কথায় বলে, বিপদ আসে একসঙ্গে তিনটি করে। ক্ষমতায় থাকার ত্রয়োদশ বছরে নরেন্দ্র মোদীর কাছে কথাটি হয়তো নিছক প্রবাদ হয়ে থাকছে না।

ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে একই সঙ্গে এক অস্বাভাবিক ত্রিমুখী চাপের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একদিকে তরুণদের বিক্ষোভ আন্দোলন, যার স্তিমিত হওয়ার লক্ষণ বিশেষ দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমশ তিক্ত হয়ে ওঠা সম্পর্ক। তার সঙ্গে রয়েছে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের একাধিক পদক্ষেপ সত্ত্বেও ভারতীয় টাকার ওপর নতুন করে তৈরি হওয়া চাপ।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি নামে পরিচিত যুব আন্দোলনের শুরু হয়েছিল নিছক রসিকতা হিসেবে। কিন্তু পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে ভূমিকা রাখার পরে সেই আন্দোলন এখন ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দিকে নজর ঘুরিয়েছে।

গত এক দশকের বেশির ভাগ সময় মোদীকে রাজনৈতিকভাবে প্রায় অপ্রতিরোধ্য বলে মনে হয়েছে। কিন্তু একসঙ্গে এই সমস্যাগুলি ঘনীভূত হওয়ায় তাঁর সরকারকে এক অস্বাভাবিক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

মোদী কি এ যাবৎ তাঁর কঠিনতম পরীক্ষার সামনে?

দেশের ভোটার তালিকা সংশোধনের সাম্প্রতিক অভিযানের বিরুদ্ধে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনতে সপ্তাহান্তে রাজধানী নয়াদিল্লির বিভিন্ন অংশে কয়েকশো বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট পরিষেবা, ব্যাহত হয় যাতায়াতও।

গত বছর শুরু হওয়া এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে—যে সংখ্যা জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এর মধ্যে ২ কোটি ৮০ লক্ষ মৃত ভোটার, ৬ কোটি ৩০ লক্ষ অন্যত্র চলে যাওয়া ভোটার এবং ৩ কোটি এমন মানুষ রয়েছেন, যাঁদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি আরও ভালোভাবে বুঝতে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনটি পড়ুন।

ককরোচ জনতা পার্টি এখনও নির্বাচনে লড়েনি। অন্যদিকে মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি সাম্প্রতিক মাসগুলিতে বিভিন্ন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে স্বচ্ছন্দে জয় পেয়েছে। তা সত্ত্বেও তরুণদের এই বিক্ষোভ সবার নজর কেড়েছে।

ফিচ সলিউশনসের শাখা বিএমআই গত সপ্তাহের একটি প্রতিবেদনে বলেছে, “আমাদের ধারণা, ভারতে দ্বিতীয় ককরোচ বিক্ষোভ অভিযান আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও বড় হবে। শেষ পর্যন্ত তা জুলাইয়ের আন্দোলনকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।”

বিএমআইয়ের বক্তব্য, “সিজেপির সংগঠন এখন আরও শক্তিশালী, অসন্তোষের ভিত্তি আরও বিস্তৃত, আর পাশাপাশি বিরোধীদের সংগঠিত আন্দোলনের সমর্থনও তাদের সঙ্গে রয়েছে।” তবে সংস্থাটি এ-ও বলেছে, বড় মহানগরগুলির বাইরে অংশগ্রহণে তারতম্য থাকায় আন্দোলন সারা দেশে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

এই আন্দোলনের পিছনে কারা রয়েছেন? সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে সম্পর্কে আরও জানতে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনটি পড়ুন। আর আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা পিএইচডি গবেষক নেহা বোরা সম্পর্কে জানতে দেখুন সঙ্গে দেওয়া ভিডিও।

