বাংলাস্ফিয়ার: আইসা সভাপতি নেহা বোরাকে শান্তিরক্ষার মুচলেকা দেওয়ার বিষয়ে পাঠানো কারণ দর্শানোর নোটিস ‘কাট-পেস্ট’ করে তৈরি করা হয়েছে বলে আদালতে অভিযোগ করলেন তাঁর আইনজীবী, প্রবীণ অ্যাডভোকেট গোপাল শঙ্করনারায়ণন। ওই নোটিসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নেহার দায়ের করা আবেদনের শুনানি শেষে আদালত শুক্রবার পর্যন্ত রায় সংরক্ষিত রেখেছে।
শঙ্করনারায়ণন জানান, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১২৬ ও ১৩০ ধারায় নোটিসটি জারি করা হয়েছে। ১২৬ ধারায় শান্তি বজায় রাখার জন্য কোনও ব্যক্তিকে মুচলেকা দিতে বলার ক্ষমতা রয়েছে ম্যাজিস্ট্রেটের। আর ১৩০ ধারা অনুযায়ী, ১২৬ ধারায় পদক্ষেপ করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কারণ দর্শাতে বলে লিখিত আদেশ দিতে হয় এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে।
শঙ্করনারায়ণন আরও বলেন, “এমনকি অন্তর্বর্তী মুচলেকার ক্ষেত্রেও অনুসন্ধান আবশ্যক। অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে ব্যক্তিগত মুচলেকার বিষয়টি ম্যাজিস্ট্রেটের বিবেচনায় আসতেই পারে না। এই ধরনের নোটিসের প্রাপক হিসেবে আমি কী জবাব দেব—ওঁরা ‘আমার দ্বারা শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা করছেন’, এর কী উত্তর হয়? নোটিসটি স্পষ্টতই ত্রুটিপূর্ণ। যা সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে ভুল, তার জবাব দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।”
শুনানিতে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল শর্মার উদ্দেশে বিচারপতি প্রসাদ প্রশ্ন করেন, “অনুসন্ধান সম্পূর্ণ না করেই মুচলেকা প্রয়োজন বলে কি আপনারা আগাম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেননি? অথচ মুচলেকার প্রয়োজন হতেও পারে, না-ও হতে পারে।”
বিচারপতি বলেন, “যে বিষয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে, সেখানে নাগরিকের একমাত্র রক্ষাকবচ হল আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শর্তগুলি পূরণ করা। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের অধীনে আমরা দেখছি, ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণের ক্ষেত্রে আইন প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি মেনে চলা হয়েছে কি না।”
আদালত আরও জানতে চায়, বিশেষ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা এসইএম কি ‘কালান্দ্রা’ ছাড়াও অন্য কোনও উপাদানের উপর নির্ভর করেছিলেন? কালান্দ্রা হল পুলিশের এমন একটি প্রতিবেদন, যাতে কোনও ব্যক্তিকে কেন শান্তিরক্ষার মুচলেকা দিতে বলা প্রয়োজন অথবা তাঁর বিরুদ্ধে কেন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তার তথ্য থাকে।
অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল শর্মা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের স্ট্যান্ডিং কাউন্সেল আশিস দীক্ষিত জোর দিয়ে বলেন, পুলিশি প্রতিবেদনে জেনারেল ডায়েরির সমস্ত নথিভুক্ত তথ্যও ছিল। তাঁদের যুক্তি, “ছ’টি পর্যন্ত এফআইআর থাকলে সেগুলি কি উপেক্ষা করা যায়? তিনি কি এমন আদর্শ নিষ্পাপ মানুষ, একেবারে ধোয়া তুলসীপাতা, যিনি কী ঘটছে তার কিছুই জানেন না? …এটি সম্পূর্ণ নির্দোষ কোনও মহিলার বিষয় নয়।”
নেহার বিরুদ্ধে ‘সরকার বদল’-এর কথা বলার অভিযোগও তুলে ধরেন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল। জবাবে শঙ্করনারায়ণন বলেন, “মাফ করবেন, গণতন্ত্রে সরকার বদলের দাবি তোলায় কোনও অন্যায় নেই।”
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, বিএনএসএসের ১২৬ ধারায় যে সমস্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা আবশ্যক, তার সবই মেনে চলা হয়েছে।
১৬ অক্টোবর কনট প্লেসে ‘লহরা দো তিরঙ্গা’ মিছিলে যাওয়ার পথে মান্ডি হাউসে আটক হন এই ছাত্রনেত্রী। মিছিলের আগে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকেও প্রতিরোধমূলক হেফাজতে নেয় দিল্লি পুলিশ।
১৯৭৮ সালের দিল্লি পুলিশ আইনের ৬৫ ধারায় আটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর ১৭ অক্টোবর ভোররাতে নেহাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশের ‘যুক্তিসংগত নির্দেশ’ মানতে অস্বীকার করলে কাউকে সংশ্লিষ্ট স্থান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা দেয় এই ধারা।
ওই দিনই বিশেষ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মহেশ কুমার মীনা একটি নোটিস জারি করে নেহাকে ১৯ অক্টোবর নয়াদিল্লি জেলার এসইএমের সামনে হাজির হতে নির্দেশ দেন।
নোটিসে অভিযোগ করা হয়, মান্ডি হাউসের গোলচত্বরে নেহা “প্রতিবাদের সময় জোরে চিৎকার করে উপদ্রব” সৃষ্টি করেছেন। আরও অভিযোগ, এর আগেও তিনি “বিএনএসএসের ১৬৩ ধারায় নিষেধাজ্ঞা জারি থাকা সত্ত্বেও নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর ও তার আশপাশে বারবার প্রতিবাদমূলক কর্মসূচিতে যুক্ত ছিলেন”।
নিজের আবেদনে নেহা বলেছেন, ওই নোটিস এবং নির্দেশ “শান্তিপূর্ণ ভিন্নমত দমন করতে প্রতিরোধমূলক ক্ষমতা প্রয়োগের আড়ালে ক্ষমতার অপব্যবহার”। তাঁর অভিযোগ, এই পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে “অস্পষ্ট ও তথ্যগতভাবে ভুল” উপাদান।