ্ট, আপাতত তড়িঘড়ি কোনও ঘোষণা আসছে না।
কী হতে পারে আগামী দিনে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে বর্তমান নিম্নস্তরে স্থির থাকে এবং পশ্চিম এশিয়ায় নতুন কোনও অস্থিরতা না তৈরি হয়, তাহলে তেল বিপণন সংস্থাগুলি খুচরো দামে কিছুটা ছাড় দেওয়ার বিষয়ে ভাবতে পারে। তবে সেই সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বাজার পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয় এবং সরকারের সামগ্রিক জ্বালানি নীতির উপর। ফলে আপাতত সাধারণ মানুষের জন্য বার্তা একটাই—আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে ঠিকই, কিন্তু তার সুফল পেট্রল ও ডিজেলের দামে কবে মিলবে, সে বিষয়ে এখনও সরকার কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করেনি। আরও কয়েক সপ্তাহের বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পরই মূল্যহ্রাসের বিষয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।