বাইরের চাপ

দেশের অভ্যন্তরে মোদী সরকারের নীতি নিয়ে চাপ বাড়ার পাশাপাশি নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কও কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন জানিয়েছেন, কয়েক মাস ধরে আলোচনায় থাকা বাণিজ্যচুক্তিটি আপাতত এমন এক পর্যায়ে এসে ঠেকেছে, যেখান থেকে আর বিশেষ অগ্রগতি হচ্ছে না।

আলোচনা কেন এগোচ্ছে না, তা কোনও পক্ষই ব্যাখ্যা করেনি। তবে এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে একটি বিলকে। ওই বিলে ভারত ও চিন-সহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রাশিয়ার তেল কেনে এমন দেশগুলি থেকে আমদানির ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়ার কথা রয়েছে। এ বিষয়ে আমার সহকর্মী শিবাঙ্গী আচার্য ও মনোজ কুমারের প্রতিবেদন পড়ুন।

ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক আবাসিক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, মোদী সরকারের সুর সম্প্রতি সমঝোতামুখী অবস্থান থেকে সংঘাতমুখী হয়ে ওঠার পিছনে সম্ভবত এই উপলব্ধি কাজ করছে যে, রাজনৈতিকভাবে ভারতের পক্ষে আর চুপ করে থাকা সম্ভব নয়।

কুগেলম্যান বলেন, “ভারতের ওপর শুল্ক চাপানো, পাকিস্তানকে কাছে টেনে নেওয়া, ভারতের সমালোচনা করা এবং আরও নানা কারণে ভারতীয় জনসাধারণের একটি বড় অংশ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ।”

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন’ কর্মসূচি সীমিত করার পদক্ষেপও করেছে। একসময় ইনফোসিস ও টিসিএস-সহ ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলি এই কর্মসূচি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করত। তবে বিশ্লেষকদের বক্তব্য, গত পাঁচ বছরে এই সংস্থাগুলি ভারত থেকে দক্ষ কর্মী আমেরিকায় পাঠানোর ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে। ফলে তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত থাকবে।

চাপের মুখে ভারতীয় টাকা

তেলের চড়া দাম এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভারতীয় সম্পদ বিক্রির কারণে টাকার ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, আমেরিকার সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে তা আরও তীব্র হতে পারে।

ভারতীয় অর্থনীতি এখনও ৭ শতাংশের বেশি হারে দ্রুত বাড়ছে। বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলির মধ্যে তার বৃদ্ধির হার এখনও সর্বোচ্চ।

তা সত্ত্বেও বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা রেকর্ড গতিতে ভারতীয় সম্পদ বিক্রি করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, তেলের চড়া দাম এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের সুযোগ কম থাকাও ভারত সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহে ভাটা ফেলেছে।

এর ফল, টাকার দামের ওপর লাগাতার চাপ। বিষয়টি প্রায়ই রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সপ্তাহের গোড়ায় সুদের হার বাড়িয়েও টাকার দুর্বলতা ঠেকানো যায়নি। তার পরে সপ্তাহান্তে ডলারের চাহিদা কমাতে নতুন একগুচ্ছ পদক্ষেপ করে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।

টাকাকে সমর্থন জোগাতে ভারত এ বছর যে একাধিক পদক্ষেপ করেছে, সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনটি পড়ুন।

মুম্বইয়ের সিস্টেম্যাটিক্স গ্রুপের প্রধান নির্বাহী ধনঞ্জয় সিনহার মতে, বাণিজ্যিক উত্তেজনা ভারতের সামষ্টিক অর্থনীতির সম্ভাবনা এবং টাকার জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জোগানো, অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে সহায়ক পুঁজি দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়াও টাকার দুর্বলতার একটি কারণ।

তিনি বলেন, “ভারত হয়তো আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে এই কারণে যে, দেশের ভিতরে রাজনৈতিকভাবে তাদের অবস্থান দুর্বল দেখাচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে মার্কিন চাপের কাছে মাথা নত করছে বলে নিজেদের দেখাতে তারা চাইবে না।”